ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভা, কী পেলো বাংলাদেশ?

18 October, 2026

প্রকাশের সময়: 10:16 pm, 18th Oct, 2026

সর্বশেষ আপডেট: 10:16 pm, 18th Oct, 2026

বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগের মন্থর গতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জের মধ্যে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সাধারণ সভায় অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ।
১২ থেকে ১৮ অক্টোবরের এই সভাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির অন্যতম লক্ষ্য ছিল উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো, বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ, অর্থনৈতিক সংস্কারে সহযোগিতা এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
সভা ঘিরে আলোচনা, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও বিনিয়োগ-সম্ভাবনা অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে পেরেছে। বিশ্বব্যাংকের বেসরকারি খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ, ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতের সংস্কার নিয়ে আলোচনা এবং থাইল্যান্ডের সঙ্গে যৌথ উৎপাদন ও বাণিজ্যের সম্ভাবনা এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
তবে এ সভা থেকে বাংলাদেশের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বড় নতুন ঋণ বা অনুদান প্যাকেজ ঘোষণার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে সভার তাৎপর্যকে তাৎক্ষণিক অর্থপ্রাপ্তির চেয়ে ভবিষ্যৎ অর্থায়ন, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নতুন ঋণ নয়, অর্থায়নের পথ খোঁজাই বড় অর্জন

বাংলাদেশের জন্য এবারের সভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল উন্নয়ন অর্থায়নের প্রচলিত কাঠামোর বাইরে বেসরকারি পুঁজি আকর্ষণের সুযোগ খোঁজা। সরকারি ঋণ ও উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া বড় অবকাঠামো, শিল্পায়ন, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং কর্মসংস্থানের চাহিদা পূরণ কঠিন।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আলোচনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে ঝুঁকি কমানো, বিনিয়োগের নিশ্চয়তা, ঝুঁকি ভাগাভাগি এবং স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়নের মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। এসব ব্যবস্থা কার্যকর হলে বিনিয়োগকারীদের কাছে উন্নয়নশীল দেশের প্রকল্পগুলো তুলনামূলক আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিগত অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি, অর্থায়নের ব্যয় এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বড় বাধা। এসব ঝুঁকি কমাতে উন্নয়ন সহযোগীরা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবহন, শিল্প, প্রযুক্তি এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোয় বিনিয়োগের সুযোগ বাড়তে পারে।
তবে বিশ্বব্যাংকের এই বৃহত্তর উদ্যোগকে বাংলাদেশের জন্য অনুমোদিত অর্থায়ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সভায় আলোচিত বৈশ্বিক উদ্যোগের সঙ্গে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট প্রকল্প, অর্থের পরিমাণ কিংবা বাস্তবায়নের সময়সীমা যুক্ত করে কোনো নতুন চুক্তির ঘোষণা পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ সম্ভাবনার দরজা খুললেও সেখান থেকে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে প্রকল্প প্রস্তুতি, সংস্কার ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে এগোতে হবে।

তিন বছরে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার চায় বাংলাদেশ

সভা শুরুর প্রথম দিনেই বাংলাদেশের অর্থায়ন-সংক্রান্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোর একটি ছিল বিশ্বব্যাংকের কাছে আগামী তিন বছরে নিয়মিত সহায়তার বাইরে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন বা ১ হাজার কোটি ডলারের ঋণ চাওয়া। জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, ভর্তুকির চাপ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে এই অর্থ চেয়েছে সরকার।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করে। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারের ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। এই চাপ মোকাবিলায় আগামী দুই থেকে তিন বছরের জন্য একটি আর্থিক সুরক্ষাবলয় তৈরিতে বিশ্বব্যাংক সহায়তা করতে পারে।
এ লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে তিন বছর মেয়াদি কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক (সিপিএফ) চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এই কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের ভবিষ্যৎ সহায়তার ক্ষেত্র ও পরিকল্পনা নির্ধারিত হবে। আলোচনার অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিনিধিদলের ঢাকায় আসার কথাও জানানো হয়েছিল।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, ১০ বিলিয়ন ডলারের বিষয়টি অনুমোদিত ঋণ নয়, এটি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে করা অতিরিক্ত অর্থায়নের অনুরোধ। কত অর্থ, কী শর্তে এবং কোন সময়সূচিতে পাওয়া যাবে, তা নির্ধারণে আলোচনা ও সমঝোতা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এখানে বাংলাদেশের জন্য দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বৈদেশিক অর্থায়ন পেলে জ্বালানি ব্যয় ও বাজেটের ওপর চাপ সামলানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ঋণের পরিমাণ, সুদ, পরিশোধের সময়সীমা এবং অর্থ ব্যবহারের শর্ত বিবেচনা করে এর প্রকৃত অর্থনৈতিক সুফল নির্ধারিত হবে।

সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ কর্মসূচি নিয়ে অগ্রগতি

আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনাও ছিল বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা। সরকারের লক্ষ্য প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য ঋণ কর্মসূচির শর্তগুলো নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো এবং সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, সরকার একসঙ্গে অনেকগুলো সংস্কার কার্যকর করার পরিবর্তে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পক্ষে। অর্থাৎ সংস্কারের লক্ষ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করতে চাইলেও কোন সংস্কার কখন এবং কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
১৫ অক্টোবর ব্যাংককে আইএমএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা ভালোভাবে এগোচ্ছে। ব্যাংকিং খাত, কর-জিডিপি অনুপাত এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কিছু বিষয়ে আইএমএফের উদ্বেগ থাকলেও আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
এই অগ্রগতির অর্থ হলো, বাংলাদেশ ও আইএমএফের মধ্যে নতুন কর্মসূচির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা এগিয়েছে। তবে সভা চলাকালে নতুন ঋণ কর্মসূচির চূড়ান্ত অনুমোদন বা অর্থ ছাড়ের ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশের জন্য এ কর্মসূচির তাৎপর্য শুধু বৈদেশিক অর্থপ্রাপ্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার সঙ্গে সমঝোতা হলে বৈদেশিক অর্থায়নের ধারাবাহিকতা, অর্থনৈতিক নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিপরীতে, শর্ত পূরণে ব্যর্থতা বা দীর্ঘ আলোচনার কারণে অর্থায়ন পিছিয়ে গেলে প্রত্যাশিত সুফল পেতে দেরি হতে পারে।

ব্যাংক পুনর্গঠনে আইএফসি ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কাটানোও সভার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং আমানতকারীদের আস্থা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বেসরকারি খাতবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর পুনঃমূলধনীকরণে সহায়তার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি ইকুইটি বিনিয়োগকারীদের ইতিবাচক সাড়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
এটি বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় একটি দিক। কারণ, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণ ও আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারে শুধু সরকারি অর্থের ওপর নির্ভর করলে বাজেটের ওপর বড় চাপ তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হলে সেই চাপ ভাগ করে নেওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে এখানে আগ্রহ প্রকাশ এবং বাস্তব বিনিয়োগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কোন ব্যাংকে কত অর্থ বিনিয়োগ হবে, কী শর্তে হবে এবং বিনিয়োগের বিপরীতে ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনে কী পরিবর্তন আসবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
ব্যাংক খাতে অর্থায়নের পাশাপাশি খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা, ঋণ আদায়, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি, আর্থিক প্রতিবেদন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা বাড়ানোও জরুরি। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি না হলে নতুন মূলধনও দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারবে না।

বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরার চেষ্টা

এবারের সভায় বাংলাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সংস্কার প্রস্তাবের পাশাপাশি দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার তুলে ধরা। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সভার শুরুতে জানান, বাংলাদেশ নিজেদের অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও তা মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া উদ্যোগের ভিত্তিতে একটি সংস্কার পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে চায়।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের মূল লক্ষ্য হিসেবে আর্থিক শৃঙ্খলা, রাজস্ব আয় বাড়ানো, সামাজিক সুরক্ষা শক্তিশালী করা, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে। এসব ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে সরকারের নীতিগত লক্ষ্য ও অগ্রাধিকারের মিল রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিতুমীর।
তবে নীতিগত লক্ষ্য এক হওয়া আর বাস্তবায়নের পদ্ধতিতে পুরোপুরি একমত হওয়া এক বিষয় নয়। রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর মতো বিষয়ে কীভাবে অগ্রসর হবে, তা নিয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এমন সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা, যাতে একদিকে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর হয়, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও কর্মসংস্থানের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে। এই ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দেশের নিজস্ব উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারে।

