নির্বাচনে আ.লীগকে ফেরাতে জাতিসংঘের দ্বারে হাসিনা

28 October, 2026

প্রকাশের সময়: 03:06 pm, 28th Oct, 2026

সর্বশেষ আপডেট: 03:17 pm, 28th Oct, 2026

আ.লীগকে নির্বাচনে ফেরানোর দাবিতে জাতিসংঘের দ্বারস্থ হাসিনা

আগামী জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের কাছে আবেদন করেছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আইনজীবীরা। একইসঙ্গে দলটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের দাবিও জানানো হয়েছে।

নির্বাচনে অংশগ্রহণে আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক ছিল না বলে অভিযোগও করেছেন শেখ হাসিনা।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক আইনজীবী প্রতিষ্ঠান ম্যাট্রিক্স চেম্বার্সের ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিবৃতি অনুযায়ী, জাতিসংঘের ৩ জন বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো যোগাযোগপত্রে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় দলটির অংশগ্রহণের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাপরবর্তী বিএনপি সরকারও বহাল রেখেছে এবং তা আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে বলে ম্যাট্রিক্স চেম্বার্সের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

শেখ হাসিনার আইনজীবীরা এ পরিস্থিতিতে দলটিকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

আবেদনে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের কাছে বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে প্রকাশ্য বিবৃতি দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়ার বিষয়ে বিএনপি সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।

৪টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ

শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে জাতিসংঘের কাছে পাঠানো যোগাযোগপত্রে বলা হয়, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তির (আইসিসিপিআর) ৪টি ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এর মধ্যে রয়েছে- চুক্তির ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে; ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ, যেখানে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার স্বীকৃত; ২২ নম্বর অনুচ্ছেদ, যেখানে সংগঠন করার স্বাধীনতা সুরক্ষিত; এবং ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ, যেখানে রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।

তাদের বক্তব্য, রাজনৈতিক দলটির কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা শুধু দলটির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডকেই প্রভাবিত করছে না, বরং সমর্থকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগও সীমিত করছে। ফলে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

তবে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দিয়েছেন কি না, কিংবা নিষেধাজ্ঞার আইনগত বৈধতা নিয়ে তাদের আনুষ্ঠানিক অবস্থান কী, তা ম্যাট্রিক্স চেম্বার্সের বিবৃতিতে জানানো হয়নি।

আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগ

আবেদনে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগও তুলে ধরা হয়। শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে দলটির আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং বাংলাদেশের আদালতে নিষেধাজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করার উদ্যোগ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

জাতিসংঘের ৩ বিশেষজ্ঞের কাছে আবেদন

শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে জাতিসংঘের ৩ জন বিশেষজ্ঞের কাছে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। এই ৩ বিশেষজ্ঞ হলেন- সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার ক্ষেত্রে মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার সুরক্ষা এবং প্রসারের বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক; শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠন করার স্বাধীনতার অধিকারবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক; এবং গণতান্ত্রিক ও ন্যায়সঙ্গত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে জাতিসংঘের স্বাধীন বিশেষজ্ঞ।

জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা তাদের নির্ধারিত দায়িত্বের আওতায় বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে পারেন, সংশ্লিষ্ট সরকারের কাছে উদ্বেগ জানাতে পারেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকাশ্য বক্তব্য দিতে পারেন।

তবে তাদের কাছে আবেদন করা মানেই জাতিসংঘের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বা আবেদনকারীর দাবির পক্ষে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে, এমন নয়।

এই আবেদনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার পক্ষ মূলত আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নটিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আলোচনায় তুলে ধরতে চাইছে। দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যত, ভোটাধিকার এবং বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সব রাজনৈতিক পক্ষের অংশগ্রহণের বিষয়টি এখন এ আবেদনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

বিএনপি সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা

আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকায় দলটির নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই বলে শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। এ পরিস্থিতিতে নতুন নির্বাচন আয়োজন এবং আওয়ামী লীগকে তাতে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য বিএনপি সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ তৈরিই আবেদনের অন্যতম লক্ষ্য।

তবে নতুন নির্বাচন আয়োজনের দাবি ও আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি দলটির ওপর নিষেধাজ্ঞার আইনগত ভিত্তি, নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার কারণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানো যোগাযোগপত্রে এসব বিষয়ে শেখ হাসিনার পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরা হয়। কিন্তু আবেদনটির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার বা জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার কথা প্রকাশিত বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়নি।

ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা শেখ হাসিনার

এদিকে, আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। এরপর থেকে তিনি ভারতেই অবস্থান করছেন।

শেখ হাসিনার আইনজীবীদের এই উদ্যোগের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা, দলটির নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার এবং বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।

তবে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা আবেদনটির ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ নেবেন, বাংলাদেশের সরকারকে কোনো বার্তা দেবেন কি না কিংবা নতুন নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে কোনো আহ্বান জানাবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

একইভাবে, এ আবেদনের ফলে আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা নতুন নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে কোনো তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আসবে কি না, সে সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য নেই।

সব মিলিয়ে, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং দলটিকে অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়ে নতুন নির্বাচন আয়োজনের দাবি নিয়ে শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে জাতিসংঘের দ্বারস্থ হওয়া বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক বিতর্ককে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পরিসরে তুলে ধরেছে।

এখন এ আবেদনের বিষয়ে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রতিক্রিয়া কী হয়, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

শেয়ার করুন!