ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে দেশটির সিইসি’র পদত্যাগের দাবিতে চলমান বিক্ষোভ আরো জোরদার হয়েছে।
৫ অক্টোবর ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের ডাক দেয় ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।
এরপর সে আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে ভারতের প্রধান বিরোধীদল জাতীয় কংগ্রেসহ আঞ্চলিক দলের নেতাকর্মীর। তারা ভারতের রাজধানী দিল্লির ‘যন্তরমন্তর’-এ জড়ো হয়ে বিক্ষোভে অংশ নেন।
এদিকে, আন্দোলন দমন করতে কেন্দ্রীয় সরকারে ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পুলিশি অভিযান শুরু করে। দিন যতই গড়াচ্ছে, আটকের সংখ্যা বাড়ছে। সেইসঙ্গে বিক্ষোভ আরো তীব্রতর হচ্ছে বলে ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে।
ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, শনিবার (১০ অক্টোবর) বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ছাড়াও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আটক করেছে পুলিশ। আটকের সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
মূল রাজনৈতিক ও যুব আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ
আটকদের মধ্যে রয়েছেন-
ধ্রুব রাঠি: আন্দোলনের পক্ষে সংহতি জানানো জনপ্রিয় ইউটিউবার এবং কন্টেন্ট ক্রিয়েটর বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দেওয়ার আগেই শনিবার সকালে গুরুগ্রামের ফ্ল্যাট থেকে ধ্রুব রাঠিকে আটক করে পুলিশ।
অভিজিৎ দীপকে: জেন-জিভিত্তিক যুব রাজনৈতিক আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেকে মুম্বাই থেকে উড়োজাহাজে করে দিল্লি পৌঁছানোর পরপরই বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয়।
সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা: ককরোচ জনতা পার্টির সহ-আহ্বায়ক ও শীর্ষ নেতা, অভিজিৎ দীপকের দিল্লির বিমান বন্দরে অবতরণের পরপরই সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করা হয়।
দীপক বালিয়ান: ককরোচ জনতা পার্টির মুখপাত্র ও সহ-ইনচার্জ, রাজস্থান থেকে তাকে আটক করা হয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: দিল্লির বিক্ষোভ চলাকালীন দিল্লির বাসভবনের বাইরে থেকে ৫ জন প্রতিনিধিসহ পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আটক করে পুলিশ।
রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী
সংবাদে আরো বলা হয়, ব্যক্তিবিশেষ ছাড়াও বিভিন্ন বামপন্থী ও বিরোধী ছাত্রসংগঠনের শত শত কর্মীকে ইতোমধ্যে আটক করা হয়েছে-
SFI, AISA, NSUI এবং DYFI: স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (SFI), অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (AISA) এবং অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের বহু নেতাকর্মীকে ‘যন্তরমন্তর’ ও অশোকা রোডের ব্যারিকেড থেকে আটক করা হয়েছে।
এর মধ্যে গুজরাট এসএফআই-এর রাজ্য সম্পাদক সত্যসা লিওভা-কেও আগেভাগে আটক করা হয়েছিল।
AAP, CPI, CPI(M): আম আদমি পার্টি ও কমিউনিস্ট পার্টির স্থানীয় বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি:

দিল্লি পুলিশ যে কোনো ধরনের অননুমোদিত সমাবেশ ঠেকাতে দিল্লিতে ১৬৩ ধারা (আগের ১৪৪ ধারা) জারি করেছে এবং রাজধানীর একাধিক মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দিয়েছে।
আটকদের রাখার জন্য দিল্লির বিভিন্ন স্থানে সাময়িকভাবে ১২টি ডিটেনশন সেন্টার কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে শনিবার বিবিসি বাংলা’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ককরোচ জনতা পার্টি ও বামপন্থীদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে শনিবার সকাল থেকে অন্তত হাজার খানেক বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
বিক্ষোভে যোগ দিতে দিল্লিতে পৌঁছানো মাত্রই আটক করা হয়েছে ককরোচ জনতা পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বকে। আটক হয়েছেন বামপন্থী ছাত্র সংগঠন AISA নেত্রী নেহা বোরা ও পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীও।
সিজেপি’র শীর্ষ নেতা অভিজিৎ দীপকে, আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরভ দাসকে বিমান থেকেই আটক করেছে পুলিশ। এর আগে সকালেই ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে তার বাড়ি থেকেই আটক করা হয়।

সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন আইনজীবীকেও আটক করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। একাধিক জায়গায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি শুরু হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
বিক্ষোভের ঘোষিত এলাকা হিসেবে ‘যন্তর মন্তর’কে একরকম দুর্গ বানিয়ে ফেলা হলেও দুপুরে হঠাৎই বামপন্থী ছাত্রসংগঠন AISA-এর নেত্রী নেহা বোরা রাজধানীর কেন্দ্রস্থল থেকে দূরে দিল্লি হাট এলাকায় জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান।
বিবিসি সংবাদদাতা প্রত্যুষ রায় দিল্লি থেকে জানিয়েছেন, মধ্য দিল্লির বিস্তীর্ণ এলাকা সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে।
‘যন্তর মন্তর’-এ যাওয়ার সব রাস্তায় ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। অনেক রাস্তায় কাঁটাও বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাউকেই ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। কেউ স্লোগান তুললেই তাকে আটক করে বাসে তুলে দেওয়া হচ্ছে। ‘যন্তর মন্তর’ থেকে ৪ কিলোমিটার দূরেও বহু গাড়ি আটকে দেওয়া হচ্ছে।
সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা

