বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি গ্রাম অন্য এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি (এএ)।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) দ্য ডিপ্লোম্যাট এ খবর জানায়।
খবরে বলা হয়, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) হামলার আশঙ্কা এবং মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
তবে কতটি গ্রাম সরানো হবে এবং কখন এ কার্যক্রম শেষ হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি।
চলতি বছরের ২ মার্চ এক সাক্ষাৎকারে আরাকান আর্মির প্রধান তুয়ান ম্রাত নাইং এ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন।
সে সময় তিনি বলেন, সীমান্তের অনেক গ্রাম একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং সেগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। সে কারণে বাসিন্দাদের এমন জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে, যেখানে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা সহজ হবে। এসব সীমান্তবর্তী গ্রামের অনেকগুলোতেই ম্রো সম্প্রদায়ের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বসবাস করেন।
সীমান্ত এলাকায় আরসা’র তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ
দ্য ডিপ্লোম্যাট জানায়, বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্ত রয়েছে প্রায় ২৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ। এর মধ্যে প্রায় ৬৪ কিলোমিটার নদীসীমান্ত, যেখানে নাফ নদী দুই দেশের সীমানা নির্ধারণ করেছে।
মিয়ানমারের মংডু ও চিন রাজ্যের পালেতোয়া অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের কক্সবাজার এলাকার সীমান্ত রয়েছে। মিয়ানমারের এই দুই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ আরাকান আর্মির হাতে থাকলেও মংডু জেলার সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো নিয়ে সংগঠনটি বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন।
উত্তর রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বসবাস বেশি হলেও সীমান্তের শতাধিক গ্রামে রাখাইন বৌদ্ধ, ম্রো, খামি ও চাকমাসহ বিভিন্ন অ-রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তথাকথিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’-এর সময় বহু রোহিঙ্গা গ্রাম ধ্বংস হয়ে যায় এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
২০২৩ সালের শেষদিকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী আরাকান আর্মির অগ্রযাত্রা ঠেকাতে আরসা ও রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনসহ (আরএসও) কয়েকটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় করে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। পরবর্তী সময়ে মংডুর নিয়ন্ত্রণ আরাকান আর্মির হাতে গেলেও সংঘাতের কারণে আরো অনেক রোহিঙ্গা ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।
২০টি গ্রামকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে আরাকান আর্মি

প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তর মংডুর কয়েকটি রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামে আরসা’র সমর্থন রয়েছে। সংগঠনটি মাঝেমধ্যে আরাকান আর্মি এবং অ-রোহিঙ্গা গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের লক্ষ করে হামলা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া মায়ু পর্বতমালাসংলগ্ন এলাকাতেও তাদের তৎপরতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর মংডুর কোনে চাউং গ্রামে আরসা’র সদস্যরা ১০ বছর বয়েসি এক শিশুকন্যাসহ ৩ জনকে অপহরণ করে হত্যা করে। ওই গ্রামের বাসিন্দা সো মে জানান, ৬ জনের একটি দলের ওপর হামলা হয়েছিল এবং ৩ জন আহত অবস্থায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
সীমান্তবর্তী গ্রামের বাসিন্দারা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা এবং চিকিৎসার জন্য প্রায়ই বাংলাদেশে আসেন। এসব এলাকায় হামলা বাড়লে তাদের যাতায়াত ও প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে আরাকান আর্মি।
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে একাধিক পয়েটে সংঘাতের আশঙ্কা
বর্তমানে রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিত্তে ও আশপাশের এলাকায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে তীব্র লড়াইয়ে জড়িত রয়েছে আরাকান আর্মি।
হারানো এলাকা পুনর্দখলের লক্ষ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ‘অপারেশন ৪৯২৬’ নামে নতুন অভিযান শুরু করেছে। তবে এখন পর্যন্ত এই অভিযানে সেনাবাহিনী উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়নি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
আরাকান আর্মি’র আশঙ্কা, মিয়ানমার সেনাবাহিনী উত্তর রাখাইনে সংগঠনটির বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করতে আরসাকে অস্ত্র ও অন্যান্য সহায়তা দিতে পারে। একইসময়ে আরসা ও আরএসও বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সীমান্তবর্তী শিবির থেকেও তৎপরতা চালাতে পারে। তবে এসব শিবিরের অবস্থান ও কার্যক্রমসংক্রান্ত দাবিগুলো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
আরাকান আর্মির সদস্যরা রাখাইন রাজ্যের বাইরে সাগাইং, ম্যাগওয়ে ও ইরাবতী অঞ্চলেও অবস্থান করছেন এবং স্থানীয় গণপ্রতিরক্ষা বাহিনীর সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কাজ করছেন। ফলে, সীমান্তে আরসার মোকাবিলায় অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করলে সংগঠনটির ওপর চাপ আরো বাড়তে পারে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, আরাকান আর্মি সম্প্রতি বিশেষ জরুরি প্রতিরক্ষা আইনের আওতায় দ্বিতীয় দফায় বাধ্যতামূলক নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করেছে। পাশাপাশি সীমান্ত পর্যবেক্ষণের জন্য ড্রোন, ক্যামেরা ও অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির প্রধান তুয়ান ম্রাত নাইং।
সব মিলিয়ে, সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার পেছনে বাসিন্দাদের নিরাপত্তার পাশাপাশি সীমান্তে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে স্থানান্তর কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামত নেওয়া হবে কিনা এবং কত মানুষকে সরানো হতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।








