গ্যাস–সংকটে একে একে বন্ধ হচ্ছে নিত্যপণ্যের কারখানা

14 August, 2026

প্রকাশের সময়: 11:25 am, 14th Aug, 2026

সর্বশেষ আপডেট: 11:25 am, 14th Aug, 2026

নারায়ণগঞ্জে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) চিনি, গম, সয়াবিনবীজ ও অপরিশোধিত ভোজ্যতেলসহ নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ১২টি কারখানা রয়েছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কয়েক দিন ধরে এসব কারখানার উৎপাদন কমছিল। গত বুধবার সংকট তীব্র হলে একে একে বন্ধ হয়ে যায় সয়াবিন বীজ মাড়াই করে তেল উৎপাদন, আটা–ময়দা তৈরি ও অন্যান্য নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের কারখানা।

নিত্যপণ্যের বাজারে এমজিআইয়ের অংশ বড়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, সদ্যবিদায়ী অর্থবছরে প্রধান সাত পণ্য ও কাঁচামালের মোট আমদানির ২২ শতাংশ এই শিল্পগোষ্ঠীর। এমজিআইয়ের হিসাবে, তাদের কারখানাগুলোতে দিনে প্রায় ৯ হাজার টন এবং বছরে প্রায় ৩৩ লাখ টন নিত্যপণ্য ও কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত হয়। ফলে এতগুলো কারখানার উৎপাদন একসঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তবে গ্যাস–সংকট শুধু এমজিআইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বড় নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী আরও কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর কারখানাও বন্ধ হয়ে গেছে। কিছুসংখ্যক কারখানায় বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে বা সক্ষমতার অনেক নিচে উৎপাদন চালু রাখা হয়েছে।

সংকট তীব্র হলে একে একে বন্ধ হয়ে যায় সয়াবিন বীজ মাড়াই করে তেল উৎপাদন, আটা–ময়দা তৈরি ও অন্যান্য নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের কারখানা।

এমজিআইয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল গতকাল বৃহস্পতিবার বলেন, গ্যাসের সংকটে বুধবার থেকে একে একে নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতসহ গ্যাসনির্ভর সব কারখানার উৎপাদন বন্ধ করতে হয়েছে। নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য এসব কারখানার উৎপাদন সচল রাখতে জরুরি ভিত্তিতে হলেও গ্যাস সরবরাহ করা দরকার।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে চিনি, গম, ভোজ্যতেল ও ডালসহ সাতটি প্রধান নিত্যপণ্য ও কাঁচামাল আমদানি হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৫৪ লাখ টন। অর্থাৎ দিনে গড়ে ৪২ হাজার টনের বেশি পণ্য ও কাঁচামাল দেশে এসেছে। এর বড় একটি অংশ অপরিশোধিত বা অপ্রক্রিয়াজাত অবস্থায় আমদানি হয় এবং দেশে কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করার পর বাজারজাত করা হয়। সে কারণে গ্যাস–সংকট দীর্ঘ হলে কাঁচামাল হাতে থাকলেও কারখানা থেকে প্রস্তুত পণ্যের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়েও পুরো চাহিদা মেটানো সম্ভব হয় না। সাধারণত জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হয়। এর মধ্যে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি থেকে আসে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট।

কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটির পর বন্ধ হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালনাধীন টার্মিনালটি বন্ধ হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়।

দুই সপ্তাহের বেশি সময় বন্ধ থাকার পর ৬ আগস্ট টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হয়। তবে ১২ আগস্ট পর্যন্ত এটি প্রায় অর্ধেক সক্ষমতায় চলছিল। জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, বুধবার গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে ২০৩ কোটি ঘনফুটে। দৈনিক প্রায় ৩৮৫ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১৭৭ কোটি ঘনফুট।

গ্যাসের এই ঘাটতির প্রভাব পড়েছে শিল্পাঞ্চলগুলোতে। শুধু নিত্যপণ্য নয়, গ্যাস ও বয়লারনির্ভর ইস্পাত, কাচ, বস্ত্রসহ বিভিন্ন শিল্পেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকার সময় শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে সংকট তীব্র হওয়ার তথ্যও পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

