পেশায় সিভিল প্রকৌশলী। কিন্তু শেকড়ের টানে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে দিয়েছেন গ্রামীণ কৃষির চিত্র। রাজবাড়ী সদর উপজেলার বসন্তপুরের প্রকৌশলী খায়রুল আলম সাড়ে তিন একর জমিতে গড়ে তুলেছেন বিষমুক্ত ড্রাগন, খেজুর, আঙুর ও কাঠিমন আমের মিশ্র ফলের বাগান। নিজস্ব খামারের গোবর দিয়ে তৈরি বার্মি কম্পোস্ট সার ব্যবহারে ফলানো এই বাগান থেকে বছরে মিলছে ২০-৩০ টন ড্রাগন ফল।
বর্তমানে ড্রাগন বেশ লাভজনক। বছরে এই বাগান থেকে ২০-৩০ টন ড্রাগন ফল উৎপাদন করছেন উদ্যোক্তা খায়রুল আলম। যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে পার্শ্ববর্তী জেলা ফরিদপুরসহ আশপাশে বিক্রি করা হয়। ড্রাগন সুস্বাদু ও মিষ্টি এবং বিষমুক্ত হওয়ায় বাগান থেকে বিক্রি হয় বড় একটি অংশ। খেজুরও ধরতে শুরু করেছে বেশ কয়েকটি গাছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শখের বশে সম্পূর্ণ বিষমুক্ত ফল উৎপাদনের লক্ষ্যে ২০২১ সালে নিজ গ্রাম বসন্তপুরের বাজিতপুরের নিজের প্রায় ২০ শতাংশ জমিতে বিদেশি জাতের খেজুর বাগান করেন খায়রুম আলম।
বর্তমানে তার বাগানে বারাহ, আজোয়া, মরিয়মসহ পাঁচ জাতের খেজুরের ৬৪টি চারা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ড্রাগন দিয়ে বাড়ান বাগানের পরিধি। বর্তমানে তার বাগানের প্রায় সোয়া তিন একর জমিজুড়ে রয়েছে প্রায় ২৪ হাজার ড্রাগনের চারা। সেই সঙ্গে তিন জাতের আঙুরসহ কাঠিমন আম চাষ করছেন। রয়েছে গরুর ফার্ম। ফলে জৈবসার তৈরি করছেন নিজ খামার থেকেই।মিশ্র ফলের বাগানসহ ফার্মের পরিচর্যায় স্থায়ীভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে ৭-৮ জনের। স্থানীয় জহির জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এমন সুন্দর বাগান দেখা যায় না।
এখানে ঘুরতে ও ফল কিনতে মাঝেমধ্যেই যাই। এই বাগানের ফল খুব সুস্বাদু ও মিষ্টি। সাধারণত বাজার থেকে কেনা ফল এমন হয় না। তাই নিরাপদ ও ভালো হওয়া নিয়মিত এখান থেকেই ড্রাগন ফল কিনে নিয়ে যাই।’বাগানের পরিচর্যার দায়িত্বে রয়েছেন মাসুদ রানা। তিনি বলেন, ‘বাগানে ড্রাগনসহ খেজর, আঙুর ও আমগাছের চারা রয়েছে। ৭-৮ জন মিলে এগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও দেখাশো করি। এখানে গরুর খামারও রয়েছে। বাগানে নিজেদের উৎপাদিত জৈব সার ব্যবহার করা হয়। যে কারণে ড্রাগন খেতে খুব সুস্বাদু।’বাগানে খেজুর গাছ পরিচর্যা করছিলেন নজরুল ইসলাম বাদল। তিনি জানান, বিদেশি জাতের খেজুরের চারা নিয়ে তিনি সারাদেশে কাজ করে। বাগান পরিচর্যা করতে গাজীপুর থেকে রাজবাড়ীতে এসেছেন।
