সার সংকটের জন্য চাহিদা ও সরবরাহের অমিলকে দুষছেন ডিলাররা

22 September, 2026

প্রকাশের সময়: 03:42 pm, 22nd Sep, 2026

সর্বশেষ আপডেট: 03:42 pm, 22nd Sep, 2026

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে সারের চাহিদা দাঁড়াবে ৬৭ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টনে। এর মধ্যে ইউরিয়া ২৬ লাখ ২২ হাজার, টিএসপি ৯ লাখ ১ হাজার ৫০০, ডিএপি ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ৭০০, এমওপি ৯ লাখ ৭০ হাজার টন।

চলমান সার সংকটে দেশের বিভিন্ন ডিলারের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সার উত্তোলনের পরও কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ না করার অভিযোগও আছে। তদন্তে বিভিন্ন জায়গায় ডিলারের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় অন্তত পাঁচজনের ডিলারশিপ বাতিলও করা হয়েছে। তবে ডিলারদের সংগঠন বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) দাবি, সারের চাহিদা ও সরবরাহে অমিল থাকায় এ সংকট তৈরি হয়েছে। ডিলাররা বলছেন, মাঠ পর্যায়ের চাহিদার সঙ্গে সরকারের সরবরাহের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে।

বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনেও মাঠের চাহিদা ও সরকারি বরাদ্দের মধ্যে ফারাক থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। ৮ সেপ্টেম্বর ১৫টি সুপারিশসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়, সারা দেশে সারের প্রকৃত চাহিদা মাঠ পর্যায় থেকে সঠিকভাবে নিরূপণ করা হয়নি। ফলে সরকারিভাবে প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী দেশের সব জায়গায় সার বরাদ্দ দেয়া হয় না। এ কারণে অনেক জেলায় সার সংকট দেখা দেয় বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিএফএ চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন বলেন, ‘জেলাগুলোতে চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত সার সরবরাহ না দেয়ার কারণে মাঠ পর্যায়ে ডিলারদের বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। সরকার শুধু সাধারণ কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য সার ভর্তুকি মূল্যে কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করে। কিন্তু মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, তামাক, চা বাগান এবং আরো বিভিন্ন খাতে সার ব্যবহার হচ্ছে। হিসাবটি কখনই মূল্যায়নে আনা হচ্ছে না। কাগজ-কলমে থাকা কৃষির জন্য বরাদ্দ সার অঘোষিত বিভিন্ন খাতে ব্যবহার হচ্ছে। এছাড়া মাঠের চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেয়া হয় অনেক কম।’

মোশারফ হোসেনের দাবি, সার সরবরাহে ও চাহিদা মূল্যায়নে সরকারের নীতিতে ভুল রয়েছে। তিনি বলেন, ‘সরকার গতবারের চাহিদার তুলনায় এবার সামান্য বাড়িয়ে বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু এবারের চাহিদা আর গতবারের চাহিদা তো এক হতে পারে না। এছাড়া এবার বিভিন্ন জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যে পরিমাণ চাহিদা পাঠিয়েছিল তার তুলনায় প্রথমে বরাদ্দ কম দেয়া হয়েছিল।’

এছাড়া এসবির ওই প্রতিবেদনে শিল্প ক্ষেত্রে সার ব্যবহারের বিষয়টিও উঠে আসে। এতে বলা হয়, কৃষিপণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত সারে সরকার ভর্তুকি দিলেও শিল্পপণ্যে ব্যবহৃত সারে ভর্তুকি দেয় না। দেশে তামাক শিল্পের প্রসার ঘটায় রংপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, যশোরসহ বিভিন্ন জেলায় তামাক উৎপাদন বেড়েছে। এছাড়া পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলায় চা শিল্পের প্রসার ঘটায় কৃষি খাতের ভর্তুকি মূল্যের সার অনেক ক্ষেত্রে শিল্পপণ্য চা ও তামাক উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। এতে কৃষি ক্ষেত্রে সারের সংকট দেখা যায়।

