শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন রেলযাত্রা নিশ্চিত করতে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। রাজধানীর কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোতে বাড়ানো হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি। টিকিটবিহীন যাত্রীদের প্রবেশ ঠেকাতে স্টেশনের প্রবেশমুখে তৈরি করা হবে জিগজ্যাগ বেষ্টনী। পাশাপাশি ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ বন্ধে নজরদারি, অতিরিক্ত কোচ চালু এবং বিশেষ টহলের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
গত ১২ অক্টোবর রেল ভবনে রেলসচিব ফাহিমুল ইসলামের সভাপতিত্বে ‘আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা, ২০২৬ সুষ্ঠুভাবে উদযাপন উপলক্ষে নির্বিঘ্ন রেলযাত্রা নিশ্চিতকরণে প্রস্তুতিমূলক সভায়’ এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেনসহ রেলওয়ে ও রেল পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভার কার্যবিবরণীর একটি কপি জাগো নিউজের হাতে এসেছে।
সভায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৬ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এপিবিএনসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়। স্টেশন দুটির প্রবেশমুখে যানজট নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েনের জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশকে (ডিএমপি) চিঠি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জয়দেবপুরসহ যেসব স্টেশনে প্রয়োজন, সেখানে অতিরিক্ত রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্য মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে।
সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯ ও ২০ অক্টোবর কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে ডগ স্কোয়াডসহ টহল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নকে (এসআরবি) চিঠি পাঠানো হবে। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ও এর আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ডিএমপি ও আরএনবির সমন্বয়ে কন্ট্রোল রুম স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
টিকিট ছাড়া প্রবেশ ঠেকাতে বেষ্টনী
উৎসবের সময় স্টেশনে যাত্রীদের ভিড় ও টিকিটবিহীন প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে বিশেষব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনের প্রবেশমুখে টিকিটধারী যাত্রীদের সহজে প্রবেশ নিশ্চিত করতে জিগজ্যাগ বেষ্টনী তৈরি করা হবে। পাশাপাশি স্টেশন দুটির আশপাশে মূল প্রবেশদ্বারের বাইরে থাকা অরক্ষিত প্রবেশপথগুলোতেও অস্থায়ী বেষ্টনী নির্মাণ করা হবে।
প্রকৃত টিকিটধারী যাত্রী ছাড়া কেউ যাতে ট্রেনে উঠতে না পারেন, সে জন্য অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ করে টিকিট পরীক্ষা করা হবে। ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ বন্ধে মই বা এ ধরনের সরঞ্জাম নিয়ে কাউকে স্টেশনে প্রবেশ করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালনে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিফট পরিবর্তনের সময় দায়িত্ব গ্রহণকারী দল দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার আগে কর্মরত দল যাতে কর্মস্থল ত্যাগ না করে, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাড়তি কোচ, পাঁচ ট্রেনের অফডে প্রত্যাহার
যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে ২৩টি মিটারগেজ ও ছয়টি ব্রডগেজ কোচের পাশাপাশি আটটি অতিরিক্ত কোচ চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৯ থেকে ২৪ অক্টোবরের মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের পাঁচটি ট্রেনের সাপ্তাহিক বন্ধের দিন (অফ ডে) প্রত্যাহার করা হবে।
ফলে নির্ধারিত সময়ে ট্রেন চলাচলের সুযোগ বাড়বে এবং যাত্রীদের যাতায়াত আরও সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চলবে ৩ জোড়া স্পেশাল ট্রেন
বাংলাদেশ রেলওয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দুর্গাপূজা উপলক্ষে তিন জোড়া স্পেশাল ট্রেন পরিচালনা করা হবে।
ট্যুরিস্ট স্পেশাল-১ ও ২: ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা রুটে আগামী ২০, ২৩ ও ২৪ অক্টোবর চলাচল করবে।
ঢাকা স্পেশাল-৩: চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে আগামী ২০ অক্টোবর চলাচল করবে।
চট্টগ্রাম স্পেশাল-৪: ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে আগামী ২৪ অক্টোবর চলাচল করবে।
পূজামণ্ডপে নজরদারি, চলবে ভ্রাম্যমাণ আদালত
নজরদারি থাকবে। রেললাইনে ট্রেন চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে রেল কর্তৃপক্ষ, পূজা উদযাপন কমিটি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমন্বয়ের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক তদারকি করবে। এছাড়া রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করবেন। যাত্রীসেবার মান বজায় রাখতে সব ট্রেনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বশীল আচরণ করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
দুর্গাপূজার নবমী ও দশমীতে জনসমাগম বেশি হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ১৯ ও ২০ অক্টোবর রেলপথ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে ভিজিল্যান্স টিম এবং সার্বিক তত্ত্বাবধান টিম গঠন করা হবে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে উৎসবের সময় যাত্রীদের নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও নির্বিঘ্ন রেলযাত্রা নিশ্চিত করতে চায় রেল কর্তৃপক্ষ।
সভায় রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, ‘এবারের দুর্গাপূজার সরকারি ছুটির সঙ্গে দুই দিন সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হওয়ায় ভ্রমণপিপাসু সাধারণ যাত্রীরা বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশে ট্রেনে ভ্রমণ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি যাত্রীচাপ পরিলক্ষিত হবে।’
এ সময় রেলের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রেখে দুর্গাপূজায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সার্বিক বিষয় নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে রেলপথ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেন রেলসচিব।
তিনি বলেন, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত কাজ হলো, ঘরমুখী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষকে সুষ্ঠু রেলসেবার মাধ্যমে নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া।
সভায় বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন তার কার্যালয়ের পক্ষ থেকে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন।
বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অধীন দপ্তরগুলোতে নির্দেশনা পাঠিয়েছে রেলওয়ে। জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (পূর্ব) মামুনুল ইসলাম বলেন, রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি আছে। আমাদের জানামতে, গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে সেভাবে ছুটি হবে না। যাত্রীদের চলাচল কেমন হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে প্রস্তুতি আরও বাড়ানো হবে।
তিনি বলেন, রেল ভবন থেকে আমরা নির্দেশনা পেয়েছি। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া আছে। আরও কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া হবে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ের প্রস্তুতিগুলো সম্পন্ন করা হয়েছে।








