ফরিদপুরে ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। নতুন করে দুজনের মৃত্যুতে চলতি মৌসুমে জেলায় মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ জনে। অথচ সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের ৬৬ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত ফরিদপুর পৌরসভায় মশক নিধনে সচল ফগার মেশিন রয়েছে মাত্র ১০টি।
ওষুধ না ছিটানো এবং নামমাত্র পরিচ্ছন্নতা অভিযানের কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাসিন্দারা। তবে পৌরসভার দাবি, চরম অর্থসংকট ও যন্ত্রপাতি ঘাটতির কারণেই থমকে আছে মশা নিধন কার্যক্রম।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মশা নিধনের জন্য ওষুধ ছিটানোর নিয়ম থাকলেও এসব কার্যক্রম চোখে পড়ে না। পরিষ্কার-পরিছন্নতা অভিযানও তেমন দেখা যায় না। ফলে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। জেলা স্বাস্থ্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত তিন মাসে ফরিদপুরের ছয়জনসহ জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ৯ জন ডেঙ্গুতে মারা গেছেন। আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন অন্তত দেড় হাজার জন। প্রতিদিন গড়ে শতাধিক ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।
ফরিদপুর পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, ফরিদপুর পৌরসভায় আগে ওয়ার্ড ছিল ৯টি। পরে তা বাড়িয়ে ২৭টি করা হয়েছে। ৬৬ দশমিক ৫৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ পৌর এলাকায় পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বসবাস করেন। ওয়ার্ড ও সেবার পরিধি বাড়লেও মশক নিধন কার্যক্রম ও যন্ত্রপাতির সংখ্যা বাড়েনি। পৌরসভায় বর্তমানে মাত্র ১০টি ফগার মেশিন ও ১০টি স্প্রে মেশিন রয়েছে। এর মধ্যে কোনোটি বিকল হলে তা মেরামত না করে অযত্নে ফেলে রাখা হয়। এতে সচল যন্ত্রের সংখ্যা আরও কমে যায়। ফলে পৌরসভার পুরো এলাকায় প্রয়োজনমতো কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
কর্তৃপক্ষের দাবি, মশক নিধন কার্যক্রমের অর্থায়নেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন এ প্রতিষ্ঠানে এবার সরকারি বরাদ্দ এসেছে মাত্র পাঁচ লাখ টাকা।
পৌরবাসীর ভাষ্যমতে, মূল শহর ছাড়াও ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের সিংপাড়া ও রথখোলা, ১০ নম্বর ওয়ার্ডের আলিপুর ও বান্ধবপল্লী, মোল্লাবাড়ি সড়ক, শরীয়তুল্লাহ বাজার সংলগ্ন বেশ কয়েকটি এলাকা মশার প্রকোপ বেশি। তবে মশক নিধনে তেমন কার্যক্রম চোখে পড়ে না।
আবরাব নাদিম ইতু নামের এক যুবক বলেন, ‘হঠাৎ মশার উপদ্রব ও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এ বিষয়ে এখনই কার্যকর জোরালো পদক্ষেপ না নিলে প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।’জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে বাসায় বিশ্রাম নিচ্ছেন শ্রাবণ হাসান। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, দিনে-রাতে সবসময় মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ। বাসায় থাকা যায় না। কয়েলেও কাজ হয় না। কালেভদ্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নামমাত্র মশার ওষুধ ছিটানো হলেও এ কার্যক্রম প্রায় বন্ধ। সবশেষ কবে ওষুধ ছিটানো হয়েছে তা বলা মুশকিল।’হারুন অর রশীদ নামের একজন ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ‘ডেঙ্গু রোধে কার্যক্রম নেই বললেই চলে। কোনোমতে কিছু করলেও তা অনেকটা লোকদেখানো।’
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ফরিদপুর জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাসানুজ্জামান বলেন, ‘জেলা শহরের মতো একটি পৌরসভায় এত কম যন্ত্র থাকতে পারে? এতে দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টিই উঠে আসে। ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার, পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।’
জানতে চাইলে ফরিদপুর পৌরসভার কনজারভেন্সি ইন্সপেক্টর বিকাশ দত্ত বলেন, ‘সারা বছরই আমাদের কার্যক্রম চলমান থাকে। বিশেষ করে এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসের কার্যক্রম চলে সারা বছরই। তবে যন্ত্রপাতি সংকটের কারণে পুরো এলাকা একসঙ্গে না করে ধাপে ধাপে বিভিন্ন এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।’
এ বিষয়ে ফরিদপুর পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তানজিলুর রহমান বলেন, মশক নিধনের কার্যক্রমে সরকার থেকে যে অর্থ পাওয়া যায়, তা একমাসও চলা কঠিন হয়ে যায়। বাকি অর্থ আমাদের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হয়।
তিনি আরও বলেন, মশার প্রকোপ ও মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় পৌরসভায় জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। ওই বৈঠকে মাঠ পর্যায়ের কর্মসূচি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।








