ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচন: নেতানিয়াহুর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বীর তুমুল লড়াই

27 October, 2026

প্রকাশের সময়: 05:29 pm, 27th Oct, 2026

সর্বশেষ আপডেট: 05:29 pm, 27th Oct, 2026

ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে জনমত জরিপ বলছে, নেতানিয়াহু ও তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দেশটিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটে মোট ১শ ২০টি আসন রয়েছে। তবে এ পর্যন্ত কোনো একক দল সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে ৬১টি আসন কখনোই পায়নি। ফলে ইসরায়েলে সবসময় জোট সরকার ক্ষমতায় থেকেছে।

এ বিষয়ে বিবিসি এক প্রতিবেদনে বলেছে, ইসরায়েলের আজ জাতীয় নির্বাচনে ভোটাররা ভোট দিতে যাচ্ছেন, যেটিকে অনেকেই দেশটির ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে দেখছেন।

বলা হচ্ছে, এ নির্বাচনে ৫ লাখ ভোটার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন এবং অভাবনীয়ভাবে দেশটির ৭০ হাজার মানুষ কেবল ভোট দেওয়ার জন্য বিদেশ থেকে দেশে ফিরে এসেছেন।

শুক্রবার প্রকাশিত জনমত জরিপ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকোট প্রায় হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে রয়েছেন।

তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন এ দুইজনের কোনো রাজনৈতিক জোটই পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে না। এর অর্থ হচ্ছে, সামনে কয়েক সপ্তাহ বা মাসব্যাপী রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলতে পারে দেশটিতে।

ইসরায়েলের পার্লামেন্টে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার কারণে দেশটির সরকার বরাবরই জোট সরকার হয়ে থাকে এবং ক্ষমতা দখলের এ দৌড় অপ্রত্যাশিত ও নতুন জোট তৈরি করতে পারে, যা অতীতেও করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল।

কিন্তু এ নির্বাচনটি বিশেষভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে বলে মনে করা হচ্ছে  এবং পক্ষগুলোর মধ্যে সীমারেখা ইতোমধ্যে নির্ধারিত হয়ে গেছে।

নবগঠিত ইয়াশার পার্টির নেতা আইজেনকোট তথাকথিত পরিবর্তন জোটের মূল মুখ। এ জোটটি এমন কয়েকটি দল নিয়ে গঠিত যাদের মধ্যে আদর্শগত পার্থক্য থাকলেও নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করাই তাদের লক্ষ্য।

এ জোটের অন্যান্য নেতাদের মধ্যে রয়েছেন- সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও আভিগডর লিবারম্যান, দুইজনই ডানপন্থী এবং নিরাপত্তা বিষয়ে কট্টরপন্থী। এছাড়াও এ জোটে আছেন বামপন্থী সাবেক জেনারেল ইয়ার গোলান।

ইসরায়েলি রাজনীতির দিকপাল এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু, যিনি ১৯৯৬ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন, এবার তার ক্ষমতায় ফেরা নির্ভর করছে উগ্রডানপন্থী এবং অতিগোঁড়া ইহুদি দলগুলোর সঙ্গে আরেকটি জোট গঠনের ওপর, যে দলগুলো নিয়ে তার বর্তমান শাসক জোট গঠিত।

বলা হয়ে থাকে, এটি ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে ডানপন্থী জোট।

দুটি আরব জোটও প্রতিদ্বন্দ্বিতায়

দুটি আরব দলীয় জোটও রয়েছে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। কারণ, ইসরায়েলের জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব, যাদের অনেকেই নিজেদের ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। তাত্ত্বিকভাবে, তারাই নির্বাচনের ফলাফল পরিবর্তনের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠতে পারেন।

যদিও প্রধান ইহুদি দলগুলোর মধ্যে একটি ছাড়া বাকি সবাই তাদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে।

জনমত জরিপ প্রকাশ

মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত ১০টায় (জিএমটি রাতে আটটায়) ইসরায়েলি সম্প্রচার মাধ্যমগুলো এক্সিট পোল প্রকাশ করবে। এগুলো ভোটের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেবে, কিন্তু এতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকতে পারে।

সারাদেশে ইসরায়েলিরা ফলাফল আসতে দেখার জন্য জড়ো হবে। এর মধ্যে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি জেরুজালেমে এবং মাত্র গত বছর গঠিত আইজেনকোটের ইয়াশার তেল আবিবে সমাবেশ করবে।

নিরাপত্তার বিষয়টিই এ নির্বাচনে প্রচারণার মূল ইস্যু হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে।

