প্রতিবছর ইসরায়েলকে দেওয়া সহায়তা কর্মসূচি বন্ধ করছে ট্রাম্প প্রশাসন

06 November, 2026

প্রকাশের সময়: 09:27 pm, 6th Nov, 2026

সর্বশেষ আপডেট: 09:27 pm, 6th Nov, 2026

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স

বিধি বাম! তৃতীয় ইরান যুদ্ধের জন্য ‘সব প্রস্তুতি’ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে ‘চূড়ান্ত’ হামলার হুমকি দিয়ে প্রধান মিত্র ইসরায়েলকেই যেন ‘মেরে’ বসলেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প।

গত ৩ নভেম্বর ঐতিহাসিক মধ্যবর্তী বা কংগ্রেস নির্বাচনের দিনই ট্রাম্প আচমকা ঘোষণা দিলেন—প্রতিবছর ইসরায়েলকে দেওয়া ৪০০ কোটি ডলারের সহায়তা কর্মসূচি চলতি বছরেই শেষ হচ্ছে।

চুক্তি অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্র প্রধান মিত্র ইসরায়েলকে বার্ষিক যে ৩৮০ কোটি ডলার সহায়তা দেয় এর মধ্যে ৩০০ কোটি ডলার দেওয়া হয় বৈদেশিক সামরিক অর্থায়ন (এফএমএফ) ও ৫০০ মিলিয়ন দেওয়া হয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কর্মসূচির অংশ হিসেবে।

বলে রাখা দরকার এই কর্মসূচির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র যে অর্থ বরাদ্দ করে তা কিন্তু ইসরায়েলের কোষাগারে সরাসরি জমা হয় না। ইসরায়েলের প্রায় ১৪০ বিলিয়ন ডলারের বাজেটের কোথাও এর কোনো প্রতিফলনও থাকে না।

এফএমএফ সাহায্য দিয়ে ইসরায়েল আমেরিকান কোম্পানি থেকে সমরাস্ত্র কেনে বা তাদের সামরিক কাজে ব্যবহার করে, অর্থাৎ এই অর্থের অধিকাংশই আসলে ঘুরে গিয়ে আবার মার্কিন কোম্পানিগুলোর পকেটে ঢোকে। এই সাহায্য বন্ধ করা মানে হলো, প্রকারান্তরে ইসরায়েলকে এবার থেকে মার্কিন কোম্পানির সমরাস্ত্র বা সেবা কিনতে হলে নিজের টাকা খরচ করতে হবে।

সেদিন ট্রাম্প মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে জানান, ইসরায়েলকে দেওয়া অর্থ বন্ধের বিষয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে চুক্তি হয়েছে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলবিরোধী জনমত ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় ইসরায়েলে মার্কিন অর্থ সহায়তা কমানোর বিষয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বক্তব্য ছিল, তারা বিদেশি নির্ভরতা কমাতে চায়।

সম্ভাব্য মার্কিন সহায়তা বন্ধের বিষয়ে তিনি বিভিন্ন সময় সাংবাদিকদের বলেন, ইসরায়েল এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম।

তার এমন বক্তব্যকে সমালোচকেরা ‘দাম্ভিকতা’ বলে মনে করতেন। অনেকের আশঙ্কা—এর ফলে ইসরায়েল দুর্বল হয়ে পড়বে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন—ইসরায়েলে যখন নেতানিয়াহু সরকারকে সরানোর চেষ্টা করছে বিরোধীরা, আর এককভাবে বেশি আসন পাওয়া নেতানিয়াহুর দল যখন ‘ঐকমত্যের’ সরকার গড়ার চেষ্টা করছে; তখন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ট্রাম্পের কাছ থেকে এমন ‘বিস্ফোরক’ মন্তব্য দেশটিতে যেন ‘ক্ষেপণাস্ত্রের’ মতো এসে পড়ে।

এই আচমকা ‘হামলা’ শত্রু ইরান থেকে আসেনি। এসেছে সুদূর আটলান্টিকের পশ্চিমপারের ‘প্রিয় দেশ’ যুক্তরাষ্ট্র থেকে। শুধু তাই নয়, ‘প্রিয় বন্ধু’ ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে। একেবারে অসময়ে।

অর্থাৎ, ঘোষণাটি এমন সময়ে এসেছে—যখন ইসরায়েল রাজনৈতিকভাবে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং গাজায় গণহত্যার কারণে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে—ইসরায়েলের সাম্প্রতিক নেসেট নির্বাচনের পর নেতানিয়াহু ‘জনসম্মুখে’ আসেননি। তার কাছ থেকে ট্রাম্পের টাকা বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানা যায়নি।

একইভাবে ট্রাম্প প্রশাসন থেকেও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিভাবে কিছু বলা হয়নি।

তবে ট্রাম্পের ঘোষণায় ইসরায়েলের সরকারি কর্মকর্তারা যেমন ‘বিস্ময়’ প্রকাশ করেছেন, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে এমন তিক্ততা আসায় ইসরায়েলের বিরোধী দলগুলো তাদের ‘বিদায়ী’ প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে দায়ী করছে।
৮০ বছরের সহায়তায় ‘ছেদ’?

