মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি অবকাঠামোয় নতুন করে হামলা, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বাব আল-মান্দেব প্রণালি দখল এবং সৌদি আরবের কৌশলগত জ্বালানি তেল পাইপলাইন (ইস্ট-ওয়েস্ট) সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে আবারো অস্থির হয়ে উঠেছে জ্বালানি তেলের দাম। বর্তমানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের ফিউচার্স মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলার ৭৩ সেন্টে উঠেছে। এক সপ্তাহ আগে (৮ সেপ্টেম্বর) প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ৯৭ ডলার ৩৮ সেন্ট। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের এ অস্থির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি আমদানিকারক সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বলছেন, জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা ও উচ্চ মূল্য অব্যাহত থাকলে আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ আরো বাড়বে।
গত এক সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ফিউচার্স মূল্য ব্যারেলপ্রতি সর্বোচ্চ প্রায় ১২ ডলার বেড়েছে। ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৯৭ ডলার ৩৮ সেন্ট। গতকাল রাত ৯টা ২০ মিনিটে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৭ ডলার ৭৩ সেন্টে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম এক সপ্তাহ আগে ব্যারেলপ্রতি ৯২ ডলার ৩৮ সেন্ট থাকলেও বর্তমানে তা ১০২ ডলার ৭৪ সেন্টের আশপাশে ওঠানামা করছে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের মারবান ক্রুডের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত ৮ সেপ্টেম্বর প্রতি ব্যারেল মারবান ক্রুডের দাম ছিল ১০৬ ডলার ৭৭ সেন্ট, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩১ ডলার ২১ সেন্টে। একই সময়ে আরব লাইটের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮১ ডলার ৩৯ থেকে বেড়ে ১০৪ ডলার ৮৬ সেন্ট হয়েছে। আর আরব লাইট এক্সট্রার দাম ব্যারেলপ্রতি ৮১ ডলার ৮৯ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৫ ডলার ৬ সেন্টে।
মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে বাংলাদেশ। বিশেষ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল আমদানি করা হয়। পাশাপাশি ওই অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেলও আমদানি করা হয়। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালি হুথিদের দখলে যাওয়ায় জ্বালানি পরিবহনে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এসব অঞ্চল থেকে তেল আমদানির কারণে বাংলাদেশও সরবরাহ ও দামের বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতা, সরবরাহ সংকট ও দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি আমদানিকারক সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কর্মকর্তারা।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বিপিসির দুজন কর্মকর্তা বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম পর্যবেক্ষণ করছে বিপিসি। জ্বালানি তেল আমদানি ব্যয়ে চাপ রয়েছে। পরিস্থিতি অস্থির হলে হয়তো এ চাপ আরো বাড়বে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যসহ জ্বালানি সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের এ আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশসহ আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় রেকর্ড ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৩০ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকায় ঠেকেছে। ঢাকা চেম্বারের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের মাসিক আমদানি ব্যয় ৭-৮ কোটি এবং বছরে প্রায় ৯৬ কোটি ডলার বেড়ে যায়।
তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে দেশে জ্বালানি তেলের নতুন চালান আনা শুরু হয়েছে এবং ২০ সেপ্টেম্বরের পর সরবরাহ আরো বৃদ্ধির কথা রয়েছে। তবে উচ্চ মূল্যের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, পরিবহন ও কৃষিতে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
প্রসঙ্গত, মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক সরবরাহ ঝুঁকি তৈরি হওয়ার কারণেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নতুন করে অস্থির হয়ে উঠেছে। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে ড্রোন হামলার পর সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়া, বাব আল-মান্দেব প্রণালি ঘিরে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ ও হামলার ঝুঁকি এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার ঘটনা বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচল নিয়ে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যকার নির্ধারিত আলোচনা স্থগিত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরো অস্থির হয়ে ওঠে। কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা দুর্বল হওয়ার খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে উল্লম্ফন দেখা যায়।








