জ্বালানি সরবরাহের নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠছে আফ্রিকা

06 November, 2026

প্রকাশের সময়: 03:06 pm, 6th Nov, 2026

সর্বশেষ আপডেট: 03:06 pm, 6th Nov, 2026

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আর হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল-গ্যাস পরিবহনের অনিশ্চয়তায় আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিকল্প উৎস খুঁজছেন। এতে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে আফ্রিকা। মহাদেশটির বিপুল প্রাকৃতিক গ্যাস ও অপরিশোধিত তেলের মজুদ নতুন করে নজর কাড়ছে, আর বিশ্বের শীর্ষ জ্বালানি কোম্পানিগুলো অনুসন্ধান, উত্তোলন ও রপ্তানি অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। মোজাম্বিক, নাইজেরিয়া, সেনেগাল, মৌরিতানিয়া ও তানজানিয়ার বড় প্রকল্পগুলো আফ্রিকাকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

পূর্বাভাস ও বিনিয়োগ

জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফিচ সলিউশনসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৪ সালের মধ্যে সাব-সাহারান আফ্রিকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি প্রায় ১৭৫ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০২৪ সালে অঞ্চলটি থেকে রপ্তানি হয়েছিল ৩ হাজার ৫৭০ কোটি ঘনমিটার; ২০৩৪ সালে তা ৯ হাজার ৮০০ কোটি ঘনমিটারে পৌঁছতে পারে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন, উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণ ও ভাসমান এলএনজি স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে এ প্রবৃদ্ধি আসতে পারে।

আফ্রিকান এনার্জি চেম্বারের ‘স্টেট অব আফ্রিকান এনার্জি ২০২৭ আউটলুক’ বলছে, ২০৩০ সাল পর্যন্ত মহাদেশটির তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন খাতে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ হতে পারে। নতুন প্রকল্প চালু হলে ২০৩০ সাল নাগাদ দৈনিক হাইড্রোকার্বন উৎপাদন ১ কোটি ২৫ লাখ ব্যারেল তেলসমতুল্যে পৌঁছতে পারে। এ বিনিয়োগের বড় অংশ যাওয়ার সম্ভাবনা মোজাম্বিক, নাইজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, লিবিয়া ও আইভরি কোস্টে। পাশাপাশি উগান্ডা, কেনিয়া ও নামিবিয়ায় নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ চলছে।

ভৌগোলিক সুবিধা

আফ্রিকার গুরুত্ব বাড়ার অন্যতম কারণ এর অবস্থান। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর বিপুল তেল ও এলএনজি হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। ফলে ওই অঞ্চলে সামরিক সংঘাত বা নৌ-চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট ও দাম বাড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। বিপরীতে আফ্রিকার আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগরীয় উপকূলের প্রকল্পগুলো থেকে হরমুজ এড়িয়েই বিভিন্ন বাজারে জ্বালানি পাঠানো সম্ভব। এ সুবিধা ইউরোপ ও এশিয়ার আমদানিকারকদের কাছে আফ্রিকাকে আকর্ষণীয় করে তুলছে।

