এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাতে সাড়ে ৮ ঘণ্টার বেশি ঘুমানোর সঙ্গে স্মৃতিভ্রংশ বা ভুলে যাওয়া রোগের লক্ষণের একটি সম্পর্ক রয়েছে।
ভুলে যাওয়া রোগের সবচেয়ে পরিচিত ধরন হলো- স্মৃতিভ্রংশ। এই রোগ যত শিগগির শনাক্ত করা সম্ভব হয়, আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা ততটাই ভালো হয়।
যদিও স্মৃতিভ্রংশ রোগ পুরোপুরি ভালো করার কোনো উপায় নেই, তবে শুরুতেই এটি শনাক্ত করতে পারলে, রোগের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ার গতি কিছুটা ধীর করা সম্ভব।
অ্যালঝাইমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাময়িকী ‘অ্যালঝাইমার্স অ্যান্ড ডিমেনশিয়া’-তে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণায় জানা যায়, যারা রাতে গড়ে সাড়ে ৮ ঘণ্টার বেশি ঘুমান, তাদের রক্তে p-tau181 নামে বায়োমার্কারের (শরীরের সংকেত) মাত্রা বেশি থাকে।
এটি ইঙ্গিত দেয় যে, অতিরিক্ত বা অনেক সময় ধরে ঘুমানো স্নায়ুর ক্ষয়জনিত পরিবর্তনের একটি প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।
এ বিষয়ে স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ড. স্টিভেন অল্ডার ‘মেডিকেল নিউজ টুডে’-কে বলেন- বয়সের কারণে মানুষের ঘুম বদলায়, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু ঘুম যদি হঠাৎ খুব বেশি বেড়ে যায় বা বদলে যায়, তবে তা স্মৃতিভ্রংশের একদম শুরুর দিকের লক্ষণ হতে পারে।
রক্তে p-tau181 নামের একটি উপাদানের মাত্রা বাড়লে বোঝা যায়, মস্তিষ্কে স্মৃতিভ্রংশের প্রভাব শুরু হচ্ছে। দেখা গেছে, যারা অতিরিক্ত ঘুমাচ্ছেন, তাদের রক্তে এই উপাদানের পরিমাণও বেশি।
ঘুমের পরিবর্তন কি স্মৃতিভ্রংশের লক্ষণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে?
গবেষকরা ‘ফ্র্যামিংহাম হার্ট স্টাডি’ (এফএইচএস)-এর ২ হাজার ৪শ ১০ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। তাদের গড় বয়স ছিল ৭০ বছর। এদের মধ্যে ৫৫.২ শতাংশ ছিলেন নারী।
গবেষণায় অংশ নেওয়া সবাই কতক্ষণ ঘুমাতেন, তা তারা নিজেরা জানিয়েছিলেন। এর পাশাপাশি, তাদের রক্তের অন্তত একটি নির্দিষ্ট পরীক্ষার (p-tau181, t-tau, NfL, বা GFAP) ফলাফল সংগ্রহ করা হয়েছিল।
চিন্তা-ভাবনার ক্ষমতার বিভিন্ন ধাপে ঘুমের সঙ্গে শারীরিক সংকেতের সম্পর্ক যাচাই করতে তারা মৃদু মানসিক ভারসাম্যহীনতা, স্মৃতিভ্রংশ ও স্ট্রোকের ইতিহাস থাকা ব্যক্তিদের এই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করেন।
অংশগ্রহণকারীরা ক্লিনিকে আসার পর সেখানে দায়িত্বরত টেকনিশিয়ানদের কাছে তাদের প্রতিদিনের স্বাভাবিক ঘুমের সময় জানান। একসঙ্গে শারীরিক সংকেতের পরীক্ষার জন্য খালি পেটে রক্তের নমুনাও দেন।
গবেষকরা বিশ্লেষণের সময় ঘুম এবং শারীরিক সংকেতের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, এমন বেশ কিছু বিষয় বিবেচনায় নেন।
এ জন্য তারা রোগীর ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার সময় বয়স, APOE e4 জিনের উপস্থিতি (এই জিনটি স্মৃতিভ্রংশ রোগের ঝুঁকি বাড়ায়), জৈবিক লিঙ্গ (পুরুষ বা নারী), ফ্রেমিংহাম হার্ট স্টাডির কোন দলের অন্তর্ভুক্ত, নিজের জানানো ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্টের সমস্যা, বিষণ্নতার অবস্থা এবং কিডনির কার্যক্ষমতা বিবেচনায় নেন।
এরপর গবেষকরা ঘুমের সময়সীমার সঙ্গে রক্তের শারীরিক সংকেতগুলোর কোনো সংযোগ আছে কিনা, তা খুঁজে বের করতে বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করেন।
কেউ যদি রাতে গড়ে সাড়ে ৮ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ঘুমান, তবে তার মধ্যে স্মৃতিভ্রংশ রোগ হওয়ার কিছু শারীরিক সংকেত দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
দলটির মধ্যে ৫শ ৭৬ জন (২৩.৯ শতাংশ) কম ঘুমের কথা জানিয়েছেন (রাতে ৬ ঘণ্টা বা তার কম)। ১ হাজার ৪শ ৭৫ জন (৬১.২ শতাংশ) স্বাভাবিক বা মাঝারি ঘুমের কথা জানিয়েছেন (৬ থেকে ৯ ঘণ্টা), ৩শ ৫৯ জন (১৪.৯ শতাংশ) বেশি ঘুমের কথা জানিয়েছেন (৯ ঘণ্টার চেয়ে বেশি)।
যারা বেশি সময় ঘুমানোর কথা জানিয়েছেন, তাদের বয়স তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। পাশাপাশি, স্বাভাবিক বা মাঝারি ঘুম হওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় তাদের বিষণ্নতায় ভোগা, বিষণ্নতার ওষুধ ব্যবহার করা এবং স্মৃতিভ্রংশ রোগ থাকার সম্ভাবনা বেশি দেখা গেছে।
