জাহিদ হাসান
সম্প্রতি আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র ফারুক হাসান।
তিনি গণঅভ্যুত্থানের আগে থেকেই হাসিনাবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য বেশ আলোচিত ব্যক্তিত্ব। একইসঙ্গে ছিলেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের সহযোদ্ধাও।
ইতোমধ্যে, বিদ্যুৎখাতের কোম্পানিতে নিয়োগ পাওয়ায় সমসাময়িক রাজনৈতিক বোদ্ধাদের দ্বারা কটাক্ষ ও তিরস্কারের শিকার হন ফারুক হাসান।
ফারুক হাসানের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বিদ্যুৎখাতের অভিজ্ঞতা নিয়ে সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমে এক প্রতিক্রিয়ায় এনসিপি’র সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব সারজিস আলম নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন- “একটা ন্যাশনাল পার্টির মুখপাত্র ‘উপ-সচিব’ পদমর্যাদায় চাকরি করবে! পার্টি কতটা দেউলিয়া হলে হীনম্মন্যতা থেকে নেতারা এই কাজ করতে পারে!”

ফারুক হাসানের নিয়োগ নিয়ে করা সারজিস আলমের ফেসবুক পোস্টের জবাবে পাল্টা স্ট্যাটাস দিয়ে সারজিসের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি তাকে রাজনীতি ছেড়ে পড়ালেখায় মনোনিবেশ করার পরামর্শ দিয়েছেন ফারুক হাসান।

একই নিয়োগ ঘিরে কটাক্ষ করে এনসিপি’র সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে দেওয়া এক পোস্টে ফারুক হাসানের একটি ছবি শেয়ার করে লেখেন, ‘বিএনপির গণঅধিকার পরিষদ শাখার মাঝারি সারির কর্মী ফারুক হোসেনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় পড়াশোনা থাকা সত্ত্বেও, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এই সময়ে তাকে বিদ্যুৎখাতে পরিচালক নিয়োগ দেওয়ায় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন।