দেশভিত্তিক প্রকল্প

মোজাম্বিক: আফ্রিকার এলএনজি সম্প্রসারণে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ। উত্তরাঞ্চলীয় কাবো দেলগাদো উপকূলের রোভুমা অববাহিকায় বিপুল গ্যাস মজুদ আবিষ্কৃত হয়েছে। সেখানে ফরাসি কোম্পানি টোটালএনার্জিস প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার ব্যয়ে মোজাম্বিক এলএনজি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, যার বার্ষিক সক্ষমতা ১ কোটি ৩১ লাখ টন। ২০২১ সালে সশস্ত্র হামলার কারণে কাজ দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল; চলতি বছরের জানুয়ারিতে নির্মাণ পুরোপুরি পুনরায় শুরু হয়েছে। লক্ষ্য, ২০২৯ সালে প্রথম এলএনজি সরবরাহ। ইতালীয় কোম্পানি এনি ২০২২ সাল থেকে কোরাল সাউথ ভাসমান প্রকল্প চালাচ্ছে এবং ৭২০ কোটি ডলারে কোরাল নর্থ বাস্তবায়ন করছে। ২০২৮ সালে এটি চালু হলে দুই ভাসমান স্থাপনার সম্মিলিত সক্ষমতা বছরে প্রায় ৭০ লাখ টনে দাঁড়াবে। এ ছাড়া মার্কিন কোম্পানি এক্সনমবিল প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলারের রোভুমা এলএনজি প্রকল্পের চূড়ান্ত বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নাইজেরিয়া: অপরিশোধিত তেল রপ্তানির পাশাপাশি দেশটি গ্যাস উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়াতে চায়। ‘ডিকেড অব গ্যাস’ কর্মসূচির আওতায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন, সরবরাহ অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতি-সংস্কার চলছে। নাইজেরিয়া এলএনজির ট্রেন-৭ প্রকল্পে ২০২৭ সাল থেকে বার্ষিক সক্ষমতা তিন কোটি টনে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে গত বছর রাষ্ট্রায়ত্ত নাইজেরিয়ান ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম কোম্পানি ও সহযোগীরা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিও করেছে।

সেনেগাল ও মৌরিতানিয়া: দুই দেশের যৌথ গ্রেটার টর্তু আহমেইম প্রকল্প থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রথম এলএনজি চালান রপ্তানি হয়। প্রথম পর্যায়ে বার্ষিক সক্ষমতা ২৫ লাখ টন, দ্বিতীয় পর্যায়ে তা ৫০ লাখ টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা আছে। নতুন বিনিয়োগ টানতে সেনেগাল সরকার ১০৯টি অনুসন্ধান ব্লকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তৈরির চেষ্টা করছে।

তানজানিয়া: প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলারের এলএনজি প্রকল্পের প্রস্তুতি চলছে, যেখানে ইকুইনর, শেল ও এক্সনমবিলের মতো বহুজাতিক কোম্পানি যুক্ত। বাণিজ্যিক কাঠামো, কর ও রাজস্ব বণ্টন নিয়ে বেশির ভাগ আলোচনা শেষ হলেও সরকারের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি ও পার্লামেন্টের অনুমোদন বাকি।

নামিবিয়া: অরেঞ্জ অববাহিকায় নতুন তেলক্ষেত্র আবিষ্কার ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ছে। টোটালএনার্জিসের ভেনাস ও মোপানে প্রকল্প ঘিরে বড় আকারের উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ চাহিদা

শুধু রপ্তানি নয়, আফ্রিকার নিজস্ব জ্বালানি চাহিদাও বাড়ছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে মহাদেশটিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা ৬০ শতাংশ বাড়তে পারে। সাব-সাহারান আফ্রিকায় মোট প্রাথমিক জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ১৭ শতাংশ আসে গ্যাস থেকে, যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ২৫ শতাংশ। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পখাতে গ্যাস ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। আফ্রিকার সরকারগুলো এখন শুধু কাঁচামাল রপ্তানির বদলে নিজস্ব শিল্পায়নেও গ্যাস কাজে লাগানোর ওপর জোর দিচ্ছে।

চ্যালেঞ্জ

সম্ভাবনার পাশাপাশি বাধাও কম নয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সশস্ত্র সংঘাত, দুর্বল অবকাঠামো, উচ্চ বিনিয়োগ ব্যয় ও দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অনেক প্রকল্প সময়মতো এগোতে পারছে না। বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তর এবং জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে।

তবু হরমুজ প্রণালি ঘিরে সরবরাহ ঝুঁকি এবং জ্বালানির উৎস বহুমুখী করার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা আফ্রিকার সামনে নতুন সুযোগ খুলে দিয়েছে। পরিকল্পিত প্রকল্পগুলো সময়মতো বাস্তবায়িত হলে আগামী দশকে বৈশ্বিক তেল-গ্যাস বাণিজ্যে মহাদেশটির অবস্থান আরো শক্তিশালী হতে পারে।

শেয়ার করুন!