ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-মুন্সিগঞ্জ নৌপথ, ফিটনেসবিহীন লঞ্চ আর কার্গো জাহাজের যত্রতত্র নোঙরে বেড়েছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি

28 July, 2026

প্রকাশের সময়: 12:00 am, 28th Jul, 2026

সর্বশেষ আপডেট: 04:43 am, 28th Jul, 2026

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া লঞ্চ দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-মুন্সিগঞ্জ নৌপথে। ২০২১ সালে কার্গো জাহাজের ধাক্কায় ‘সাবিত আল হাসান’ ডুবে ৩৬ জনের মৃত্যু হয়।

পরে বছর না ঘুরতেই ২০২২ সালে ‘এমএল আফসারউদ্দিন’ ডুবে ১০ প্রাণহানির ক্ষত এখনো শুকায়নি। দুর্ঘটনার পর নিরাপদ নৌযানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বন্ধ করা হলেও তা না মেনেই আবার চালু হয়েছে পুরনো ও ফিটনেসবিহীন লঞ্চ।

বর্তমানে জরাজীর্ণ এ নৌযানগুলোর পাশাপাশি ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যা নদীতে কার্গো জাহাজের নোঙর করা যাত্রীদের জন্য মরণফাঁদ তৈরি করেছে। জরাজীর্ণ লঞ্চ, অতিরিক্ত যাত্রী, অদক্ষ চালক ও নদীর মাঝখানে বিশৃঙ্খলভাবে জাহাজ নোঙরের কারণে এ নৌপথে লঞ্চ দুর্ঘটনার ঝুঁকি আগের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। তবে জেলা প্রশাসন শিগগিরই এসব অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছে।

গতকাল সরজমিনে মুন্সিগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনাল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দীর্ঘদিনের পুরনো ফিটনেসবিহীন এসব লঞ্চ প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ২০ মিনিট পরপর নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে ছেড়ে যায় এ ঘাট থেকে। প্রতিদিন হাজারো যাত্রী চলাচল করছে এসব লঞ্চে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এর মধ্যে অধিকাংশ যাত্রী মুন্সিগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকা যাতায়াত করে। একইভাবে নারায়ণগঞ্জ টার্মিনাল থেকে প্রতিটি লঞ্চ যাত্রী বোঝাই করে ফিরে আসে মুন্সিগঞ্জের উদ্দেশে।

যাত্রীদের অভিযোগ, এ রুটে চলাচল করা সব কয়টি ফিটনেসবিহীন লঞ্চ নানাভাবে জোড়াতালি আর মেরামত করেই চলছে বছরের পর বছর।

অন্যদিকে ধলেশ্বরী থেকে শীতলক্ষ্যা নদীর প্রবেশমুখসহ অধিকাংশ স্থানে দেখা গেছে, বিভিন্ন ফ্যাক্টরির কার্গো জাহাজ নোঙর করে রেখেছে। আর এসব জাহাজের কারণে প্রতি মুহূর্তেই লঞ্চগুলোকে নানা বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে।

বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, অবৈধভাবে মাঝ নদীতে নোঙর করা এসব কার্গো জাহাজের কারণে লঞ্চ চলাচলে বিগত বছরগুলোর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ঝুঁকি বেড়েছে।

এ নৌ-রুটে নিয়মিত যাতায়াত করা যাত্রীরা জানান, যেকোনো সময় আবারো বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

লঞ্চযাত্রী কামাল হোসেন জানান, প্রতিদিন ব্যবসার কাজে তাকে মুন্সিগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে যেতে হয়। সড়কে দীর্ঘ পথ ঘুরে যাওয়াসহ যোগাযোগ ব্যবস্থা সুবিধাজনক না হওয়ায় বাধ্য হয়েই লঞ্চে চড়তে হয়। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ এসব ফিটনেসবিহীন লঞ্চের কারণে প্রতিনিয়ত জীবন ঝুঁকির মধ্যে থাকে। তিনি আরো জানান, অধিকাংশ লঞ্চচালকই অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক, যার ফলে নদীপথে যাতায়াতের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

নিয়মিত যাতায়াতকারী বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা আনোয়ার মিয়া বলেন, ‘প্রতিদিন লঞ্চেই আসা-যাওয়া করি, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত গন্তব্যে না পৌঁছি, ততক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। প্রতিটি লঞ্চেই প্রতিনিয়ত নেয়া হচ্ছে অতিরিক্ত যাত্রী।’ অন্যদিকে কলেজছাত্র জীবন আহমেদ জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকলে শত শত শিক্ষার্থী এসব লঞ্চে নিয়মিত যাতায়াত করে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে ছোট ছোট জরাজীর্ণ লঞ্চে যেকোনো সময় আবারো বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই অবিলম্বে নৌপথটির যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন তিনি।

নৌ-পরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্রের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মুন্সিগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ নৌ-রুটে একাধিবার দুর্ঘটনার পর নৌপথ সচল রাখার জন্য ২০২১ সালেই ১১টি লঞ্চকে পুনরায় চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়েছিল। তবে যাত্রী কম থাকায় বর্তমানে আটটি লঞ্চ চলাচল করছে ঝুঁকি নিয়ে।

মুন্সিগঞ্জ লঞ্চ ঘাটের ইজারাদার দিল মোহাম্মদ কোম্পানি বলেন, ‘বড় লঞ্চগুলোর মধ্যে খাজা, বিপ্লবসহ আরো বেশ কয়েকটি লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এর অন্যতম কারণ কার্গো জাহাজ নোঙর করা। এতে নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট সংকুচিত হয়ে গেছে, যার ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে গেছে।’

অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল যাত্রী পরিবহন সংস্থার নারায়ণগঞ্জ জোনের সভাপতি মো. বদিউজ্জামান বাদল বলেন, ‘বর্তমানে নতুন লঞ্চ নামানোর আর্থিক সক্ষমতা নেই। তাই যাত্রীদের কথা চিন্তা করে আগের লঞ্চগুলো চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়।’

বিআইডব্লিউটিএর নদী বন্দরের উপপরিচালক মোহাম্মদ শাহ আলম মিয়া বলেন, ‘কার্গো জাহাজের এলোমেলো নোঙরের বিষয়ে অভিযোগ পেলেই কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। জাহাজ মালিকরা যাতে নিয়ম মেনে সিরিয়াল অনুযায়ী নোঙর করেন, সেজন্য দ্রুত কড়া নির্দেশ পাঠাবে কর্তৃপক্ষ।’

মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসক সৈয়দা নূরমহল আশরাফী বলেন, ‘জরাজীর্ণ এসব ফিটনেসবিহীন লঞ্চের অদক্ষ চালক ও মালিকদের বিরুদ্ধে আমরা বিভিন্ন সময় মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযোগ পেলেই আর্থিক জরিমানাসহ আইনি ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। তবে এ নৌপথের যাতায়াত ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন না আসায়, বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে যাত্রীদের ঝুঁকি বেড়েছে। তাই কঠোর আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলে নিরাপদ যাত্রীসেবা নিশ্চিত করার বিষয়ে অনুরোধ জানানো হবে।’

শেয়ার করুন!