আগামরা রোগের প্রকোপ কমায় সুন্দরবনের পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন

30 October, 2026

প্রকাশের সময়: 06:29 pm, 30th Oct, 2026

সর্বশেষ আপডেট: 06:29 pm, 30th Oct, 2026

ফাইল ফটো

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে সুন্দরী গাছের আগামরা রোগের প্রকোপ ধীরে ধীরে কমছে। একই সঙ্গে এসব গাছের কার্বন ধারণক্ষমতাও বেড়েছে।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত চার দশকে সুন্দরবনের সুন্দরী গাছে সঞ্চিত মোট কার্বনের পরিমাণ ২১ শতাংশ বা ১৪ লাখ টন বেড়েছে।

একই সময়ে রোগাক্রান্ত সুন্দরী গাছের সংখ্যা ৬ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, সুন্দরবনে এ প্রজাতির গাছের মোট সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ বা ৫ শতাংশ বেড়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বন বিভাগের সূত্র জানায়, সুন্দরী গাছের ওপরের দিকের ডালপালা ও পাতা ধীরে ধীরে মরে যাওয়ার এ রোগ বা অস্বাভাবিকতা সুন্দরবনের দীর্ঘদিনের একটি পরিবেশগত সমস্যা। এ রোগে আক্রান্ত গাছের ওপরের অংশ শুকিয়ে মরে যায় এবং গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্রিটিশ বন বিশেষজ্ঞ আরএস ট্রুপ ১৯২১ সালে প্রথম সুন্দরী গাছের রোগাক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন।

১৯২০-এর দশকে ব্রিটিশ আমলে পরিচালিত বন জরিপের প্রতিবেদনে সুন্দরবনের প্রায় ১৩ থেকে ১৭ শতাংশ সুন্দরী গাছকে রোগাক্রান্ত বা আগামরা রোগে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে ১৯৩১ সালে এসআই কার্টিস সুন্দরবনের বন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় অজ্ঞাত কারণে কিছু সুন্দরী গাছ মারা যাওয়ার বিষয়টি নথিভুক্ত করেন।

১৯৭০-এর দশকের পর রোগটি বিশেষভাবে তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৭৫ সালের দিকে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের ফলে সুন্দরবন অঞ্চলে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যায়। এতে মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায় এবং সুন্দরী গাছে আগামরা রোগের বিস্তার ঘটে বলে ধারণা করা হয়।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ ড. স্বপন কুমার সরকার বলেন, আগের তুলনায় সুন্দরী গাছে আগামরা রোগের প্রকোপ কমেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, গত ৪০ বছরে সুন্দরী গাছে সঞ্চিত মোট কার্বনের পরিমাণ ২১ শতাংশ বা ১৪ লাখ টন বেড়েছে। রোগাক্রান্ত গাছের সংখ্যা ৬ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে সুন্দরবনজুড়ে সুন্দরী গাছের মোট সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ বা ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ছত্রাক ও রোগজীবাণু, পানি নিষ্কাশন ও মাটির বায়ু চলাচলে বিঘ্ন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ঘূর্ণিঝড়কে আগামরা রোগের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এখনো এর সুনির্দিষ্ট কারণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

অধ্যাপক স্বপন কুমার সরকার বলেন, রোগ নিয়ন্ত্রণে শুধু আক্রান্ত গাছ শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়। এর প্রকৃত কারণ নির্ণয়, দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ, বন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং সুন্দরী গাছের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম নিশ্চিত করাও জরুরি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের বন ব্যবস্থাপনায় এ রোগ নিয়ে গবেষণাকে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ, সুন্দরী গাছ শুধু সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান প্রজাতিই নয়, বনটির কাঠামো, জীববৈচিত্র্য ও কার্বন ধারণক্ষমতা বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বাসসের সঙ্গে আলাপকালে খুলনার সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. হাসানুর রহমান বলেন, সুন্দরী গাছে আগামরা রোগের প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

তিনি বলেন, বন টহলের সময় এখন প্রায়ই সুন্দরী গাছের বীজ ও চারা দেখা যাচ্ছে। এটি প্রজাতিটির নতুন বংশবিস্তার ও প্রাকৃতিকভাবে নতুন বনাঞ্চল গড়ে ওঠার ইঙ্গিত দেয়।

বাগেরহাটের সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, আগের বছরগুলোর তুলনায় সুন্দরবনের অবস্থা এখন ভালো। নতুন সুন্দরী গাছের বাগান গড়ে উঠছে এবং বনের সবুজ আচ্ছাদন বাড়ছে।

তবে তিনি জানান, পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের কয়েকটি প্রাকৃতিকভাবে আক্রান্ত এলাকায় এখনো সুন্দরী গাছে আগামরা রোগ দেখা যায়।

যোগাযোগ করা হলে খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদও সুন্দরী গাছের কার্বন ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আগামরা রোগের প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, বন বিভাগের সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় বেশ কয়েকটি গবেষণা কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে এবং আরও কিছু কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

সুন্দরবনের প্রতিবেশব্যবস্থা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ধারাবাহিক গবেষণা এবং তথ্য-প্রমাণভিত্তিক বন ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।

শেয়ার করুন!