একটু পেছনে ফেরা যাক। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন অঞ্চলে স্থানীয় অধিবাসীদের চরম আপত্তি সত্ত্বেও ইউরোপ থেকে আসা অভিবাসী ইহুদিদের নিয়ে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্র মিত্র ইসরায়েলকে আর্থিক ও সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে।

গত ৪ নভেম্বর তুরস্কের সরকারি বার্তা সংস্থা আনাদোলু আজেনসি ১৯৪৮ সাল থেকে ইসরায়েলে মার্কিন সহায়তার ওপর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে জানানো হয়—যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, সারাবিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র যে পরিমাণ নিরাপত্তা সহায়তা দেয় তার বেশিরভাগ পায় ইসরায়েল।

সংবাদ প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশসন (সিএফআর) বলেছে—ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ সহায়তা পেয়েছে।

১৯৭১ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইসরায়েল প্রচুর আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। বর্তমানে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সহায়তা হিসেবে বেশি অর্থ পাচ্ছে।

২০২৫ সালের এপ্রিলে সিএফআর-এর অপর এক প্রতিবেদনে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বলা হয়েছিল, ১৯৪৮ সালের পর থেকে ইসরায়েল ১৩ হাজার কোটি ডলারের বেশি সহায়তা পেয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, এ বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য: রাষ্ট্রপতি হ্যারি ট্রুম্যানের সময় থেকে এবং এরপর যত প্রশাসন এসেছে, সবাই ইসরায়েলের নিরাপত্তার বিষয়কে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে দেখেছে।

সিএফআর-প্রতিবেদন বলছে—দশকের পর দশক ধরে ইসরায়েল তার শত্রুদের বিরুদ্ধে মার্কিন অস্ত্র ব্যবহার করেছে। ১৯৮০-এর দশকে ইসরায়েলের ভেতরে যুক্তরাষ্ট্র নিজের তত্ত্বাবধানে ‘অস্ত্রভাণ্ডার’ গড়ে তুলে।

২০২৩ সালে ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠন হামাস গাজা থেকে ইসরায়েলে রক্তক্ষয়ী হামলা চালালে ওয়াশিংটন সরাসরি সামরিক সহায়তা হিসেবে তেল আবিবকে ১৬০ কোটি ডলারের বেশি অনুমোদন দেয়।

এই সহায়তার মধ্যে ছিল ২০২৪ সালের এপ্রিলে ৮৭০ কোটি ডলার এবং ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বার্ষিক অনুদান ৩৮০ কোটি ডলার।

সামগ্রিক সহায়তার মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য ৬৭০ কোটি ডলার বরাদ্দ ছিল বলেও প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনে বলা হয়।

ভোটের দিন ট্রাম্প ইসরায়েলে অর্থ সহায়তা বন্ধের যে কথা জানিয়েছেন, চুক্তি অনুসারে তা ২০২৮ সালে শেষ হওয়ার কথা।

এফএমএফ কর্মসূচির মাধ্যমে ইসরায়েলকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানসহ বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক সামরিক উপকরণ সরবরাহ করা হয়।

বিশ্লেষকদের অনেকের ভাষ্য: ট্রাম্প ইসরায়েলকে বার্ষিক অর্থ সহায়তা বন্ধের ঘোষণা দিয়ে নিজ দেশের ভোটারদের এটা বোঝাচ্ছেন যে, তিনি বৈদেশিক খরচ কমাচ্ছেন। অন্যদিকে, নেতানিয়াহু তার সমর্থকদের বোঝাচ্ছেন যে ইসরায়েল মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে। তিনি ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ‘স্বাধীন’ করার ওপর জোর দিচ্ছেন।

ইসরায়েলের জ্যেষ্ঠ অর্থনৈতিক কর্মকর্তাদের অনেকে মনে করছেন, ট্রাম্পের ঘোষণা যদি সত্য হয় তাহলে এর ফল ভয়াবহ হবে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরদিন সিএনএন জানায়, ট্রাম্পের বিস্ফোরক তথ্য ইসরায়েলকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এই ঘটনাকে ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটনের বহু বছরের সুসম্পর্ক-নীতিতে ‘অভাবনীয় ফাটল’ বলে মন্তব্য করা হয়।

তাদের চাপে ট্রাম্প ইসরায়েলে সহায়তা বন্ধের বিষয়ে ঘোষণা দিয়েছেন বলে মনে করছে ডেমোক্র্যাটদের ‘প্রগতিবাদী’ অংশ। মিশিগানের নবনির্বাচিত সেনেটর আবদুল এল-সাইয়েদ ট্রাম্পকে কটাক্ষ করে বলেন, ‘নষ্ট ঘড়িও দিনে ২ বার সঠিক সময় দেয়!’