মানুষ যত বেশি সময় ঘুমিয়েছে, শারীরিক সংকেতগুলোর পরিমাণ তত বৃদ্ধির ঝোঁক দেখা গেছে। তবে শুধু p-tau181 নামের শারীরিক সংকতের বৃদ্ধিই উল্লেখযোগ্যভাবে বোঝা গেছে।
P-tau181-এর ক্ষেত্রে যারা কম ঘুমান, তাদের শরীরে এর পরিমাণ স্বাভাবিক ঘুমানো মানুষদের চেয়ে বেশি ছিল। এরপর সাড়ে ৮ ঘণ্টার বেশি ঘুমালে এটি আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে, আর যাদের ঘুমের সময় ১০ ঘণ্টা বা তার বেশি, তাদের ক্ষেত্রে এটি বেশ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়।
অল্ডার বলেন, যদিও এই তথ্যগুলো সরাসরি কোনো প্রভাব প্রমাণ করে না, তবুও এগুলো সেই মতামতকেই আরো জোরালো করে যে, ঘুমের ব্যাঘাত মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার একটি প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। একইসঙ্গে মস্তিষ্কের সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার ক্ষেত্রে ঘুমকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
তিনি আরো বলেন, শুধু কতক্ষণ ঘুমাচ্ছেন, তা দিয়ে ঘুমের গুণগত মান বোঝা যায় না। একজন ব্যক্তি হয়ত বিছানায় ৯ বা ১০ ঘণ্টা কাটাচ্ছেন, কিন্তু হতে পারে তার ঘুম বারবার ভেঙে যাচ্ছে বা ঠিকমতো হচ্ছে না। এর ফলে অনেকগুলোই তিনি হয়ত টেরও পাচ্ছেন না।
আমরা জানি যে, মস্তিষ্কের ‘গ্লিমফ্যাটিক সিস্টেম’-এর মাধ্যমে অ্যামিলয়েড প্রোটিনসহ বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থ পরিষ্কার করতে গভীর ও স্বস্তিদায়ক ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর এই ঘুম যদি বারবার ভেঙে যায়, তবে মস্তিষ্কের সেই বা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে।
তবে তিনি এটাও বলেন, এটাও সমানভাবে হওয়া সম্ভব যে স্মৃতিভ্রংশের শুরুর দিকের প্রভাব মস্তিষ্কের সেই অংশগুলোকে ব্যাহত করে যা স্বাভাবিক ঘুম নিয়ন্ত্রণ করে। এর মানে হলো, ঘুমের ব্যাঘাত বা সমস্যা স্মৃতিভ্রংশের রোগের যেমন একটি কারণ হতে পারে; তেমনি আবার এটি রোগের ফলাফলও হতে পারে।
এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে গবেষণার প্রধান গবেষক ইউটি হেলথ সান আন্তোনিও-এর ‘গ্লেন বিগস ইনস্টিউট ফর আলঝেইমার্স অ্যান্ড নিউরোডিজেনারেটিভ ডিজিজেস’-এর পোস্টডক্টরাল রিসার্চ ফেলো ভ্যানেসা এম. ইয়ং বলেন, অনেকেই দুশ্চিন্তা করেন যে, তাদের ঘুমের অভ্যাস ব্রেনের ওপর কোনো খারাপ প্রভাব ফেলছে কি না।
যেহেতু, এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা গবেষণা, কোনো দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা নয়, সে কারণে আমরা বলতে পারি না যে, বেশি ঘুমালেই স্মৃতিভ্রংশ রোগ হয়।
তবে ফলাফলের ওপর নজর রাখা দরকার এবং এটি স্পষ্ট যে, বেশি ঘুমানো সবসময় মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নাও হতে পারে।
এই গবেষণার মাধ্যমে গবেষকেরা বেশি ঘুম এবং ‘p-tau181-এর মধ্যে একটি সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু বেশি ঘুমের কারণেই এটি ঘটে, এমন কোনো সরাসরি প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।
ঘুমের সমস্যা তৈরি হওয়ার কারণে মস্তিষ্কের ক্ষতি হচ্ছে, নাকি মস্তিষ্কের ক্ষতি শুরু হওয়ার কারণে ঘুমের সমস্যা দেখা দিচ্ছে, দুটোই সমানভাবে সত্যি হতে পারে।
ভ্যানেসা এম. ইয়ংয়ের মতে- অনেক স্মৃতিভ্রংশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এটি সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যাগুলোর একটি। লক্ষণ দেখা দেওয়ার ১৫ থেকে ২০ বছর আগেই মস্তিষ্কে অজান্তে স্মৃতিভ্রংশ রোগ শুরু হয়ে যায়, আর একদম প্রাথমিক অসুস্থতাজনিত পরিবর্তনগুলো ঘুম-জাগরণের চক্র নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত অংশগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে, স্মৃতিশক্তির কোনো সমস্যা নজরে আসার আগেই মানুষ ধীরে ধীরে বেশি সময় ধরে ঘুমাতে শুরু করতে পারে।
স্মৃতিভ্রংশ রোগটি জিনগত বৈশিষ্ট্য, রক্তনালীর স্বাস্থ্য, জীবনযাত্রা ও বয়সের এক জটিল সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করে। ঘুম হলো- এই জটিল প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। সে কারণে দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো এবং মেধাচর্চা করার পাশাপাশি নিয়মিত ভালো ঘুমানোর অভ্যাস রাখা খুবই বুদ্ধিমানের কাজ।
- মেডিকেল নিউজ টুডে অবলম্বনে