থাইল্যান্ডের সঙ্গে বিনিয়োগ ও যৌথ উৎপাদনের সম্ভাবনা

ব্যাংককে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ অনুসন্ধান। বাংলাদেশের লক্ষ্য শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি কমানো নয়, বরং যৌথ উৎপাদন, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও কার্যকর করা।
আলোচনায় কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালাল খাদ্যপণ্য, শিল্প উৎপাদন এবং যৌথ উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সম্ভাবনা উঠে এসেছে। থাইল্যান্ডের ব্যবসায়ী মহলের আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের উৎপাদন খাতে নতুন বিনিয়োগ আনার সুযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বাংলাদেশের শ্রমশক্তি, কৃষিপণ্য এবং স্থানীয় বাজারের সঙ্গে থাইল্যান্ডের প্রযুক্তি, উৎপাদন দক্ষতা ও আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশের সক্ষমতাকে যুক্ত করা যেতে পারে। এতে শুধু কাঁচামাল বা তৈরি পণ্য আমদানি-রপ্তানি নয়, বরং বাংলাদেশে মূল্য সংযোজন, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আলোচনায় থাইল্যান্ডের রানং বন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক উৎপাদন নেটওয়ার্কের সম্ভাবনাও গুরুত্ব পেয়েছে। কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠলে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমানো এবং আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এছাড়া আসিয়ানভিত্তিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক মুক্তবাণিজ্য কাঠামোর সম্ভাবনাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে পরিবহন সংযোগ, কাস্টমস প্রক্রিয়া, মান নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং ব্যবসায়িক নিয়মকানুনে সমন্বয় প্রয়োজন।
এসব আলোচনা এখনো সম্ভাবনা ও সহযোগিতার ক্ষেত্র চিহ্নিত করার পর্যায়ে। নির্দিষ্ট বিনিয়োগের পরিমাণ, চুক্তি বা বাস্তবায়ন সময়সূচি ঘোষণা না হওয়ায় এগুলোকে নিশ্চিত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

বিশ্বব্যাংকের বৈশ্বিক উদ্যোগে বাংলাদেশের সুযোগ কতটা?

এবারের সভায় বিশ্বব্যাংক গ্রুপের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে বেসরকারি পুঁজি বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ১১২ বিলিয়ন ডলার বেসরকারি পুঁজি সংযুক্ত করতে সহায়তা করেছে। ২০২২ অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৩৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ চার বছরে এ ধরনের অর্থায়ন তিন গুণের বেশি বেড়েছে।
ব্যাংককের সভায় বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্প তৈরি, বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি কমানো, স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন বাড়ানো এবং দেশীয় পুঁজিবাজার শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো উন্নয়ন প্রকল্পে শুধু সরকারি বা বহুপক্ষীয় ঋণের ওপর নির্ভর না করে বেসরকারি বিনিয়োগকেও যুক্ত করা।
বাংলাদেশের জন্য এই উদ্যোগের গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবহন অবকাঠামো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায় দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের গ্যারান্টি বা ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে এসব খাতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়তে পারে।
তবে বিশ্বব্যাংকের সামগ্রিক সাফল্যের পরিসংখ্যান বাংলাদেশের প্রাপ্ত অর্থ নয়। ১১২ বিলিয়ন ডলার বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে বেসরকারি পুঁজি সংযুক্ত করার মোট হিসাব। বাংলাদেশের জন্য কত অর্থ আসবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পের মান, বিনিয়োগের পরিবেশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরবর্তী সমঝোতার ওপর।
অর্থাৎ বাংলাদেশের সামনে এখন সুযোগ হলো, বৈশ্বিক উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এমন প্রকল্প তৈরি করা, যেগুলোতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়ন করতে আগ্রহী হবেন।

কর্মসংস্থান ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য কী বার্তা?

