পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে বাংলাদেশ: পাঁচ বছরে উৎপাদন বেড়েছে ৫১ শতাংশ

06 November, 2026

প্রকাশের সময়: 12:17 pm, 6th Nov, 2026

সর্বশেষ আপডেট: 12:17 pm, 6th Nov, 2026

প্রতি বছর অক্টোবর-নভেম্বর এলেই দেশের পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিত। স্থানীয় উৎপাদনে চাহিদা না মেটায় আমদানির ওপর ভরসা করতে হতো, আর প্রতিবেশী ভারত থেকে সরবরাহে বাধা এলেই দাম লাফিয়ে বাড়ত। এখন সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। গত পাঁচ বছরে পেঁয়াজের উৎপাদন বেড়েছে ৫১ শতাংশেরও বেশি, আর আমদানি কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। সরবরাহ বাড়ায় খুচরা বাজারে দামও নেমে এসেছে গত চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।

উৎপাদনের চিত্র

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছিল প্রায় ২৫ লাখ ১৭ হাজার টন। পরের বছর তা সামান্য বেড়ে হয় ২৫ লাখ ৪৭ হাজার টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন দাঁড়ায় ২৯ লাখ ১৭ হাজার টনে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩২ লাখ ২১ হাজার ৪৩১ টনে। সবশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেকর্ড ৩৮ লাখ ১৯ হাজার ৫৩০ টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। এক বছরে উৎপাদন বেড়েছে ১৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ, আর পাঁচ বছরে বেড়েছে ১৩ লাখ ২ হাজার ৫৩৩ টন, অর্থাৎ ৫১ দশমিক ৩১ শতাংশ।

আমদানি নেমেছে তলানিতে

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে পেঁয়াজ আমদানি হয়েছিল ৬ লাখ ২ হাজার ২৯ টন। পরের বছর তা বেড়ে হয় ৭ লাখ ৫১ হাজার টন। এরপর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি নামে ৬ লাখ ৫ হাজার টনে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৪ লাখ ৭৪ হাজার টনে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি ঠেকেছে মাত্র ৮৬ হাজার ৩৯৮ টনে। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত আমদানির প্রয়োজনই পড়েনি; চাহিদা মিটছে দেশীয় জোগানেই।

বার্ষিক চাহিদার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও খাতসংশ্লিষ্টদের ধারণা, তা প্রায় ৩০ লাখ টন। সংরক্ষণ ও পরিবহনকালীন অপচয় হিসাবে ধরলে চাহিদা দাঁড়ায় ৩৫ থেকে ৩৬ লাখ টনে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে পেঁয়াজের সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি ২৫ শতাংশের বেশি বলে উল্লেখ আছে। তাই উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এই অপচয় কমানোও বাজার স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।

সাফল্যের নেপথ্যে

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, উন্নত জাতের বীজ, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের আবাদ সম্প্রসারণ, অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের আগ্রহ উৎপাদন বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বলেন, কৃষক সেই ফসলের দিকেই ঝোঁকেন যেখানে ভালো দাম পান। গত কয়েক বছর পেঁয়াজের দাম তুলনামূলক ভালো থাকায় চাষ বেড়েছে, ফলে উৎপাদন বেড়েছে, আমদানি কমেছে এবং বাজারও স্থিতিশীল থেকেছে।

মসলা গবেষণা কেন্দ্র, বগুড়ার মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. মাসুদ আলম জানান, আগে সাধারণত শীতকালেই পেঁয়াজ চাষ হতো এবং দেশি পেঁয়াজ বলতে ছোট আকারেরই প্রাধান্য ছিল। এখন গবেষণার মাধ্যমে বড় আকারের জাত উদ্ভাবিত হয়েছে, যাতে ফলন বেড়েছে চার থেকে পাঁচ গুণ। বারি-৪ ও বারি-৬ জাতের একেকটি পেঁয়াজের ওজন ৪০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়। বারি-২, ৩ ও ৪ জাত সারা বছর চাষ করা যায় এবং দ্রুত তোলাও সম্ভব। তাঁর ভাষ্য, এসব কারণে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে এবং আমদানির প্রয়োজন কমেছে।

সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ছে

আমদানি ছাড়া চলতে পারার পেছনে সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধিও বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। চলতি বছর দেশে সংরক্ষিত পেঁয়াজের পরিমাণ ৮ লাখ ৭৮ হাজার ২৭৪ টন।

সংরক্ষণকালীন পচন ও ওজন কমে যাওয়া পেঁয়াজ চাষের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। প্রচলিত পদ্ধতিতে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল না থাকলে সংরক্ষিত পেঁয়াজ দ্রুত নষ্ট হয়, ফলে মৌসুমের পরে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা থাকে। এ সমস্যা মোকাবেলায় সরকার কৃষক পর্যায়ে এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণ করছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রণোদনা কর্মসূচিতে চার হাজার মেশিন দেওয়া হয়। গত অর্থবছরে প্রথম কিস্তিতে চার হাজার ও দ্বিতীয় কিস্তিতে ১৫ হাজার মেশিন বিতরণ করা হয়। অন্যান্য কর্মসূচিতে আরো ৩ হাজার ৭০০টি মেশিন দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে কৃষকের হাতে পৌঁছেছে ২৭ হাজার ৭০০টি মেশিন, যা সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়িয়েছে প্রায় তিন লাখ টন।

ভোক্তার স্বস্তি

সরবরাহ বেশি থাকায় এর সুফল পাচ্ছেন ভোক্তারা। রাজধানীর খুচরা বাজারে এখন প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে গতকাল রাজধানীতে খুচরা দাম ছিল কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৬০ টাকা। গত বছরের ৫ নভেম্বর একই পণ্যের দাম ছিল ১০০ থেকে ১২০ টাকা। ২০২৪ সালের একই দিনে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল ১৩০ থেকে ১৫০ টাকায়, আর আমদানীকৃত পেঁয়াজ ৮৫ থেকে ১২০ টাকায়। ২০২৩ সালের ৫ নভেম্বর দেশি পেঁয়াজের কেজি ছিল ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা।

কৃষকের লোকসান, ঝুঁকির আশঙ্কা

তবে উৎপাদন বাড়লেও ন্যায্যমূল্য না পেয়ে লোকসানে পড়ার অভিযোগ করছেন কৃষকরা। অধ্যাপক সাইফুল ইসলামও বলছেন, দাম কম থাকায় এবার কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে কৃষক পেঁয়াজ চাষ থেকে সরে যেতে পারেন, উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং আবারও আমদানিনির্ভরতা তৈরি হতে পারে।

বিশ্লেষকরা তাই কৃষককে প্রণোদনা ও ভর্তুকি দেওয়ার পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর ওপর জোর দিচ্ছেন। অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম আরো সতর্ক করেন, আলুর মতো পেঁয়াজেও যেন অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে দীর্ঘমেয়াদি সংকট না হয়। এজন্য চাহিদা ও সরবরাহের সঠিক তথ্য প্রকাশ করে সে অনুযায়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে হবে। তিনি মনে করেন, পেঁয়াজে সফলতা এসেছে; সমন্বিত উদ্যোগ নিলে অন্যান্য মসলাজাতীয় পণ্যেও স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব।

সরকারের লক্ষ্য

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, বাংলাদেশ এখন পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে। শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ নয়, ভবিষ্যতে উদ্বৃত্ত পেঁয়াজ রপ্তানির সক্ষমতা অর্জনও সরকারের লক্ষ্য। এজন্য গবেষণা, উন্নত বীজ সরবরাহ, এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণ এবং সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়নসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

শেয়ার করুন!