আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে কেজিপ্রতি ১৭ টাকা, অথচ হিমাগার থেকে বের করে বিক্রি করতে হচ্ছে ১১ থেকে সাড়ে ১১ টাকায়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে হিমাগার ভাড়া, বস্তা প্যাকিং ও পরিবহন খরচ। সব মিলিয়ে লোকসানের হিসাব এতটাই ভারী যে, হিমাগারে রাখা আলু তুলতেও সাহস পাচ্ছেন না অনেক কৃষক।
রংপুরে চলতি মৌসুমে আলু চাষ করে আবারও লোকসানের মুখে পড়েছেন কৃষকেরা। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর অনেক কম হওয়ায় সংরক্ষিত আলু বিক্রি করে খরচের অর্ধেকও তুলতে পারছেন না অনেকে। গত বছরও লোকসান গুনেছেন এমন অনেক কৃষক এবার ঋণ করে আলু হিমাগারে রেখেছিলেন ভালো দামের আশায়। কিন্তু বাজারের পরিস্থিতি বদলায়নি। বরং লোকসানের বোঝা আরও বাড়ছে।
বাজারদর ও হিমাগার ভাড়ার হিসাব মেলাতে হিমশিম
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ বছর বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরিসহ আলু উৎপাদনে খরচ বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হিমাগারের ভাড়া ও সংরক্ষণ খরচ। কিন্তু বাজারে আলুর পাইকারি দর কমে যাওয়ায় উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে হিমাগার গেটে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ১১ থেকে সাড়ে ১১ টাকায়। খুচরা বাজারে দাম ১৮ থেকে ২০ টাকা। এর মধ্যে চলতি মাসের শেষ দিকে বাজারে আসতে শুরু করবে নতুন আলু। ফলে সংরক্ষিত আলুর দাম আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। এ অবস্থায় অনেকেই হিমাগার থেকে আলু উত্তোলন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৪২টি হিমাগারের মোট ধারণক্ষমতা চার লাখ ৭০ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন। বিপরীতে চলতি মৌসুমে আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে চার লাখ ৮৮ হাজার ৬৩৮ মেট্রিক টন। এর মধ্যে খাবার আলু তিন লাখ ২৪ হাজার ৯৪৮ মেট্রিক টন এবং বীজ আলু এক লাখ ৬৩ হাজার ৬৯০ মেট্রিক টন।
এ পর্যন্ত হিমাগার থেকে প্রায় আড়াই লাখ মেট্রিক টন খাবার আলু এবং ছয় হাজার মেট্রিক টন বীজ আলু বের হয়েছে। গত পাঁচ মাসে গড়ে প্রতি মাসে ৫০ হাজার মেট্রিক টন খাবার আলু উত্তোলন করা হয়েছে।
লোকসানের ভয়ে আলু তুলছেন না কৃষকরা
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বড়বিল ইউনিয়নের কৃষক মজিদুল ইসলাম বলেন, গত বছরও আলু চাষ করে লোকসান গুনেছেন তিনি। এবার ভালো দাম পাওয়ার আশায় ঋণ করে হিমাগারে আলু রেখেছিলেন। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে আলু তুললে গাড়িভাড়া ও হিমাগারের ভাড়াই উঠবে না। উল্টো নিজের পকেট থেকে টাকা দিতে হবে। তাই হিমাগারে রাখা আলু পড়ে থাকার উপক্রম হয়েছে।
রংপুর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের বকশি রঘুবাজার এলাকার কৃষক ভুপাল চন্দ্র রায় বলেন, বর্তমানে তিনি হিমাগার থেকে আলু তোলা বন্ধ রেখেছেন। এ মুহূর্তে আলু উত্তোলন করলে প্রতি কেজিতে তার লোকসান হবে সাড়ে ১৫ থেকে ১৬ টাকা।
তিনি জানান, নগরীর সবুজ বাংলা ও অপু মুন্সী হিমাগারে মোট ৫০০ বস্তা আলু রেখেছেন। বর্তমানে হিমাগার গেটে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ১১ থেকে সাড়ে ১১ টাকায়। অথচ হিমাগার ভাড়া, বস্তা প্যাকিং ও বহনসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজিতে খরচ হচ্ছে আরও বেশি। সব খরচ বাদ দিলে প্রতি কেজি আলুতে দুই থেকে তিন টাকা পাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ভুপাল চন্দ্র রায় বলেন, এমন পরিস্থিতিতে শুধু তিনি নন, তার এলাকার অনেক কৃষকই হিমাগার থেকে আলু উত্তোলন প্রায় বন্ধ রেখেছেন। গত বছরও শেষ পর্যন্ত তিনি আলু উত্তোলন করেননি। এতে তার প্রায় আট লাখ টাকা লোকসান হয়েছিল।
মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ ইউনিয়নের বেলতলী এলাকার কৃষক হায়দার আলী জানান, কিছুদিন আগে তিনি হিমাগার থেকে প্রায় ২৫০ বস্তা আলু তুলে বিক্রি করেছেন। প্রতি কেজি আলু বিক্রি করেছেন ১৫ টাকায়। কিন্তু হিমাগার থেকে উত্তোলনসহ সব মিলিয়ে তার খরচ হয়েছে ১৭ টাকা।
বর্তমানে আলুর দাম কমে ১১ থেকে সাড়ে ১১ টাকায় নেমে আসায় অবশিষ্ট ৫০০ বস্তা আলু থেকে কত টাকা উঠবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি। উৎপাদন খরচই উঠবে না—এমন আশঙ্কায় বাকি আলু আর তুলবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গত বছরও আলু চাষ করে আট লাখ টাকা লোকসান গুনতে হয়েছিল তাকে। এবার লাভের আশায় চাষ করেও আবার লোকসানের মুখে পড়েছেন এই কৃষক।
আলু না তোলায় সংকটে হিমাগার মালিকরাও