দুই সপ্তাহের বেশি সময় বন্ধ থাকার পর ৬ আগস্ট টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হয়। তবে ১২ আগস্ট পর্যন্ত এটি প্রায় অর্ধেক সক্ষমতায় চলছিল। জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, বুধবার গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে ২০৩ কোটি ঘনফুটে। দৈনিক প্রায় ৩৮৫ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১৭৭ কোটি ঘনফুট।
বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর কারখানাও বন্ধ
নিত্যপণ্য আমদানিকারক ও প্রক্রিয়াজাতকারী ছয়টি বড় শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে কথা বলেছে একটি সংবাদ মাধ্যেম। গত অর্থবছরে আমদানিনির্ভর নিত্যপণ্যের কাঁচামালের ৬১ শতাংশই আমদানি করেছে এই ছয় গ্রুপ। তারা জানায়, বুধবার বহু কারখানার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ ছিল। যেগুলো চালু ছিল, তার অনেকগুলোই সক্ষমতার অর্ধেকের নিচে চলছিল।

এমজিআইয়ের ১২টি নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। আরেক বড় শিল্পগোষ্ঠী টি কে গ্রুপের ২৮টি প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানার ২০টি বন্ধ রয়েছে। গত অর্থবছরে আলোচ্য সাত পণ্য ও কাঁচামাল আমদানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল এই গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১০ লাখ টন পণ্য ও কাঁচামাল আমদানি করেছে। সয়াবিন ও পামতেল, গম ও ডাল প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করে তারা।

স্মাইল ফুড প্রোডাক্টসের চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে চিনি, সয়াবিন বীজ মাড়াই এবং পাম ও সয়াবিন তেল প্রক্রিয়াজাতকরণের তিনটি বড় কারখানাই বন্ধ রয়েছে। চট্টগ্রামে শুধু আটা–ময়দার একটি ছোট কারখানায় উৎপাদন চলছে। বছরে গড়ে নয় লাখ টনের কাছাকাছি পণ্য আমদানি করে প্রক্রিয়াজাত করে গ্রুপটি।

এমজিআইয়ের ১২টি নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। আরেক বড় শিল্পগোষ্ঠী টি কে গ্রুপের ২৮টি প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানার ২০টি বন্ধ রয়েছে। গত অর্থবছরে আলোচ্য সাত পণ্য ও কাঁচামাল আমদানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল এই গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১০ লাখ টন পণ্য ও কাঁচামাল আমদানি করেছে। সয়াবিন ও পামতেল, গম ও ডাল প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করে তারা।
গ্রুপটির একজন কর্মকর্তা জানান, গ্যাসের অভাবে মঙ্গলবার থেকেই বড় তিনটি কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জে সীকম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডেল্টা এগ্রোফুডের সয়াবিন বীজ মাড়াইসহ ভোজ্যতেল প্রক্রিয়াজাতকরণের তিনটি কারখানাও মঙ্গলবার থেকে বন্ধ। সীকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, কারখানায় কাঁচামাল আছে। কিন্তু গ্যাসের অভাবে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব নয়।

গ্যাসের অভাবে সিটি গ্রুপের হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারখানাগুলোও চালু করা যায়নি। গ্রুপটির অন্যান্য নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে বলে প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

নাবিল গ্রুপের প্রায় ২০টি কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে বলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন সচল রেখেছে গ্রুপটি।

নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, গ্যাস–সংকটের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কারখানাগুলোতে বিকল্প ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এখন গ্যাস না পাওয়ায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করে উৎপাদন অব্যাহত রাখা হয়েছে। তাতে উৎপাদন সক্ষমতার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের বেশি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। একদিকে উৎপাদন কমে গেছে, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে।

গ্যাস–সংকট যেহেতু আছে তাই নিত্যপণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখতে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। আবার সরবরাহ ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে বাজারে যাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়, সে জন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি বাজারে নজরদারি দরকার।

শিল্পগোষ্ঠীগুলোর কর্মকর্তারা জানান, বাজারে আপাতত কারখানার গুদামে আগে থেকে থাকা প্রক্রিয়াজাত পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের সরবরাহ সংকট তৈরি হয়নি। তবে উৎপাদন বন্ধ থাকায় মজুত কমছে। তাঁদের মতে, এক–দুই দিনের উৎপাদন ব্যাঘাত সাধারণত গুদামের মজুত দিয়ে সামাল দেওয়া যায়। কিন্তু সংকট দীর্ঘ হলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।

জানতে চাইলে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গ্যাস–সংকট যেহেতু আছে তাই নিত্যপণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখতে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। আবার সরবরাহ ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে বাজারে যাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়, সে জন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি বাজারে নজরদারি দরকার। সংকট কাটাতে সরকার কী কী উদ্যোগ নিচ্ছে, কতদিন লাগবে—এসব তথ্য প্রকাশ করা দরকার।

শেয়ার করুন!