এলডিসি থেকে উত্তরণের বাড়তি সময়ে যা করণীয়

31 October, 2026

প্রকাশের সময়: 01:14 pm, 31st Oct, 2026

সর্বশেষ আপডেট: 01:14 pm, 31st Oct, 2026

এলডিসি থেকে উত্তরণের বাড়তি সময়ে যা করণীয়

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য নতুন করে তিন বছরের বাড়তি সময় পেয়েছে বাংলাদেশ। এরপর বাংলাদেশকে বাণিজ্য নীতি ঢেলে সাজানো, অবকাঠামোর আধুনিকায়ন ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর কাজ করে যেতে হবে।

এ বিষয়ে ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই বাড়তি সময়কে স্বস্তির উপলক্ষ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং সরকারের উচিত সুনির্দিষ্ট ৬টি বিষয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ৩ বছর মেয়াদী কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা।

এই ৬টি প্রধান করণীয় বিষয় হলো- মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সই, তৈরি পোশাকের বাইরে রফতানি বহুমুখীকরণ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, অভ্যন্তরীণ কর রাজস্ব বৃদ্ধি, বন্দর ও লজিস্টিকস সুবিধার আধুনিকায়ন এবং শিল্পখাতের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো।

এসব পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন করা না হলে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সুবিধাগুলো উঠে যাওয়ার পর যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, তা মোকাবিলায় এই বাড়তি সময় তেমন কোনো কাজেই আসবে না।

৩ বছর বাড়তি সময় দিয়েছে জাতিসংঘ

৩০ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করে।

এর পরই মূলত সংস্কারের এই তাগিদ নতুন করে সামনে এসেছে।

জাতিসংঘের ‘কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি’র (সিডিপি) সুপারিশের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সিডিপি এই শর্তে সময় বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছে যে, বাংলাদেশ তার অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করতে জোরালো পদক্ষেপ নেবে।

ঝুঁকির মাত্রা

এই সময়ে ঝুঁকির মাত্রা বেশ বড়। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশই আসে এলডিসি হিসেবে পাওয়া শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধাসহ বিভিন্ন অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য ব্যবস্থার আওতায়। এসব সুবিধা বন্ধ হয়ে গেলে দেশের রফতানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।

কৌশলপত্র থেকে বাস্তবায়ন

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের রোডম্যাপের অভাব নেই।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকার ইতিমধ্যে ৫ বছর মেয়াদী ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’ (এসটিএস) তৈরি করেছে। এতে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে ১৫০টি করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে মূল সমস্যা পরিকল্পনায় নয়, বরং বাস্তবায়নের দুর্বলতায়।

অর্থনীতিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস)-এর সঙ্গে আলাপকালে বিশেষজ্ঞরা বলেন, সরকারের উচিত এসটিএসকে সংক্ষিপ্ত ও সুনির্দিষ্ট করে ৩ বছরের অগ্রাধিকারমূলক পরিকল্পনায় রূপ দেওয়া। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্যমাত্রা, কঠোর সময়সীমা ও কাজের অগ্রগতির সূচকগুলো প্রকাশ করা উচিত।

বিশ্লেষক ও শিল্পখাতের নেতাদের বক্তব্য

বিশ্লেষক ও শিল্পখাতের নেতারা দেশের প্রস্তুতির ভিত্তি হিসেবে ৬টি প্রধান স্তম্ভের কথা উল্লেখ করেছেন- মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন, রফতানি বহুমুখীকরণের গতি বাড়ানো, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করা, লজিস্টিকস ও বন্দর অবকাঠামোর আধুনিকায়ন এবং শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো।

শুধু বাড়তি সময়ই যথেষ্ট নয়

রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক বলেন, শুধু সময় বাড়লেই প্রস্তুতি নিশ্চিত হবে না। এ সময়ে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আগাতে হবে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ও রফতানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। 

আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রফতানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে বাণিজ্য সুবিধা অব্যাহত রাখার বিষয়ে আগেভাগেই আলোচনা শুরু করা জরুরি।

একইসঙ্গে তিনি অবিলম্বে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) আলোচনা শুরু করার তাগিদ দেন।

তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া বাড়তি ৩ বছরের সুযোগ কাজে লাগানো কঠিন হবে।

অন্যদিকে, মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অর্থনীতিকে এখন অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধার ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে দক্ষতা, বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতানির্ভর মডেলের দিকে যেতে হবে।

জরুরি সংস্কারের দাবি ব্যবসায়ী নেতাদের

ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ফজলুল হক সতর্ক করে বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য এতদিন বিশেষ কোনো প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। এখন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। শুল্কমুক্ত সুবিধা শেষ হয়ে গেলে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সমান তালে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে।

সরকারের পক্ষ থেকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, বন্দর ও লজিস্টিক সেবার উন্নতি করা, ও সুদহার কমানোর পদক্ষেপ নিতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। 

একইসঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু আগামী দিনগুলোর কঠোর সময়সীমার বিষয়টি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণপরবর্তী নিয়মিত ৩ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে আমরা কার্যত ৬ বছর সময় পাচ্ছি। এরপর আর কোনো সময় বাড়ানো হবে না।