সবার জ্ঞাতার্থে বলি, গত এক বছরে গুলশান অফিসে তিনি বিদ্যুৎ বিষয়ে পিএইচডি, বিরোধী দলকে গালাগালি বিষয়ে মাস্টার্স এবং কীভাবে বিদ্যুতের বিল বাড়িয়ে গুলশান অফিসের খরচ জোগানো যায়, সে বিষয়ে অনার্স সম্পন্ন করেছেন!’
ফারুক হাসানের বক্তব্য
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফারুক হাসান ‘দৈনিক সওদা’কে বলেন, ‘আমার এই নিয়োগ এনসিপি’র কিছু ছেলেপেলের সহ্য হচ্ছে না। অথচ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় তারা পুরো সুবিধা ভোগ করেছেন। তারা যে উপদেষ্টা হয়েছিল, তা কোন ক্যাটাগরিতে, কোন যোগ্যতায়! তারা গেলে হালাল আর অন্যরা গেলেই হারাম! এক ধরনের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব থেকেই এই কথাবার্তা বলছেন তারা।’
তিনি বলেন, ‘আমার এই নিয়োগে আমি কিন্তু সরকারি আমলা বা গ্রেড ভুক্ত চাকুরিজীবী না। এখানে আমার কোনো বেতন-ভাতা নেই। এখানে দুটি ফাংশন কাজ করে। প্রথমটি হলো- অপারেশনাল ফাংশন যেখানে থাকেন আমলারা। দ্বিতীয়টি হলো বোর্ড অব ডাইরেক্টর যারা সরকারের ওয়াচডগ হিসেবে থাকেন। কোনো দুর্নীতি হচ্ছে কিনা বা কাজ ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা তা সরকারকে জানানো এই বোর্ডের কাজ। আমি অপারেশনাল ফাংশনের না যে, আমাকে বিদ্যুৎ সম্পর্কে খুঁটিনাটি জানতে হবে।’
শুধু ফারুক হাসান নন, তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের সময়ে রাজনৈতিকভাবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসেন এক ঝাঁক তরুণ রাজনৈতিক নেতৃত্বও।
এদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন- প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যুব কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী হিসেবে সাইয়েদ বিন আব্দুল্লাহ, সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পান মানসুরা আলম, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খানসহ প্রমুখ।
এসব নিয়োগ ঘিরে বিরোধীশিবিরে হয়েছে নানান আলোচনা ও সমালোচনাও। বিরোধীদলীয় নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন তাদের যোগ্যতা নিয়েও।
এমন কটাক্ষ এবং সমালোচনা যেন নিয়মিত তরুণদের নিয়মিত রাজনৈতিক আচারে পরিণত হয়েছে। সরকারের দফতরগুলোতে কেউ নিয়োগ পেলে তা নিয়ে কটাক্ষ বা সমালোচনা করে বিরোধী বা অন্যান্য রাজনৈতিক দল।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতেও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দফতরগুলোতে নিয়োগ পান তরুণ রাজনৈতিকরা। তখন নুরুল হক নুর ও ফারুক হাসানরাও একইরকমভাবে সমালোচনার তীর ছুড়েছিলেন তৎকালীন সরকারের নিয়োগপ্রাপ্তদের নিয়ে।
সেসময় জ্বালানি খাতে কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা না থাকলেও গণঅভ্যুত্থানের পর ‘কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড’-এর (সিপিজিসিবিএল) স্বতন্ত্র পরিচালক হন গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী গঠিত সংগঠন ‘আপ বাংলাদেশ’-এর প্রধান সমন্বয়ক রাফে সালমান রিফাত।
একইভাবে ২০২৪ সালের ২ অক্টোবর তৎকালীন ছাত্রনেতা তুহিন ফারাবীকে সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন আপ বাংলাদেশ-এর আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ।
একইভাবে জুলাই গণহত্যায় শহিদদের স্মৃতি ধরে রাখতে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন গঠন করা হয়। এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ। একই ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদকের পদেও দায়িত্বে ছিলেন সারজিস আলম নিজেই। নিয়োগপ্রাপ্তদের কেউই সংশ্লিষ্ট কর্মক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ছিলেন না।
তখন এসব নিয়োগের বিরুদ্ধে মন্তব্য করতেন ফারুক হোসেনরাই। সে হিসেবে এখন ফারুকদের নিয়োগ নিয়েও মন্তব্য করছেন সারজিস, পাটোয়ারীরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও উঠেছিল। ২০২৫ সালের এপ্রিলে এনসিপি’র যুগ্ম সদস্যসচিব গাজী সালাহউদ্দিন তানভীরের বিরুদ্ধে একজন জেলা প্রশাসক নিয়োগে হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠে। এ অভিযোগের পর দলটি তাকে দলীয় দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেয় এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠায়।
এসব বিষয়ে জানার জন্য এনসিপি’র একাধিক নেতার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অভিমত
এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আলী আহসান জুনায়েদ, রাফে সালমান রিফাত, মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ, সাইয়েদ বিন আব্দুল্লাহ, রাশেদ খান, ফারুক হাসানদের নিয়োগের ক্ষেত্রে দায়িত্ব, যোগ্যতা এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের শর্ত কী ছিল, তা কি আদৌ যাচাই করা হয়েছিল কিনা, সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। তবে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ সব দেশেই হয়ে থাকে। বাংলাদেশে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
রাজনৈতিক নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ ‘দৈনিক সওদা’কে বলেন, ‘নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা না থাকার কারণেই সমালোচনা হয়। যখন আমরা ছোট থেকে বড় সব পদে দলীয়করণ বা আত্তীকরণ করি, সমালোচনা তখনই হয়। যে যখন ক্ষমতায় থাকে তার লোক রাখতে চায়, সুবিধা দিতে চায়। এই ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো সেগুলো মেনে চলে না। বিষয়টা এমন হয়েছে- যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ!’
তিনি আরো বলেন, ‘উন্নত দেশগুলোর যেগুলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সেগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা সব পদকে দলীয়করণ করেনি। সে কারণে আমাদের পরামর্শ থাকবে, সব নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতার সঙ্গে লোক নিয়োগ দেওয়া হোক।’