কৃষকরা আলু উত্তোলন না করায় বিপাকে পড়েছেন হিমাগার মালিকেরাও। হিমাগারগুলোর ধারণক্ষমতার বড় একটি অংশজুড়ে এখনো আলু পড়ে রয়েছে। অনেক হিমাগার কর্তৃপক্ষ কৃষকদের আলু উত্তোলনের জন্য নোটিশ দিলেও লোকসানের আশঙ্কায় তারা আলু নিতে চাইছেন না।
বদরগঞ্জ উপজেলার মধুপুর ইউনিয়নের শাহজালাল হিমাগার এবং গঙ্গাচড়া উপজেলার এমএনটি হিমাগারের ব্যবস্থাপক সুভাস মুখার্জি বলেন, বর্তমানে হিমাগার গেটে সদ্য উত্তোলিত আলু প্রকারভেদে ১১ থেকে সাড়ে ১১ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হিমাগার দুটির ধারণক্ষমতা যথাক্রমে ১৫ হাজার ও সাড়ে ৯ হাজার মেট্রিক টন। এখনো দুটিতে প্রায় ৫০ শতাংশ আলু রয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের পরও কৃষকরা আলু উত্তোলন না করলে হিমাগার কর্তৃপক্ষ কী করে—জানতে চাইলে তিনি বলেন, অধিকাংশ হিমাগার কর্তৃপক্ষ উত্তোলন না করা আলু কম দামে বিক্রি করে। তবে প্রয়োজনে বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় ভাড়া কমিয়েও কৃষকদের আলু উত্তোলনে সহায়তা করা হয়। গত বছর অনেক হিমাগারে আলু পড়ে থাকলেও তাদের কাছে কোনো আলু ছিল না বলে জানান তিনি।
রংপুরের পীরগাছা উপজেলার নব্দীগঞ্জে অবস্থিত একটি হিমাগারের ব্যবস্থাপক রবিউল ইসলাম বলেন, গত বছর কৃষকদের একাধিকবার তাগাদা দেওয়ার পরও অনেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আলুর বস্তা উত্তোলন করেননি। ফলে বাধ্য হয়ে হিমাগার কর্তৃপক্ষ এক লাখ ৬৬ হাজার বস্তা আলু কম দামে বিক্রি করে। এতে তাদের ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা লোকসান হয়।
রবিউল ইসলাম জানান, তাদের হিমাগারের ধারণক্ষমতা ১২ হাজার মেট্রিক টন। সাধারণত নভেম্বর মাস পর্যন্ত আলু রাখা হয়। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত আলু সংরক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে।
ন্যায্যমূল্য ও সংরক্ষণে সহায়তার দাবি
আলু চাষিদের লোকসান থেকে রক্ষা করতে বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং সংরক্ষণে সহায়তা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, কৃষকরা ধারাবাহিকভাবে লোকসান গুনতে থাকলে আগামী মৌসুমে আলু চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন। এতে দেশের আলু উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হারাগাছ ডিগ্রি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মোনাব্বর হোসেন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত আলুচাষিদের জন্য সহজ শর্তে বিশেষ ঋণ ও প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার বা বিপণন বোর্ডের মাধ্যমে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে আলু কেনার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি দেশের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত আলু বিদেশে রপ্তানির পথ আরও সুগম করতে হবে।
তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ নেওয়া না হলে ধারাবাহিক লোকসানের মুখে কৃষকেরা আলু চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন।
কমতে পারে আগামী মৌসুমে আলুর আবাদ
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ মৌসুমে জেলায় ৫৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। এর আগের ২০২৪-২৫ মৌসুমে আবাদ হয়েছিল ৬৬ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে।
আগাম আলু সাধারণত ৬০ দিনের মধ্যে জমি থেকে তোলা হয়। ডিসেম্বর মাসের শেষ পর্যন্ত উৎপাদিত আলুকে আগাম আলু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কৃষি অফিস থেকে আগাম আলুর কোনো লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা না হলেও গত বছর তিন হাজার হেক্টর জমিতে এ জাতের আলুর আবাদ হয়েছিল। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এবারও প্রায় একই পরিমাণ জমিতে আগাম আলুর আবাদ হতে পারে। সাধারণত নভেম্বর মাসের শেষ দিক থেকে বাজারে আগাম আলু আসতে শুরু করে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) সাইফুল আলম বলেন, পরপর দুই বছর আলু চাষ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কৃষকেরা। তাই আসন্ন ২০২৬-২৭ মৌসুমে জেলায় আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫৪ হাজার হেক্টর নির্ধারণ করা হলেও গত বছরের তুলনায় প্রায় ১০ হাজার হেক্টর কম জমিতে আবাদ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, যারা অতিরিক্ত আলু আবাদ করেন, তাদের ভুট্টা ও সরিষা চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এ ছাড়া সরকারিভাবে এ বছর ভুট্টা ও সরিষা চাষে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়েছে।








