বরগুনার সমুদ্রঘেঁষা তালতলী বাজার। দুপুরের রোদে এক পাশে ছোট্ট একটি ঠেলাগাড়িতে বরফ, লেবু, চিনি আর পানির বোতল সাজিয়ে ক্রেতার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ইউসুফ হোসেন হাওলাদার।
কয়েক বছর আগেও পঞ্চাশোর্ধ্ব মানুষটিকে দেখা যেত জমিতে ধান, মরিচ কিংবা শাকসবজির পরিচর্যায়। কৃষিকাজই ছিল তার পরিচয়, তার সংসারের ভরসা। আজ তিনি আর কৃষক নন, শরবত বিক্রেতা।
তালতলী উপজেলার বড় অঙ্কুজান গ্রামের ইউসুফ হোসেন বলছিলেন, ‘চাষ করে আর সংসার চলছিল না। তিন বছর ধরে জমিতে ফলন এমনভাবে কমে গেছে যে খরচই উঠত না। বয়স হয়েছে, তাই ঢাকায় যেতে পারিনি। বাধ্য হয়ে এ শরবতের ব্যবসা শুরু করেছি।’
ইউসুফের এ পেশা পরিবর্তনের গল্পটি এখন আর ব্যতিক্রম নয়। বরং এটি উপকূলীয় তালতলীর এক গভীর অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৩ সালে তালতলীর নিশানবাড়ী ইউনিয়নের বড় অঙ্কুজানপাড়ায় ৩৫০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হওয়ার পরই এ পরিবর্তন শুরু হয়। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালুর পর পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদী থেকে ইলিশসহ বিভিন্ন মাছ আহরণ দ্রুত কমে যায়। একই সময়ে কৃষিজমির উৎপাদনও কমতে থাকে। ডাব, পেয়ারা, তালসহ বিভিন্ন অর্থকরী ফল উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
স্থানীয়রা জানান, গত দুই বছরে উপজেলার অন্তত এক-তৃতীয়াংশ কৃষক ও জেলে জীবিকার তাগিদে পেশা বদল করেছেন। অনেকে ঢাকায় গিয়ে অটোরিকশা চালাচ্ছেন, কেউ হকারি করছেন, কেউ দিনমজুরের কাজ করছেন। ঋণের চাপে অনেকেই আবার গ্রাম ছেড়েছেন। পরিবারের বাইরে অন্য কারো সঙ্গে তাদের এখন আর যোগাযোগই নেই।
এমনই এক জেলে হাবিব খান। প্রায় দুই বছর আগে আড়াই লাখ টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে তিনি তালতলী ছেড়ে ঢাকায় চলে যান। গ্রামের মানুষ জানান, এখন তিনি অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালান এবং ধীরে ধীরে মহাজনের ঋণ শোধ করছেন। মুঠোফোনেও তাকে সহজে পাওয়া যায় না।
একসময় এলাকার পরিচিত মৎস্য ব্যবসায়ী ছিলেন মুহিব্বুল হাওলাদার। নিজের মাছ ধরার নৌকা ছিল। কিন্তু সাগরে মাছ কমে যাওয়ায় ৭-৮ লাখ টাকার ঋণে ডুবে যান। একপর্যায়ে কাউকে কিছু না জানিয়েই গ্রাম ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। পরে অন্য পেশায় আয় করে ঋণের বড় অংশ শোধ করে আবার গ্রামে ফিরেছেন।
পায়রা, বলেশ্বর ও বিষখালী নদীর মোহনা থেকে একসময় দেশের উল্লেখযোগ্য ইলিশ আহরণ হতো। বঙ্গোপসাগরের সংযোগস্থল হওয়ায় এখানকার ইলিশের স্বাদ ও মানের বিশেষ সুনাম ছিল। এখন সে নদ-নদীগুলোয় ইলিশ প্রায় মেলেই না। অল্প যে মাছ পাওয়া যায়, তা ঘাটেই প্রতি কেজি ৩-৪ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। ফলে স্থানীয় মানুষের কাছেও ইলিশ এখন প্রায় অধরা।
নিবন্ধিত জেলে মো. শাহীন বলেন, ‘আগে এ মোহনাতেই সবচেয়ে বেশি ইলিশ পাওয়া যেত। এখন মাছই আসে না। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবহৃত গরম পানি নদীতে ছেড়ে দেয়া হয় বলেই মাছ এদিকে আসে না বলে আমরা মনে করি। মানুষ যেমন গরম জায়গা এড়িয়ে চলে, মাছও তেমনি।’
তিনি আরো বলেন, ‘তিন বছর ধরে মাছ নেই। অথচ মহাজনের ঋণ বাড়ছেই। গরু বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছি। এভাবে চলতে থাকলে আমাকেও হয়তো গ্রাম ছেড়ে যেতে হবে।’
বরগুনা জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যও মাছ উৎপাদন কমার চিত্র তুলে ধরে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জেলায় মোট মাছ আহরণ হয়েছিল ৯০ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৬৪ টনে।
জেলায় ধারাবাহিকভাবে মাছ আহরণ কমে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বরগুনার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন বলেন, ‘বরগুনায় মাছ উৎপাদন ও আহরণের পরিস্থিতি সত্যিই উদ্বেগজনক। দুই বছর আগে পাথরঘাটা ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টারে সব ধরনের মাছ অবতরণ হয়েছিল প্রায় ১৭৬ হাজার টন। গত এক বছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭৬ হাজার টনে। প্রতিদিনই মাছ আহরণ কমছে। বাজারে ইলিশ প্রায় নেই বললেই চলে। অনেক ট্রলার ও মাছ ধরার জাহাজের মালিক এখন সাগরে যেতে আগ্রহী নন, কারণ সেখানে পর্যাপ্ত মাছ মিলছে না।’
মাছ উৎপাদন কমে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রভাবের বিষয়টিও উড়িয়ে দিচ্ছেন না জেলা মৎস্য কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘আমাদের ধারণা, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে অপরিশোধিত বর্জ্য, গরম পানি ও অন্যান্য তরল পদার্থ নদীতে নিঃসরণের কারণে জলজ পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে; মাছের প্রজনন ও বিচরণেও যা প্রভাব ফেলছে। তবে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর গবেষণা করছে। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হলে এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে।’