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম বড় দিক হচ্ছে বিনিয়োগের গতি বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। ব্যাংককে বিশ্বব্যাংকের আলোচনায়ও কর্মসংস্থানকে উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের হিসাবে, উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে প্রায় ১২০ কোটি তরুণ কর্মক্ষম বয়সে প্রবেশ করবেন। বিপরীতে, একই সময়ে প্রায় ৪২ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। অর্থাৎ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্ভাব্য ব্যবধান বড়।
এই বৈশ্বিক বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে কর্মসংস্থানে যুক্ত করতে হলে শুধু সরকারি চাকরির ওপর নির্ভর করা সম্ভব নয়। উৎপাদনশীল শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, প্রযুক্তি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানিমুখী ব্যবসায় নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থায়ন আলোচনায় ব্যাংক খাতের সক্ষমতা, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের ভূমিকা তাই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ব্যাংকগুলো কার্যকরভাবে ঋণ দিতে পারলে এবং বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানো গেলে নতুন ব্যবসা গড়ে ওঠার সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগও প্রয়োজন।
তবে শুধু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কর্মসংস্থানের লক্ষ্য অর্জন করা যাবে না। প্রকল্প বাস্তবায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর মতো বিষয়েও অগ্রগতি প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য বৈদেশিক অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও জরুরি। ব্যাংককে আইএমএফের আলোচনায় বৈশ্বিক ঋণ, উচ্চ সুদহার, মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানির বাজারে অস্থিরতার ঝুঁকি গুরুত্ব পেয়েছে।
আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগের সম্ভাব্য অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং জ্বালানির দামের ধাক্কাও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি হিসেবে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসব ঝুঁকির প্রভাব বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়, আমদানি মূল্য, জ্বালানি ভর্তুকি এবং মূল্যস্ফীতির ওপর পড়তে পারে। ফলে বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত অর্থায়নের অনুরোধ এবং আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনা শুধু অর্থ সংগ্রহের বিষয় নয়, বরং অর্থনীতিকে বহিরাগত ধাক্কা সামাল দেওয়ার উপযোগী করে তোলার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পরামর্শ বাস্তবায়নের সময় সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় রাখা জরুরি। রাজস্ব আয় বাড়ানো, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে সংস্কারের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে দেরি হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রাপ্তি কী?

ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সাধারণ সভা থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্তি মূল্যায়ন করতে হলে তিনটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, অর্থায়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের কাছে তিন বছরে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চাওয়া হয়েছে। আইএমএফের সঙ্গে প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এগিয়েছে। কিন্তু দুটি ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের বিষয়টি এখনো আলাদা।
দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত হয়েছে। ব্যাংক খাতের পুনঃমূলধনীকরণে আইএফসির আগ্রহ, বেসরকারি পুঁজি সংযুক্ত করার বৈশ্বিক উদ্যোগ এবং থাইল্যান্ডের সঙ্গে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালাল খাদ্য, শিল্প ও যৌথ উৎপাদনের সম্ভাবনা ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনাকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে পরবর্তী উদ্যোগ প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, সংস্কার ও বাস্তবায়নের চাপ আরও স্পষ্ট হয়েছে। রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কাটানো, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগ বাড়ানো এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি ছাড়া আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।
এবারের বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ’র বার্ষিক সাধারণ সভা ঘিরে বাংলাদেশের প্রাপ্তি কতটা? এমন প্রশ্ন করা হলে অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, এ ধরনের সভায় তো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয় না। তবে বার্ষিক সাধারণ সভা কেন্দ্র করে দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন বৈঠক হয়। পত্রপত্রিকায় যা দেখলাম তাতে বাংলাদেশ বিভিন্ন বৈঠকে অংশগ্রহণ করেছে এবং ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। এটা ভালো লক্ষণ।
তিনি বলেন, শুধু ইতিবাচক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না, বাস্তবে কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে সেটার ওপরই সাফল্য নির্ভর করবে। তাছাড়া আর একটা বিষয় আইএমএফ থেকে বার বার বলা হচ্ছে ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতের সংস্কার। আগের ঋণ কর্মসূচির ক্ষেত্রেও এগুলো বলা হয়েছিল, নতুন ঋণ কর্মসূচির ক্ষেত্রেও সেসব কথাই বলা হচ্ছে। সুতরাং নতুন ঋণ কর্মসূচির ক্ষেত্রেও সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এখন দেখার বিষয় সামনে কি হয়।

সৌজন্যে- জাগো নিউজ

শেয়ার করুন!