দরপত্র উন্মুক্তের এক মাসেও মেলেনি কার্যাদেশ, ভরা মৌসুমে সার সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা

14 September, 2026

প্রকাশের সময়: 03:51 pm, 14th Sep, 2026

সর্বশেষ আপডেট: 03:51 pm, 14th Sep, 2026

আমদানিকারকরা জানান, আগে কৃষি মন্ত্রণালয় ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে দরপত্র আহ্বান করতো। পরবর্তী এক মাসের মধ্যেই চূড়ান্তভাবে কার্যাদেশ দেয়া হতো।

বেসরকারিভাবে সাড়ে নয় লাখ টন নন-ইউরিয়া সার আমদানি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। দরপত্র উন্মুক্ত হওয়ার প্রায় এক মাস হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এখনো কার্যাদেশ পাননি আমদানিকারকরা। এতে রবিশস্যের ভরা মৌসুমে (পিক সিজন) বেসরকারিভাবে আমদানি করা সার সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও আমদানিকারকরা বলছেন, ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর কৃষক পর্যায়ে সার পৌঁছাতে ৮০-৯০ দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়। খুব দ্রুত ও স্বল্প দূরত্বের উৎস থেকে আনলেও সেটি মাঠপর্যায়ে পৌঁছতে দেড় মাস লেগে যায়। ফলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটাতে না পারলে সার নিয়ে সংকট আগামী শীতকালীন মৌসুমেও সরকার ও কৃষককে ভোগাবে।

গত ৩ আগস্ট বেসরকারিভাবে নন-ইউরিয়া সার আমদানির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কৃষি মন্ত্রণালয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ভর্তুকির আওতায় বেসরকারি আমদানিকারকদের মাধ্যমে দুই লাখ টন ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি), পাঁচ লাখ টন ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ও আড়াই লাখ টন মিউরেট অব পটাশ বা এমওপি সার সংগ্রহের কথা বলা হয়। ১৮ আগস্ট দরপত্র উন্মুক্ত করা হয়। তবে বেসরকারি আমদানিকারকদের দেয়া দর প্রস্তাবের পর চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে কৃষি মন্ত্রণালয় অংশগ্রহণকারীদের একটি নির্দিষ্ট দর প্রস্তাব করে এবং তাতে সম্মতি চায়। আমদানিকারকরা সম্মতি দিলেও গতকাল পর্যন্ত চূড়ান্ত অনুমোদন মেলেনি। ফলে তারা ঋণপত্রও খুলতে পারছেন না।

আমদানিকারকরা জানান, আগে কৃষি মন্ত্রণালয় ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে দরপত্র আহ্বান করতো। পরবর্তী এক মাসের মধ্যেই চূড়ান্তভাবে কার্যাদেশ দেয়া হতো। ফলে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মধ্যে বেসরকারিভাবে আমদানি করা সার দেশের সরবরাহশৃঙ্খলে যুক্ত হয়ে যেত। এবার সেই প্রক্রিয়া সেপ্টেম্বরেও শেষ হয়নি। ফলে শীত মৌসুমের আগে বেসরকারিভাবে আমদানি করা সব সার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আমদানি আদেশ দেরির বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্টরা জানান, নন-ইউরিয়া সার আমদানির জন্য আগে কৃষি মন্ত্রণালয়ই অনুমোদন দিতো। তবে এবারই প্রথম সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার কমিটিতে এটি অনুমোদনের জন্য উঠছে। গত সপ্তাহে কমিটি ৩০ হাজার টন এমওপি আমদানির অনুমোদন দিয়েছে।