বিএফএর দাবির সঙ্গে একমত নয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। সংস্থাটির উপপরিচালক (সার ব্যবস্থাপনা) মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দের জন্য সুপারিশ করা হয়। আমরা মৎস্যসহ অন্যান্য খাতে কী পরিমাণ চাহিদা সেগুলোও মূল্যায়ন করে তারপর বার্ষিক চাহিদা তৈরি করি। এখানে কিছুটা কমবেশি হতে পারে। কিন্তু মূল্যায়ন করা হয় না, এটি ভুল দাবি। কৃষক অতিরিক্ত সার কেনেন, অতিরিক্ত ব্যবহারও করেন। সেজন্য অনেক সময় সংকট তৈরি হয়। যেমনটি এবার হয়েছে।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে সারের চাহিদা দাঁড়াবে ৬৭ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টনে। এর মধ্যে ইউরিয়া ২৬ লাখ ২২ হাজার, টিএসপি ৯ লাখ ১ হাজার ৫০০, ডিএপি ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ৭০০, এমওপি ৯ লাখ ৭০ হাজার টন। এছাড়া এনপিকেএস (নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশ ও সালফারের সুষম সার), জিপসাম, জিংক সালফেট, ম্যাগনেসিয়াম সালফেট, বোরন ও অ্যামোনিয়াম সালফেটের চাহিদা ৯ লাখ ২১ হাজার ৩০০ টন ধরা হয়েছে। অক্টোবরের চাহিদা অনুযায়ী ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সার দেশের সব জেলার ডিলারদের মাঝে এরই মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।

সার সংকটের বিষয়ে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে এক ডিলার বলেন, ‘আগে এক এলাকায় সংকট হলে অন্য এলাকার অব্যবহৃত সার সেখানে বরাদ্দ দেয়া হতো। এবার সেটি করা হয়নি। সার পরিবহনের সময় বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি, গাড়ি আটক কিংবা মামলা দেয়া হচ্ছিল। পাশাপাশি সরকার কৃষকের প্রতি আন্তরিক হওয়ায় শুরুতেই সার নিয়ে কঠোর অবস্থানে যায়। এতে ডিলাররা প্যানিকড হয়ে যায়। ফলে সংকট মোকাবেলায় সমন্বয় ছিল না। সেজন্য পরিস্থিতি বেশি জটিল হয়।’

তবে এসব অভিযোগের পাশাপাশি ডিলারদের বিরুদ্ধেও বাজার নিয়ন্ত্রণ ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। চলমান সংকটে অনিয়মে যুক্ত থাকায় অন্তত পাঁচজনের ডিলারশিপ বাতিল হয়েছে। কয়েকজনের বিরুদ্ধে অন্যান্য ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বিভিন্ন জায়গায় অসাধু ব্যবসায়ী ও ডিলারদের সিন্ডিকেট করে বাজারে সারের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ, তাদের তৈরি কৃত্রিম সংকটে বেশি দামে সার বিক্রির বিষয়ও ‍উঠে আসে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ২৪ শতাংশ ডিলারের কোনো না কোনো ধরনের অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়ার কথাও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে আসে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিএফএর সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মো. মামুনুর রশিদ খান বলেন, ‘আমরা বিসিআইসির ডিলার। দেশে ইউরিয়ার কোনো সংকট হয়নি। নন-ইউরিয়া নিয়ে সংকট হয়েছে। এগুলো বিএডিসির ডিলাররা করতে পারে। এছাড়া খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কৃষককে বেশি দামে সার কিনতে হয়েছে। খুচরা বিক্রেতা ও বিএডিসির ডিলাররা এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। বিএডিসি ডিলার নিয়োগে কী নীতিমালা ছিল এটা সবাই জানে। তারা একই বাজারে চার-পাঁচজনও ডিলার দিয়েছে। তারা কতটুকু সার উত্তোলন করছে, কতটুকু কৃষককে দিচ্ছে এসব নজরদারি ছিল না। অনিয়ম ও কারসাজির সঙ্গে খুচরা বিক্রেতারাও যুক্ত।’

এদিকে সরকারের জারি করা নতুন ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণসংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা’ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান জানাতে সংবাদ সম্মেলন করে বিএফএ। এ সময় তারা নতুন নীতিমালার কয়েকটি ধারা নিয়ে আপত্তি জানান। একই সঙ্গে সেসব ধারা সংশোধনের বিষয়ে তারা ২ সেপ্টেম্বর রিট করেছেন বলেও জানানো হয়। এ রিটের পক্ষে উচ্চ আদালত ৬০ দিনের রুল জারি করেছেন বলেও জানানো হয়।