তালতলী উপজেলায় প্রায় দুই লাখ মানুষের বসবাস। স্থানীয়দের মতে, এ জনপদের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষি ও মৎস্য আহরণের ওপর নির্ভরশীল। তবে গত কয়েক বছরে জীবিকার এ চিত্র দ্রুত বদলে গেছে। স্থানীয়দের দাবি, কৃষি ও মাছ ধরা থেকে আয় কমে যাওয়ায় উপজেলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এরই মধ্যে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন।
উপজেলার বিভিন্ন পাড়া-গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, মাছ ধরার মৌসুম চললেও অনেক জেলের নৌকা ঘাটেই পড়ে আছে। সাগরে পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়ায় তারা সমুদ্রে যেতে আগ্রহ হারিয়েছেন। জীবিকার তাগিদে যারা জাল নিয়ে সাগরে যাচ্ছেন, তাদের অনেকেই দিনের পর দিন প্রায় শূন্য হাতে ফিরে আসছেন।
একই সংকট কৃষিতেও। অন্তত ২০ জন স্থানীয় কৃষক জানান, গত কয়েক বছরে ফসল উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। শুধু ধান বা অন্যান্য কৃষিপণ্যই নয়, একসময় এলাকার গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফল হিসেবে পরিচিত ডাব ও তাল উৎপাদনেও মারাত্মক প্রভাব পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত গরম পানির পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক বর্জ্য ও দূষিত পদার্থ আশপাশের জলাশয় ও কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে মাটির উর্বরতা কমে যাচ্ছে এবং কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে এর প্রভাব গবাদিপশুর ওপরও পড়ছে বলে দাবি তাদের। তারা জানান, গত এক বছরে অনেকগুলো গরু-ছাগলের মৃত্যু হয়েছে। মূলত বিদ্যুৎ কেন্দ্রসংলগ্ন এলাকায় দূষিত ঘাস খাওয়ার পর এসব প্রাণী অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং পরে মারা যায়।
স্থানীয় গৃহিণী সুফিয়া বেগম জানান, এলাকায় এখন প্রায়ই গরু মারা যাচ্ছে। আর যেসব গরু আছে সেগুলোও প্রায় সময় অসুস্থ থাকে। চিকিৎসা করাতে প্রচুর টাকা লাগে। সে টাকাও অনেক সময় ঋণ করে জোগাড় করতে হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র বা সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর আনুষ্ঠানিক মতামত পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাছ ও কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ নির্ধারণে নদীর পানির তাপমাত্রা, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ওপর সমন্বিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।
তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রভাব শুধু মাটি ও পানিতেই সীমাবদ্ধ নয়, বায়ুদূষণের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, ‘তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে আমাদের কয়েকটি গবেষণায় বাতাস, পানি ও মাটিতে বিভিন্ন ধরনের দূষণকারী উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্র সাধারণত জনবসতি থেকে দূরে নির্মাণের আন্তর্জাতিক নীতি রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রেই বিষয়টি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। বর্তমানে কেন্দ্রটির সম্ভাব্য বিরূপ প্রভাবের যেসব অভিযোগ সামনে এসেছে, সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করে ক্ষতি কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া উচিত।’
বড় অঙ্কুজানপাড়া ও আশপাশ এলাকায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সম্ভাব্য দূষণের কারণে স্থানীয়দের স্বাস্থ্যগত সমস্যাও দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া, চর্মরোগ, অ্যালার্জি ও ত্বকের বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে অনেকে। আর্থিক কারণে অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবাও নিতে পারছে না বলেও দাবি।
তালতলীর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের আগে যথাযথ সম্ভাব্যতা ও পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা করা হয়নি বলে অভিযোগ তুলেছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হাফিজ আশরাফুল হক। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে বিস্তৃত সমীক্ষা করার কথা। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে এসব সমীক্ষা বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন ঘটায় না। নদী ও সাগরের মোহনার মতো পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় এবং লোকালয়ের এত কাছে একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হলে তার প্রভাব আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। আমাদের পর্যবেক্ষণেও সে ধরনের প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।’
তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কুলিং সিস্টেম নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এ গবেষক। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহৃত পানি সরাসরি নদীতে ফেলার সুযোগ নেই। সেটি পরিশোধন ও তাপমাত্রা কমিয়ে নদীতে ছাড়তে হয়। সবচেয়ে ভালো হয়, যদি সে পানি পুনর্ব্যবহার করা যায়। কিন্তু গরম পানি সরাসরি নদীতে ছাড়া হলে তা শুধু মাছের প্রজনন ও বিচরণে প্রভাব ফেলে না, পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্রকেই ব্যাহত করে। এর প্রভাব শুধু পানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, ধীরে ধীরে পুরো ইকোসিস্টেমে ছড়িয়ে পড়ে। তালতলীতেও তাই হচ্ছে।’