বেসরকারিভাবে সার আমদানির সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘নন-ইউরিয়া সার আগে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ৮০ শতাংশ এবং বিএডিসি ২০ শতাংশ আমদানি করত। এখন উল্টো হয়ে বিএডিসি আনে ৮০ শতাংশের মতো। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে সরকারের মিটিং হয়। সেখানে কী পরিমাণ সারের চাহিদা থাকবে, কতটুকু আমদানি করতে হবে এবং সরকার কতটুকু আনবে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কতটা আনবে তা নির্ধারণ হয়। এরপর টেন্ডার হয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে মে থেকে জুনের মধ্যে কার্যাদেশ দেয়া হতো। খুব দেরি হলে সেটি জুলাইয়ে যেত। এবার সেপ্টেম্বরেও এখনো কার্যাদেশ নেই। আমরা ২৪ ঘণ্টা কাজ করে দ্রুত সার পৌঁছে দিই। এর পরও মধ্যপ্রাচ্য থেকে দেশে সার আসতে এক মাস, মরক্কো থেকে আনতে দেড় মাস লাগে। কৃষকের হাতে পৌঁছাতে আরো কিছু সময় লাগে। আমরা উৎস কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি, কিন্তু এক মাসেও কার্যাদেশ নেই। সরকারি লিস্টে আমার প্রতিষ্ঠান আছে কিনা জানি না। তাহলে কীভাবে সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ চালাব?’

তিনি আরো বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সরকারের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে আমদানিকারকদের। সেখানে বলেছি, আজ অনুমতি দিলে এক মাসে আমরা সার পৌঁছে দেব। এখন সার নিয়ে সংকট চলছে। এ মুহূর্তে জরুরি আমদানি প্রয়োজন। কার্যাদেশ প্রদানে দেরি হলে পরবর্তী পিক সিজনে সারের সরবরাহশৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটতে পারে।’

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গতকাল পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের হাতে ডিএপি মজুদ ছিল ৩ লাখ ২৭ হাজার টন। এমওপি ১ লাখ ৭১ হাজার ও টিএসপি মজুদ ছিল ৩ লাখ ৬৫ হাজার টন। বিএডিসির হিসাবে, চলতি সেপ্টেম্বর থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পিক সিজনে দেশে ডিএপির চাহিদা হবে ১১ লাখ ২৭ হাজার টন। একই সময়ে এমওপির চাহিদা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৭২ হাজার টন। আর পিক সিজনে টিএসপির চাহিদা নির্ণয় করা হয়েছে ৫ লাখ ১৯ হাজার টন।

আমন মৌসুম ঘিরে দেশে সার নিয়ে অরাজকতার অভিযোগ রয়েছে। কুড়িগ্রামে সার না পেয়ে ডিলারের গুদাম ভেঙে সার নিয়ে গেছেন কৃষক। অধিকাংশ জেলায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও কেজিতে ১০-১৫ টাকা বেশিতে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। সার সরবরাহ মনিটরিংয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে কন্ট্রোল রুমও চালু হয়েছে। বেশ কয়েকটি জেলার কৃষি কর্মকর্তাকে বদলিও করা হয়েছে। এর পরও সার নিয়ে অস্থিরতা কাটেনি।

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শীত মৌসুমে দেশে সারের চাহিদা সর্বাধিক থাকে। এমনিতেই দেশের বিভিন্ন জেলায় সার নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে যতটা সম্ভব সারের মজুদ ও সরবরাহ ঠিক রাখা জরুরি।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি অর্থনীতির শিক্ষক অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সার কৃষি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শীত মৌসুমে এর চাহিদা সর্বাধিক থাকে। ওই মৌসুমও আমাদের কৃষির সবচেয়ে বড় মৌসুম। ফলে সে সময় সারের চাহিদা বেশি থাকাই স্বাভাবিক। তখন যাতে সার নিয়ে কোনো সংকট তৈরি না হয় সেজন্য আগে থেকেই আমদানির কাজ সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি কৃষক ঠিকমতো সার পাচ্ছেন কিনা সেটিও তদারক করতে হবে। দেশীয় কারখানাগুলোর উৎপাদনও স্বাভাবিক রাখতে হবে। অন্যথায় কৃষক সার নিয়ে সংকটে পড়লে সেটি দেশের সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ সম্প্রতি বলেন, ‘দেশে সারের কোনো সংকট নেই। শীতকালীন মৌসুমেও কোনো সংকট হবে না। সারের যথেষ্ট মজুদ আছে। আমদানি কার্যক্রমও চলমান আছে। প্রতি মাস ও মৌসুমে কী পরিমাণ চাহিদা রয়েছে, সে অনুযায়ী আমদানি করা হচ্ছে।’

বণিক বার্তা অবলম্বনে

শেয়ার করুন!