প্রতিবেশী দেশগুলোয় ব্যবহার বাড়লেও কৃষি, দুর্যোগ ও জনসেবায় ড্রোন প্রযুক্তিতে পিছিয়ে বাংলাদেশ

30 September, 2026

প্রকাশের সময়: 04:44 pm, 30th Sep, 2026

সর্বশেষ আপডেট: 04:44 pm, 30th Sep, 2026

বাংলাদেশে ড্রোনের ব্যবহার এখনো তুলনামূলক সীমিত। দেশে ড্রোনের উড্ডয়ন ও ব্যবহার ‘ড্রোন নিবন্ধন ও উড্ডয়ন নীতিমালা, ২০২০’-এর আওতায় নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।

কৃষি জমিতে কীটনাশক ছিটানো থেকে শুরু করে বন্যার পানিতে আটকে পড়া মানুষ শনাক্ত, ফসলের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ কিংবা দুর্যোগের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ—বিভিন্ন জনসেবামূলক কাজে ড্রোনের ব্যবহার বাড়ছে এশিয়ার দেশগুলোয়। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ায় সরকারি সহায়তা ও নীতিগত উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিটির ব্যবহার বিস্তৃত হচ্ছে। বাংলাদেশেও এসব ক্ষেত্রে ড্রোন ব্যবহারের যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকলেও তা এখনো মূলত গবেষণা, সরকারি প্রকল্প, চিত্রধারণ ও বিনোদনের মধ্যেই সীমিত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ মূল্য, আমদানিতে করের চাপ এবং জটিল অনুমোদন প্রক্রিয়া ড্রোনের বাণিজ্যিক ও জনসেবামূলক ব্যবহার বিস্তারে বড় বাধা।

ভারতে কৃষি খাতে ড্রোন ব্যবহারে রয়েছে সরকারি সহায়তা। কৃষকদের ড্রোন কেনায় ভর্তুকির পাশাপাশি ভাড়ায় ড্রোন সেবা এবং নারী স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে ড্রোন পরিচালনার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। একটি প্রকল্পের আওতায় সাড়ে ১৪ হাজার নির্বাচিত নারী স্বনির্ভর গোষ্ঠীকে ড্রোন দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে দেশটির সরকারের। এতে ড্রোন ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের মূল্যের ৮০ শতাংশ পর্যন্ত, সর্বোচ্চ ৮ লাখ রুপি সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে।

পাকিস্তানের পাঞ্জাবে তুলার পোকা দমনে ড্রোন দিয়ে কীটনাশক ছিটানোর ব্যবহার শুরু হয়েছে। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষও বন্যার সময় উদ্ধারকাজ ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নিয়েছে ড্রোন ব্যবহারের উদ্যোগ। শ্রীলংকায় কৃষির ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে স্যাটেলাইট ও ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহারের সরকারি উদ্যোগ রয়েছে। মিয়ানমারেও সরকারি কৃষি প্রকল্পে ড্রোনের মাধ্যমে ফসলের তথ্য সংগ্রহ করে রিমোট সেন্সিং ও ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থার (জিআইএস) সাহায্যে উৎপাদন নিরূপণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

ভিয়েতনামের মেকং ডেল্টায় ধানখেতে কীটনাশক প্রয়োগ ও কৃষি পর্যবেক্ষণে ড্রোন ব্যবহার হচ্ছে। মালয়েশিয়ায় কৃষি ড্রোন পরিচালকদের লাইসেন্স দেয়ার পাশাপাশি ২০২৫ সালে সাড়ে তিনশ অপারেটরকে বিনামূল্যে লাইসেন্স দেয়ার উদ্যোগও নেয়া হয়। ফলে এসব দেশে ড্রোন ধীরে ধীরে চিত্রধারণের প্রযুক্তির সীমা পেরিয়ে কৃষি ও জনসেবার কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে।

বাংলাদেশে ড্রোনের ব্যবহার এখনো তুলনামূলক সীমিত। দেশে ড্রোনের উড্ডয়ন ও ব্যবহার ‘ড্রোন নিবন্ধন ও উড্ডয়ন নীতিমালা, ২০২০’-এর আওতায় নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সদস্য (ফ্লাইট স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড রেগুলেশনস) এয়ার কমোডর মো. মনিরুল ইসলাম জানান, বিভিন্ন শ্রেণীর ড্রোন ব্যবহারের জন্য চাহিদার ভিত্তিতে অনুমোদন দেয়া হয়। নির্ধারিত ফরমে আবেদন পাওয়ার পর প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে যাচাই-বাছাই শেষে দেয়া হয় এ অনুমোদন।

কৃষিতে ড্রোনের ব্যবহার নিয়ে এয়ার কমোডর মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘কৃষি খাতে আবেদন এলেও তা এখন পর্যন্ত মূলত সরকারি গবেষণা ও প্রকল্পকেন্দ্রিক। কৃষক পর্যায়ে ব্যক্তিগতভাবে কৃষিকাজে ড্রোন ব্যবহারের আবেদন তেমন পাওয়া যায় না। একইভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকেও উল্লেখযোগ্য আবেদন আসছে না।’

