বেসরকারি ব্যাংকে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ হ্রাসে অবস্থানে অনড় অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নিয়ে দেশের প্রভাবশালী ব্যাংক মালিকদের চাপের মুখেও নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি।
নতুন সংস্কার প্রস্তাব
গেলসপ্তাহে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থ বিভাগে পাঠানো ব্যাংক কোম্পানি আইনের খসড়া সংশোধনী অনুযায়ী, একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের সর্বোচ্চ সদস্য সংখ্যা ৩ জন থেকে কমিয়ে ২ জন করার প্রস্তাব করেছে।
এ ছাড়া, পরিচালকদের টানা ১২ বছরের মেয়াদ কমিয়ে ৬ বছর করা হবে এবং ফের নিয়োগের ক্ষেত্রে অন্তত ৩ বছরের বিরতি বাধ্যতামূলক থাকবে।
দুটি পদক্ষেপই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় করা খসড়া প্রস্তাবেও কমানো হয়েছিল। পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালকদের মেয়াদের ক্ষেত্রে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ব্যাংক তার পূর্বসূরি আহসান এইচ মনসুরের নেওয়া প্রস্তাব বহাল রেখেছে।
তবে, স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের আগের প্রস্তাবটিতে কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। এর ফলে পর্ষদ গঠনে মালিকদের নিয়ন্ত্রণ আগের মতোই বহাল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে ।
নতুন খসড়া অনুযায়ী, ব্যাংকের পর্ষদে পরিচালকের সংখ্যা ২০ জন পর্যন্ত রাখা যাবে; তবে স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা ২ থেকে বাড়িয়ে ৫ করা হয়েছে। আগের খসড়ায় পর্ষদের সদস্য সংখ্যা ১৫-তে নামিয়ে আনার প্রস্তাব ছিল, যার অন্তত অর্ধেক আসন স্বতন্ত্র পরিচালকদের জন্য বরাদ্দ থাকার কথা ছিল।
নতুন খসড়ায় ব্যাংকের পরিচালক বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হওয়ার শর্তগুলো আরো কঠোর করা হয়েছে।
বিধিনিষেধ
ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি আরেকটি বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইলে কৌশলগত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য শেয়ার ধারণের বিদ্যমান ১০ শতাংশের সীমা শিথিল করতে পারবে, যদি তারা মনে করে এটি ব্যাংকিং খাতের জন্য লাভজনক হবে। এতে বিদেশি বা বড় দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার কেনার সুযোগ বাড়বে।
মন্দ ঋণের ভারে জর্জরিত ব্যাংকিং খাতকে ঢেলে সাজানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এই সংস্কার প্রস্তাবগুলো এসেছে। মুডি’স রেটিংয়ের ১৫ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট ঋণের প্রায় ৩২ দশমিক ৮ শতাংশই বর্তমানে খেলাপি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এর জন্য মূলত দায়ী সেই সব পরিবার ও কর্পোরেট গোষ্ঠী, যারা নিজেদের ব্যাংক থেকে নিজেরাই বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে তা ব্যবসায় খাটিয়েছে।
এদিকে, ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস’ এই সংস্কারের বিরুদ্ধে জোরালো তদবির চালিয়ে যাচ্ছে।
তাদের যুক্তি হলো- পর্ষদে পারিবারিক সদস্য সংখ্যা কমালে দীর্ঘদিনের মালিকানা কাঠামো ভেঙে পড়বে। পরিচালকদের মেয়াদ কমালে পর্ষদ অভিজ্ঞতাহীন হয়ে পড়বে এবং পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে ব্যাংকের ওপর মালিকদের নিয়ন্ত্রণ কমে যাবে।
চলতি বছরের ২০ সেপ্টেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে আয়োজিত এক বৈঠকে ব্যাংক মালিকেরা পর্ষদে পরিবারের সদস্য সংখ্যা সর্বোচ্চ ৩ জন এবং পরিচালকদের মেয়াদ ৯ বছর করার দাবি করেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মন্ত্রিসভায় উত্থাপনের আগে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে খসড়াটি পর্যালোচনা করা হবে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো- আসন্ন সংসদ অধিবেশনে এই বিলটি উত্থাপন ও পাস করা।
ব্যাংকিং সংকটের কারণে সরকারের ওপর আর্থিক বোঝা বেড়েই চলেছে। অন্তর্বর্তী সরকার সংকটাপন্ন ৫টি বেসরকারি ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করেছে, একীভূত ব্যাংকে ইতোমধ্যে বাজেট থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা জোগান দেওয়া হয়েছে।
১০ অক্টোবর গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানান, ব্যাংক থেকে লুট হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে আগামী ৫ থেকে ৮ বছর ধরে প্রতি বছর ৬০ হাজার কোটি টাকা সরকারি তহবিলের প্রয়োজন হবে।
মুডি’সের প্রাক্কলন অনুযায়ী, পুরো ব্যাংকিং খাতকে পুনর্গঠন করতে বা মূলধন জোগাতে জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ অর্থের প্রয়োজন হতে পারে।
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের নীতিমালারও বারবার পরিবর্তন হয়েছে।
ব্যাংক মালিকদের চাপে ২০১৮ সালে পরিচালকদের মেয়াদ ৬ বছর থেকে বাড়িয়ে ৯ বছর করা হয়। এরপর ২০২৩ সালে তৎকালীন সরকার তড়িঘড়ি করে আইন সংশোধন করে সেই মেয়াদ ১২ বছরে উন্নীত করে।
বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা এর প্রতিবাদে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিলেন এবং তাদের মধ্যে একজন ব্যাংক পরিচালকদের সরাসরি ‘ব্যাংক লুটের মূলহোতা’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।