তাৎক্ষণিক করণীয় হিসেবে বাবু ৫টি অগ্রাধিকার চিহ্নিত করেছেন: প্রধান বাজারগুলোর সঙ্গে এফটিএ সই, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অটোমেশন চালু করা এবং একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজ শেষ করা।

সরকার ২০২৯ সালের মধ্যে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।  সেইসঙ্গে এখন প্রধান বাণিজ্য জোটগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। 

তবে বাবু জোর দিয়ে বলেন, বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, যেসব উদ্যোক্তা আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারবেন না, তারা অনিবার্যভাবেই বাজার থেকে ছিটকে পড়বেন।

এলডিসি উত্তরণের পর যে যে পরিবর্তন আসবে

এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। শুল্ক সুবিধা হারানোর পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে পেটেন্ট লাইসেন্সিং ফি গুনতে হতে পারে এবং কমপ্লায়েন্সসংক্রান্ত বিভিন্ন ছাড় হারাতে হতে পারে।

এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের ওপর জোর দেন মোস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, এজন্য ব্যবসা করার খরচ কমাতে হবে। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে এবং বাণিজ্যিক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।

ব্যবসা পরিচালনার অতিরিক্ত ব্যয় এখনো বড় বাধা রয়ে গেছে। বন্দরে জট, জটিল শুল্ক প্রক্রিয়া ও অনিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ রফতানিকারকদের খরচ ক্রমাগত বাড়িয়ে দিচ্ছে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ এলডিসি উত্তরণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সক্ষমতা বৃদ্ধির রোডম্যাপ তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন। এতে সরকারি সংস্থাগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা থাকবে এবং নিয়মিত অগ্রগতির প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। এছাড়া ব্যবসায়ীদের মতামত যাতে সরাসরি নীতি বাস্তবায়নে প্রতিফলিত হয়, তা নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি সংলাপের একটি আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম তৈরিরও প্রস্তাব দেন তিনি।

তৈরি পোশাকের বাইরে রফতানি বহুমুখীকরণ

প্রায় সম্পূর্ণ তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল থাকায় দেশের রফতানি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। রফতানি ভিত্তি বড় করতে কেবল নগদ প্রণোদনা না দিয়ে কাঠামোগত সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।

আব্দুর রাজ্জাক বলেন, উদীয়মান খাতগুলোর জন্য আধুনিক প্রযুক্তি, মান পরীক্ষার সুবিধা, গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) তহবিল, দক্ষ শ্রমশক্তি, স্বল্প সুদে অর্থায়ন ও বিদেশে পণ্য বিপণন নেটওয়ার্কের সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

রফতানি বহুমুখীকরণের প্রচেষ্টাকে কেবল তৈরি পোশাক ও ওষুধ শিল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখার ব্যাপারেও সতর্ক করেন তিনি।

মাসরুর রিয়াজ উল্লেখ করেন, অতীতের নীতিগুলো মূলত তৈরি পোশাক শিল্পের অনুকূলে ছিল। ফলে অন্যান্য খাতকে এমন কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে হয়েছে, যা তাদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশকে উচ্চ সম্ভাবনাময় কয়েকটি খাত বেছে নিয়ে সেগুলোর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা তৈরিতে সীমিত সম্পদ কাজে লাগাতে হবে।

তিনি আরো বলেন, ঝুঁকি এড়াতে উদ্ভাবনী কাজে সরকারি তহবিল এককালীন না দিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে ছাড় করা উচিত।

উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি

কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে শিল্পখাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে নিবিড় সমন্বয় প্রয়োজন। নির্দিষ্ট দক্ষতার ঘাটতি পূরণে শিল্পখাতের নেতৃত্বে লক্ষ্যভিত্তিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর আহ্বান জানান মাসরুর রিয়াজ।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাড়তি পরিচালন ব্যয় সামাল দিতে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে উৎপাদনকারীদের অটোমেশন ও প্রযুক্তি গ্রহণে বিনিয়োগ করতে হবে।

রাজস্ব ও ব্যাংকখাতের সংস্কার

এলডিসি উত্তরণের পর উন্নয়ন অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক ঋণের শর্তেও পরিবর্তন আসবে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে পাওয়া কিছু বিশেষ সুবিধা ও সহজ শর্তের অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগ কমে যাবে। অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা খাতে অর্থায়নের জন্য বাংলাদেশকে নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হবে। এজন্য করের আওতা বাড়ানো, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং কর ফাঁকি রোধ করতে হবে।

একইসঙ্গে খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধান, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও ঋণ বিতরণে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ব্যাংকখাতে আমূল সংস্কার আনতে হবে। 

অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা উঠে যাওয়ার পর বেসরকারি বিনিয়োগ ধরে রাখতে টেকসই আর্থিক খাত এবং স্থিতিশীল অর্থনৈতিক সুশাসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

শেয়ার করুন!