নেতানিয়াহুর জন্য গণভোট- দ্য গার্ডিয়ান

এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলের নির্বাচনকে দেশটির সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জন্য এক ধরনের ‘গণভোট’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জনমত জরিপে ইঙ্গিত মিলছে, নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ হাড্ডাহাড্ডি হতে পারে।

তবে ইসরায়েলিরা সরাসরি কোনো ব্যক্তিকে ভোট দেন না। তারা ভোট দেন রাজনৈতিক দলকে। এরপর দলগুলো জোট গঠন করে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের চেষ্টা করে।

দেশটির পার্লামেন্ট, যা ‘নেসেট’ নামে পরিচিত, তার ইতিহাসে কোনো একক দলই কখনো এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।

মঙ্গলবার রাতে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর সরকার গঠন এবং পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ছোট-বড় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে ক্ষমতা নিয়ে দর-কষাকষি শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হতে কয়েক সপ্তাহ, এমনকী কয়েক মাসও লেগে যেতে পারে। তবে ইসরায়েলিরা যখন ভোট দিতে যাচ্ছেন, তখন নির্বাচনটি সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা রয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে চালানো হামলার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত ও ট্রমার প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

সে হামলায় সশস্ত্র হামলাকারীরা ১ হাজার ২০০ জনকে হত্যা করে, যাদের অধিকাংশই ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। এ ছাড়া ২শ ৫১ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যাওয়া হয়।

ওই হামলার পর গাজাসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে, যার প্রভাব এখনো অব্যাহত রয়েছে।

ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিনটি নির্বাচনী প্রচারণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

৭ অক্টোবরের হামলার আগে ও পরে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যেসব ব্যর্থতা দেখা দিয়েছিল এবং এর ফলে ইসরায়েলি সমাজকে যে বিশাল চাপের মুখে পড়তে হয়েছে, তা নিয়েই বেশি আলোচনা করছেন ইসরায়েলিরা।

অন্যদিকে, যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় মানুষের মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে তাদের আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম।

ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট-এর তথ্য

জেরুজালেমভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের প্রায় ৬৮ শতাংশ ইহুদি নাগরিক মনে করেন, ৭ অক্টোবরের ঘটনা সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি- কোন রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করবেন, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা তদন্তে একটি তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। একইসঙ্গে তিনি ইরানসহ বিভিন্ন বিষয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছেন।

অন্যদিকে, তার বিরোধীরা ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতার জন্য নেতানিয়াহুর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। পাশাপাশি, অতিগোঁড়া ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদান থেকে অব্যাহতি দেওয়ার তার প্রচেষ্টারও সমালোচনা করছেন তারা। দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধের এই সময়ে এ নীতি ইসরায়েলের সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।

ইসরায়েলের ইহুদিদের মধ্যে সামরিক বাহিনীতে যোগদান নিয়ে ধর্মীয় বিভেদ

যুদ্ধবিরতি অনিশ্চিত থাকা অবস্থায় ইসরায়েল এখনো যুদ্ধের প্রস্তুতি বজায় রেখেছে। ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের এক জরিপে অংশ নেওয়া ইহুদি ভোটারদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বলেছেন, কোন রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করবেন, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারগুলো দীর্ঘদিন ধরে অতিরক্ষণশীল ইহুদি ধর্মীয় দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করে এসেছে। এসব দল ধর্মীয় শিক্ষায় নিয়োজিত তরুণদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানায়।

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী আইজেনকট এই অব্যাহতি ব্যবস্থা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। গাজায় যুদ্ধে তিনি নিজের ছেলেকে এবং দুই ভাতিজাকে হারিয়েছেন। তিনি চান, ধর্মীয় শিক্ষায় নিয়োজিত তরুণদের সামরিক বাহিনীতে যোগ না দেওয়ার যে প্রচলিত সুযোগ রয়েছে, তা বন্ধ করা হোক।

প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতারা

নির্বাচনে ৩ ডজনেরও বেশি রাজনৈতিক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর মধ্যে প্রায় এক ডজন দল সংসদে প্রবেশের মতো পর্যাপ্ত আসন পেতে পারে।

বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু (৭৭) ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল, জাতীয়তাবাদী দল লিকুদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও ভবিষ্যত অনেকটাই নির্ধারিত হতে পারে।

গাদি আইজেনকোট (৬৬) ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীতে প্রায় ৪ দশক ধরে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করে শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছান। ২০২২ সালে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর বর্তমানে তিনি মধ্যপন্থী দল ইয়াশারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দলটি এখন ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বিরোধী দল।

শেয়ার করুন!