ইসরায়েলকে নতুন করে ‘বুড়ো আঙুল’?

গত মাস ছয়েক ধরে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই বলে আসছিলেন—যুক্তরাষ্ট্রে এবারের মধ্যবর্তী বা আইনসভা কংগ্রেস নির্বাচনে ‘নীল সুনামি’ হলে বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না। নীল হচ্ছে ডেমোক্র্যাটদের প্রতীকী রঙ।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন পার করে মধ্যরাতেই দেখা গেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থীদের পক্ষে ‘জনজোয়ার’। সেই সময় যত বাড়লো সেই ‘জোয়ার’ পরিণত হলো ‘সুনামিতে’। অর্থাৎ, কংগ্রেসের নিম্ন ও উচ্চকক্ষ উভয়টিতেই ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল।

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সেনেটের ১০০ আসনের মধ্যে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নিয়ন্ত্রণে ৫৪ আসন। ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির পক্ষে আসন ৪৪টি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৫১ আসন।

কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস বা প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫ আসনের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে ২৩১ ও রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে ১৩৯ আসন।

যা হোক, মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন ফক্স নিউজের মতো একটি ‘বিস্ফোরক’ সংবাদ প্রকাশ করে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।

সেদিন সংবাদমাধ্যমটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়—ইরান সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গোয়েন্দা তথ্য পাঠিয়েছিল ইসরায়েল। তাতে বলা হয়েছিল: ইরান রাসায়নিক বোমা হামলার কথা ভাবছে।

তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের মতো মধ্যপ্রাচ্যের অনেক কর্মকর্তা বিষয়টিকে আমলে নেননি বলেও সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

মার্কিন কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করছেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সরকার আবারও ইরান যুদ্ধে নামার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে এমন গোয়েন্দা তথ্য দিচ্ছে। অন্য একটি পক্ষ বলছে, এমন হুমকিকে ‘গুরুত্বের’ সঙ্গে নেওয়া উচিত। কেননা, ইরান সরকার মার্কিন স্বার্থে হামলার হুমকি বারবার দিয়ে আসছে।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়—ইসরায়েল এমন গোয়েন্দা তথ্য মধ্যপ্রাচ্যে মিত্র দেশগুলোকেও জানিয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকটি দেশ এই তথ্যকে সন্দেহের চোখে দেখেছে। তাদের বিশ্বাস, ইসরায়েল আবারও যুক্তরাষ্ট্রকে উসকানি দিচ্ছে ইরান যুদ্ধ শুরু করার জন্য।

ইরান প্রকাশ্যে বলছে, তাদের হাতে রাসায়নিক অস্ত্র নেই। দেশটির অভিযোগ: এটি ইসরায়েল ও নেতানিয়াহু মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।

সংবাদ প্রতিবেদন অনুসারে—মার্কিন কর্মকর্তাদের অনেকে বলছেন, ২০০২ সালে মার্কিন সংস্থার ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ইরাকে হামলা চালিয়েছিল জর্জ বুশ জুনিয়র প্রশাসন। সেসময় বলা হয়েছিল, ইরাকের হাতে ‘গণবিধ্বংসী’ অস্ত্র আছে। কিন্তু, ন্যাটোসহ অন্যান্য মিত্রদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ‘শত্রু’ ইরাককে ধ্বংস করার পর পরিষ্কার হয়, ইরাকের হাতে কোনো ‘গণবিধ্বংসী’ অস্ত্র নেই।

এতে আরও বলা হয়, অতীতের সেসব ‘ভুল ও ধ্বংসাত্মক’ গোয়েন্দা তথ্য ও এর ওপর ভিত্তি করে নেওয়া সিদ্ধান্তের কথা স্মরণ করছেন মার্কিন কর্মকর্তাদের একাংশ।

অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে ইসরায়েল এমন তথ্য দিলেও এর সঙ্গে কোনো প্রমাণ দেখায়নি। তাই তারা ইসরায়েলের এমন তথ্যকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি।

হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে এক মার্কিন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেছেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের সম্ভাব্য হুমকি থেকে রক্ষার চেষ্টা করবেন। এ বিষয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ সংবাদমাধ্যমটির কাছে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।


‘ভোটে হারার কারণ ইসরায়েল’

নির্বাচন হলো যুক্তরাষ্ট্রে, হারলো ট্রাম্পের রিপাবলিকান দল। এই হেরে যাওয়ার জন্য এখন দায়ী করা হচ্ছে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে। যুক্তরাষ্ট্রের খোদ উপ-রাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স বলছেন, ভোটাররা ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ‘পরিবর্তন’ চায়।