নজরুল ইসলামবলেন, ‘গতবছর গাছটিতে ৬-৭ ঝোপা খেজুর ধরেছিল। প্রতি ঝোপায় অন্তত ১৫ কেজির বেশি খেজুর ধরেছিল। ফল চাষে ভাল জাতের চারা ড্রামে বসিয়ে সঠিকভাবে পরিচর্যা করতে পারলে দুই বছরে অনেক ফলন পাওয়া সম্ভব। তাই এখানে চারা উঠিয়ে ড্রামে বসানো হচ্ছে।’
কথা হয় বাগান ও ফার্মের তত্ত্বাবধানকারী জমাডিউল আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ইঞ্জিনিয়ার খায়রুল আলমের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনায় শুরুতে অল্প জমিতে বাগান শুরু করা হয়। বর্তমানে বাগানের পরিধি অনেক বড়। এখন পর্যন্ত ড্রাগনে ভালেঅ সফলতা পাওয়া গেছে। নিজেদের তৈরি জৈবসার ব্যবহার করায় ফল খুবই সুস্বাদু। ফলে বাগান থেকেই বেশি ফল বিক্রি হয়ে যায়। যেগুলো থাকে সেগুলো রাজবাড়ীসহ পার্শ্ববর্তী জেলায় পাইকারি দরে বিক্রি করা হয়।
বছরে এখান থেকে ২০-৩০ টন ফল সরবরাহ করা হয়।তিনি আরও বলেন, ড্রাগনের পাশাপাশি বিদেশি জাতের খেজুর, আঙুর, আম ও বারোমাসি সজিনা চাষ করা হচ্ছে। মিশ্র ফল বাগান করা বেশ লাভজনক।এ বিষয়ে প্রকৌশলী খায়রুল আলম বলেন, পেশাগত কাজের কারণে বহু বছর ধরে সপরিবারে ঢাকায় থাকেন। প্রায় পাঁচ বছর আগে শখের বশে গ্রামে নিজের জমিতে বিদেশি জাতের খেজুর বাগান করেন। পরবর্তী সময়ে বিষমুক্ত ফল উৎপাদনের লক্ষ্যে বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন, আঙুরসহ আমবাগান করেন। পাশাপাশি করেন একটি গরুর ফার্ম। বর্তমানে প্রায় পাঁচ একর জায়গাজুড়ে মিশ্র ফল বাগানসহ খামার রয়েছে।
তিনি বলেন, খেজুর, আঙুর ও আম চাষে এখন পর্যন্ত ভালোভাবে সফল না হলেও ড্রাগনে সম্পূর্ণ সফল হয়েছেন। ড্রাগন থেকে ভালো আয় করছেন। গরুর ফার্ম থেকেও ভালো কিছু হচ্ছে। সবমিলিয়ে এখানে ৫-৭ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
‘ফার্মের গরুর গোবর দিয়ে তৈরিকৃত সার বাগানে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে বাগানের সম্পূর্ণ বিষমুক্ত ফল উৎপাদন হচ্ছে। তাছাড়া বাগান বা ফার্মের আয়ের ওপর আমি নির্ভরশীল না। তবে বাগান থেকে যে আয় হয় তাতে বাগান ও ফার্মের দেখাশোনাকারীসহ সব খরচ মিটে যায়’, বলেন প্রকৌশলী খায়রুল আলম।
এ বিষয়ে রাজবাড়ী সদর উপজেলা কৃষি অফিসার মো. জনি খান বলেন, রাজবাড়ীর মাটি ও আবহাওয়া ড্রাগন চাষের জন্য উপযোগী। ফলে কৃষিতে আধুনিককরণ করতে চাষি ও উদ্যোক্তাদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দিন দিন রাজবাড়ীতে মিশ্র ফলচাষি বাড়ছে। তারমধ্যে সফল বসন্তপুর বাজিতপুুরের খায়রুল আলম। কয়েক একর জায়গাজুড়ে তার ড্রাগন বাগান রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে খেজুর, আঙুর ও আমের বাগান। ড্রাগনে তিনি বেশ লাভবান হচ্ছেন।