সংগঠনটির নেতারা বলছেন, নীতিমালার পর একটি পরিপত্রে নতুন ডিলার নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়সীমার মধ্যে আবেদন গ্রহণ, যাচাই-বাছাই ও নতুন ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। বিদ্যমান ডিলারের পাশাপাশি প্রতি ইউনিয়নে একজন করে নতুন ডিলার নিয়োগের বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নীতিমালা ও পরিপত্র পর্যালোচনা করে বিএফএ দেখতে পেয়েছে, এর গুরুত্বপূর্ণ ধারা এবং পরিপত্রের নির্দেশনার মধ্যে কিছু অস্পষ্টতা ও বাস্তবিক জটিলতা রয়েছে। এগুলো সুনির্দিষ্ট না করে বাস্তবায়ন করলে সার বিতরণ ব্যবস্থায় বিভ্রান্তি, বৈষম্য, প্রশাসনিক জটিলতা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

সংগঠনটি বলছে, নীতিমালার ডিলার ইউনিটের সংখ্যা এবং‘বিদ্যমান ডিলার’ শব্দটির সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় সার ডিলার ইউনিটের সংখ্যা ও কাঠামো সুস্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। পরিপত্রে বলা হয়েছে, বিদ্যমান ডিলারের পাশাপাশি একজন করে নতুন ডিলার নিয়োগ দেয়া হবে। বিদ্যমান ডিলার বলতে কাকে বা কতজনকে বোঝানো হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। বর্তমানে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ডিলারের পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) এক বা একাধিক ডিলার রয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় তিনজন করে ডিলার নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। ফলে একটি ইউনিয়নে একাধিক ডিলার থাকা অবস্থায় নতুন একজন ডিলার নিয়োগ করা হলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নে মোট ডিলারের সংখ্যা তিন, চার বা ক্ষেত্রবিশেষে তারও অধিক হতে পারে। ফলে প্রতি ইউনিয়নে ডিলারের প্রকৃত সংখ্যা কত হবে তা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। এসব দূর না করলে সরকারের সার বিতরণ ব্যবস্থাপনার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।

বিএফএ বলছে, সার বিপণন ব্যবস্থাকে সুসংগঠিত ও টেকসই কাঠামোতে আনতে ১৯৯৫ সালে বিসিআইসির মাধ্যমে সারা দেশে প্রায় ৫ হাজার ৬০০ জন ডিলার নিয়োগ দেয়া হয়। প্রায় ৩২ বছর ধরে ডিলাররা কৃষক পর্যায়ে সার সরবরাহ করে আসছেন। উপজেলা, জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে সারসংক্রান্ত যেকোনো মিটিং, কর্মশালা আয়োজন করা হলে বিএফএর নেতাদের আহ্বান করা হতো। কিন্তু নতুন ডিলার নিয়োগ নীতিমালায় এগুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুতগতিতে চলছে।

সংগঠনটি বলছে, বিদ্যমান ডিলারদের ডিলারশিপ বহাল রাখা, নবায়ন, স্থানান্তর, পুনর্বিন্যাস অথবা বাতিলের ক্ষেত্রে কোনো সুস্পষ্ট, নির্দিষ্ট ও বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে কার্যরত ডিলারদের ভবিষ্যৎ ও তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে গুরুতর অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘সারের বাস্তবসম্মত চাহিদা নিরূপণ করা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, মৎস্যসহ অন্যান্য খাতের চাহিদাগুলো ঠিকমতো উঠে আসছে কিনা। আমরা এটিও মূল্যায়ন করব। সঠিক চাহিদা নিরূপণ করে সে অনুযায়ী সার বরাদ্দ দেয়া হবে। ‍কৃষি আমাদের অগ্রাধিকার খাত। কৃষির জন্য সারের যতটা প্রয়োজন তার চেয়ে আমরা বেশি বরাদ্দ দিই। কম দিই না।’

ডিলারদের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘ইউনিয়নগুলোতে এখন দুজন করে ডিলার আছে। নতুন একজন যুক্ত হবে। যারা সৎ ও সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন এমন পুরনো কোনো ডিলার বাদ যাবে না। বাজারকে প্রতিযোগিতামূলক করতে এবং সারের চাহিদা বাড়ায় সরবরাহ ঠিক রাখতে ডিলারও বাড়ানো হচ্ছে।’

শেয়ার করুন!