গত ৪ নভেম্বর ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল এক প্রতিবেদনে জানায়—জরিপে দেখা গেছে, মার্কিন ভোটাররা ৪টি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন—(১) ইরান যুদ্ধ বন্ধ (২) জীবনযাত্রার খরচ কমানো (৩) আমেরিকার স্বার্থ আগে দেখতে হবে ও (৪) ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে পরিবর্তন।

জেডি ভ্যান্সের মন্তব্য, ‘যুদ্ধের কারণে আমরা হেরেছি। গতরাতে রাষ্ট্রপতি নিজেও এমনটি বলছেন।’

এ কথা সবার জানা যে, এই যুদ্ধ বলতে মার্কিন উপ-রাষ্ট্রপতি চলমান ইরান যুদ্ধকেই বুঝিয়েছেন। এই ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে টেনে এনেছিল ইসরায়েল। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নেতানিয়াহু ভেবেছিলেন তার দেশে নেসেট নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালালে তিনি ভোটের বাক্সে বাড়তি সুবিধা পাবেন।

কিন্তু, বাস্তবে দেখা গেল নেসেট নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট বেশি আসন পেলেও সরকার গড়ার মতো পর্যাপ্ত আসন পায়নি। এখন নেতানিয়াহুকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরানোর চেষ্টা করছে বিজয়ী বিরোধীরা।

কেউ কেউ বলছেন, নেতানিয়াহু শুধু নিজ দেশে হারেননি; তিনি মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বন্ধু ট্রাম্পের দলকেও ডুবিয়েছেন।

কেননা, ইরানে মার্কিন হামলার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় এর কুপ্রভাব পড়ে মার্কিন বাজারেও।

যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির পাশাপাশি নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটাররা ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, বলে জানাচ্ছেন রিপাবলিকান দলের পরাজিত প্রার্থীরাও।

উপসংহার

দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ককে উভয় দেশের নেতারা ‘ইস্পাতকঠিন’ বলে আখ্যা দিয়ে আসছেন।

ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর নেতানিয়াহু সরকার গাজায় গণহত্যা চালায় এবং দখল করা পশ্চিমতীরে জাতিগত নিধন চলমান রাখে। এসব কারণে যখন বিশ্বব্যাপী ইসরায়েলকে ধিক্কার দেওয়া হয় তখনো হোয়াইট হাউস থেকে ‘ইস্পাতকঠিন’ সম্পর্কের বার্তা আসে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগ পর্যন্তও ট্রাম্প সেই ‘ইস্পাতকঠিন’ সম্পর্কের কথা বলেছেন। এমনকি, অর্থ সহায়তা বন্ধের পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ঘোষণাও দেন তিনি। বিশ্লেষকরা এবার ‘ফাটল’ দেখছেন সেই ‘ইস্পাতকঠিন’ সম্পর্কেও।

উপরন্তু, গত ৩ নভেম্বর মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ইসরায়েলবিরোধী বক্তব্য দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাটরা ‘অভাবনীয়’ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। তাই আর্থিক সহায়তা বন্ধের পাশাপাশি ইসরায়েলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নতুন নতুন চাপ আসতে পারে, বলেও মনে করছেন অনেকে।

তাই, আবারও বলতে হয় ‘বিধি বাম’!

যে ইরানে নতুন করে হামলার জন্য ট্রাম্প-নেতানিয়াহু প্রস্তুত আছেন, সেই ইরানে হামলা না হয়ে ‘হামলা’ হলো তেল আবিবে। ওয়াশিংটন থেকে তেল আবিবের যে দূরত্ব সৃষ্টি হলো তা বেড়ে কতদূর যায়, এখন যেন তাই দেখার বিষয়।


এক নজরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক

  • ইসরায়েলের ওপর হামলাকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলা বলে মনে করেন অনেক মার্কিন রাজনীতিক।
  • ইসরায়েলের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ২ দল, অর্থাৎ, রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এক সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয়।
  • ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইসরায়েলকে ‘রক্ষা’ করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।
  • সারা দুনিয়ায় যেসব দেশকে যুক্তরাষ্ট্র যতটা সহায়তা দেয় এর বেশিরভাগ পায় ইসরায়েল।
  • যুক্তরাষ্ট্র সর্বাধুনিক অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম ইসরায়েলকে আগে দেয়।
  • অন্য দেশকে সর্বাধুনিক অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম দেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র দেখে নেয় তা ইসরায়েলের জন্য ক্ষতিকর হবে কি না।
  • যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলপন্থি নেতা বাছাইয়ে অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়।
  • আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসরায়েল আগলে রাখে যুক্তরাষ্ট্র।
  • এমনকি, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

শেয়ার করুন!