শুধু আন্দোলনকারীরাই নন, অনেক জায়গায় সাংবাদিকদেরও ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
‘যন্তর মন্তর’-এর ৪ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে মোবাইল ফোন ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মধ্য দিল্লির সব দোকানপাটও বন্ধ।
দুপুর ২.১৫: দিল্লিতে বাড়ির সামনে ধর্নায় বসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
মমতাপন্থী তৃণমূল কংগ্রেস দাবি করেছে, তাকে পুলিশ আটক করে নিয়ে গেছে।
দুপুর ২টা: বাম ছাত্রনেত্রী AISA’র নেহা বোরা, সিপিআইএমএল লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, সামাজিক কর্মকর্তা যোগেন্দ্র ইয়াদভসহ একাধিক নেতাকে আটক করা হয়। তাদের সফদরজং ফ্লাইওভারের কাছে আটক করা হয়।
দুপুর ১.৩০টা: বাম ছাত্র সংগঠনের সভানেত্রী নেহা বোরাসহ অনেক ছাত্র-যুব আন্দোলনকারী ইতোমধ্যে দিল্লি হাট অঞ্চলে বিক্ষোভ শুরু করেছেন। বিক্ষিপ্তভাবে দিল্লিতে বিজেপি দফতরের বাইরেও বিক্ষোভ শুরু হয়।
দুপুর ১.১০ মিনিট: অনেক জায়গায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
দুপুর ১টা: মাইক্রোব্লগিং সাইটের সিজেপি’র এক্স হ্যান্ডেলে অভিজিৎ দীপকের একটি ভিডিওতে বলতে শোনা যায়, আপনারা এই ভিডিও দেখছেন মানে আমি, সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কা ৩ জনেই আটক হয়েছি। এবার এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন আজিঙ্ক্যা শিন্ডে।
সিপিআই(এম) সংসদ সদস্য জন ব্রিটাসের অভিযোগ, দিল্লি পুলিশ প্রায় এক ঘণ্টা ধরে শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘোরানোর পর তাদের ছত্রসাল স্টেডিয়ামে নিয়ে যায়।
সেখানে ৩০-৪৫ মিনিট রাখার পর ফের তাদের জিপে তুলে অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তা তাদের জানানো হয়নি।
পিনারাই বিজয়নের মতো একজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেই যদি এমন আচরণ করা হয়, তাহলে দেশের সাধারণ মানুষের কী পরিস্থিতি হবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
দুপুর ১২:৩৫: বিবিসি সংবাদদাতা প্রত্যুষ রায় জানান, দিল্লির বিভিন্ন জায়গা থেকে সাংবাদিকদেরও একে একে আটক করতে শুরু করে পুলিশ। জনপথ এলাকার রিগ্যাল হোটেলের কাছে আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীরা যন্তর মন্তর-এর কাছে বাংলা সাহিব গুরুদ্বারে আশ্রয় নেন।
দুপুর ১২:৩০: ভারতে ককরোচ জনতা পার্টির একাধিক সদস্যের সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেওয়া হয়েছে বলে সংগঠনের তরফ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
সকাল ১১:২৭: বিক্ষোভ শুরুর আগেই সিপিআই(এম)-এর একাধিক শীর্ষ নেতাকে আটক করা হয়েছে বলে দলের তরফ থেকে সামাজিক মাধ্যমে দাবি করা হয়।
এদের মধ্যে রয়েছেন- দলের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি, কেরালার বিরোধী দলনেতা পিনারাই বিজয়ন, বৃন্দা কারাট, এম ভি গোবিন্দন এবং পি কে শ্রীমতী।
সকাল ১০:৫৩: ককরোচ জনতা পার্টির নেতারা, অভিজিৎ দীপকে, আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাস, উড়োজাহাজে করে দিল্লিতে পৌঁছন। তাদের দাবি, উড়োজাহাজ দিল্লিতে অবতরণের পর পরই দিল্লি পুলিশ উড়োজাহাজের ভেতর থেকে তাদের আটক করে।
বিমান থেকে সিজেপির সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে দীপকে-কে বলতে শোনা যায়, দিল্লি পুলিশের অনেক কর্মকর্তা বিমানে ঢুকছেন। … আমরা কেবল একটি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করতে চেয়েছিলাম। আর ওরা উড়োজাহাজ থেকে এমনভাবে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন, যেন আমরা অপরাধী!
সকাল ১০:৩০: ককরোচ জনতা পার্টির আইনি বিভাগের প্রধান রত্না সিংকে আটক করা হয়।
এ সময় তিনি বলেন, পুলিশ আমার বাড়িতে গিয়েছিল, কিন্তু সেখানে আমাকে পায়নি। রাস্তায় আমার গাড়ির ভেতর থেকে বেআইনিভাবে আমাকে আটক করা হয়েছে। আমার গাড়ির চারপাশে প্রায় ২৫ জন পুলিশকর্মী রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩ জনের মতো নারী পুলিশকর্মীও রয়েছেন।
সকাল ৯:৫০: ইউটিউবার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ধ্রুব রাঠিকে সকালে গুরুগ্রামের বাড়ি থেকে আটক করে পুলিশ। শুক্রবার রাতে নিজের এক্স অ্যাকাউন্টে একটি ভিডিও পোস্ট করে শনিবারের বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার ঘোষণা করেছিলেন তিনি।
নরেন্দ্র মোদী সরকারের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত ধ্রুব রাঠি চলতি সপ্তাহের গোড়াতেই জার্মানি থেকে ভারতে এসেছিলেন। বেঙ্গালুরুতে ৮ অক্টোবর ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভেও অংশ নেন তিনি।