বড় কৃষি জমিতে দ্রুত কীটনাশক প্রয়োগ, ফসলের রোগবালাই শনাক্ত, বন্যা বা নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পর্যবেক্ষণ এবং দুর্গম অঞ্চলের পরিস্থিতি দ্রুত বুঝতে ড্রোন এখন সবচেয়ে বেশি কার্যকর। প্রতিবেশী দেশগুলোও তাই প্রযুক্তিটির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে। যদিও বাংলাদেশে কৃষিতে ড্রোনের ব্যবহার গবেষণা পর্যায়েই রয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিকল্পনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের পরিচালক মো. রওশন আলম। তিনি বলেন, ‘ফসলের ধরন ও উৎপাদন এলাকা শনাক্তকরণ, বিভিন্ন কৃষি অঞ্চল নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে ন্যানো কীটনাশক প্রয়োগে ড্রোন ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তবে প্রযুক্তিটি মাঠপর্যায়ে নেয়ার আগে এর কার্যকারিতা, পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’

দেশে কৃষি ড্রোন তৈরির উদ্যোগও নতুন নয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম আহসান জানান, ২০১৫-১৬ সালের দিকে কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য তিনি ড্রোন তৈরি করেছিলেন। ব্যাপক সাড়া পেলেও প্রায় এক দশক পরও সেটি মাঠপর্যায়ে ব্যবহারের সুযোগ হয়নি। ড্রোন ব্যবহারের নিয়মকানুন ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উচ্চ মূল্য ও কর। বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ড্রোন বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কামরান আহমেদ জানান, গত এক বছরে কৃষক, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাসহ ৩০-৪০টি পক্ষ কৃষি ড্রোন কেনার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। কিন্তু দাম জানার পর অনেকে পিছিয়ে গেছেন। কৃষিতে ব্যবহারের উপযোগী ড্রোনের দাম ১০ লাখ টাকার বেশি থেকে শুরু হয়। এর সঙ্গে আমদানি পর্যায়ে প্রায় ৬০ শতাংশ কর যুক্ত হওয়ায় ব্যয় আরো বেড়ে যায়।

একটি ২৫ লিটারের কৃষি ড্রোনের ব্যাটারি ও অন্যান্য সরঞ্জামসহ দাম ২২-২৪ লাখ টাকা পর্যন্ত পড়ে বলে জানান কামরান আহমেদ। বড় জমিতে কাজ করতে একাধিক ব্যাটারি প্রয়োজন হওয়ায় ব্যয় আরো বাড়ে। ফলে খণ্ডিত কৃষি জমির দেশে কৃষকের ব্যক্তিগতভাবে এ প্রযুক্তি কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে।

আরেক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ড্রোন প্লেসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এমডি ফাহিম হোসাইন বলেন, ‘গত এক বছরে কৃষিকাজে ড্রোনের তিন-চারটি চাহিদা এলেও কোনোটি বিক্রিতে রূপ নেয়নি। উচ্চ দাম ও আমদানি করের কারণে আগ্রহীরা শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যাচ্ছেন। ফলে দেশে ড্রোনের প্রধান বাজার এখনো চিত্রধারণ, নাটক, অনুষ্ঠান ও ব্যক্তিগত ব্যবহারে সীমিত।’

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাতেও একই চিত্র। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এখনো ব্যাপকভাবে ড্রোনের ব্যবহার শুরু হয়নি। তবে “প্রভাতি” প্রকল্পে নদীসংক্রান্ত কাজে ড্রোন ব্যবহার শুরু হয়েছে। “ভূমিকম্প” প্রকল্পের আওতায় ড্রোন কেনার জন্য রিকুইজিশন দেয়া হয়েছে। বন্যা, আকস্মিক বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগে উদ্ধার, আটকে পড়া মানুষ শনাক্তকরণ এবং জরুরি কাজে এগুলো ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।’

সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রতিটি পর্যায়েই ড্রোনকে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। দুর্যোগের আগেই নদীর গতিপথ, বাঁধের অবস্থা, নদীতীরের ভাঙন এবং পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকার মাটি ও ঢালের পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণে সাধারণ ক্যামেরাসংবলিত ড্রোন ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে দুর্গম বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সরাসরি জনবল পাঠানোর প্রয়োজন কমবে এবং ঝুঁকির লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে।

দুর্যোগ চলাকালে তাপচিত্র ধারণে সক্ষম ড্রোন ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ, বন্যার পানি কিংবা অন্ধকার এলাকায় আটকে থাকা মানুষের অবস্থান শনাক্ত করা যেতে পারে। বিশেষ করে রাতের উদ্ধার অভিযান বা ঘন কুয়াশা, ধোঁয়া ও দুর্গম ভূখণ্ডে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় এ ধরনের ড্রোন দ্রুত পরিস্থিতির ধারণা দিতে পারে। আর দুর্যোগের পর সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া কিংবা দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে ব্যবহার করা যেতে পারে ভারী মাল বহনে সক্ষম ড্রোন। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে খাবার, পানি, ওষুধ ও জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী স্বল্প সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া সম্ভব। পাশাপাশি দুর্যোগ-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতির ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করেও পুনর্বাসন ও ত্রাণ কার্যক্রমের পরিকল্পনায় সহায়তা নিতে পারে ড্রোন।

কৃষি ও জনসেবায় ড্রোনের ব্যবহার বাড়াতে শুল্ক-কর কাঠামোতে কোনো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেই বলে জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ বিষয়ে এনবিআরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘ড্রোনের ব্যবহার সম্প্রসারণে কর-ব্যয়ের বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর থেকে প্রস্তাব এলে তা বাজেট প্রক্রিয়ায় বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। তবে বর্তমানে এ নিয়ে কোনো প্রস্তাব বা আলোচনা নেই।’

শেয়ার করুন!