ঘরে ফেরার গল্প পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো গল্পগুলোর একটি। যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরতে চাওয়া সৈনিক, হারিয়ে যাওয়া কিংবা ঘর পালানো মানুষও দীর্ঘদিন পর পরিবারের কাছে ফিরে আসতে চায়। এই গল্পই যুগে যুগে নানা রূপে বলা হয়েছে। প্রায় তিন হাজার বছর আগে গ্রিক কবি হোমার সেই গল্পই লিখেছিলেন—‘দ্য অডিসি’।
হোমারের মহাকাব্যটি আগেও চলচ্চিত্রে রূপ পেয়েছে। কিন্তু নোলানের ‘দ্য অডিসি’ অন্য কারণে আলাদা। তিনি শুধু মহাকাব্যটি পর্দায় তুলে আনেননি, নতুনভাবে ব্যাখ্যাও করেছেন। মূল কাহিনির গুরুত্বপূর্ণ অংশ অক্ষুণ্ন রেখেও ওডেসিয়াসের চরিত্রে যোগ করেছেন নতুন মাত্রা। হোমারের ওডেসিয়াস যেখানে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী, যুদ্ধজয়ী বীর; নোলানের ওডেসিয়াস সেখানে অনেক ক্লান্ত, অনুতপ্ত ও মানবিক। হোমারের মূল মহাকাব্যের পাশাপাশি বিভিন্ন অনুবাদ ও ঐতিহাসিক সূত্র থেকে গল্পটিকে নিজের মতো করে নির্মাণ করেছেন তিনি। বিশেষ করে এমিলি উইলসনের ইংরেজি অনুবাদের প্রভাব ছবিতে স্পষ্ট।
তাই যাঁরা মূল মহাকাব্যটি পড়েছেন, তাঁরা গল্পের কিছু পরিবর্তন সহজেই খেয়াল করবেন। আবার যাঁরা ‘দ্য অডিসি’ সম্পর্কে খুব বেশি জানেন না, তাঁদের কাছেও সিনেমাটি জটিল মনে হবে না। নোলান গল্পটিকে এমনভাবে সাজিয়েছেন, যাতে এটি একই সঙ্গে চেনা ও নতুন—দুই-ই মনে হয়। সে কারণেই ‘দ্য অডিসি’ শুরু হয় না কোনো বিশাল যুদ্ধ দিয়ে, শুরু হয় গল্প দিয়ে।
সিনেমার শুরুতেই একজন চারণ কবি ট্রোজান যুদ্ধের গল্প শোনাচ্ছেন। সামনে বসে থাকা মানুষদের কাছে সেটি হয়তো বহুবার শোনা কাহিনি, কিন্তু সেই গল্পের ভেতরেই ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয় আরেকটি গল্প। সেই গল্পের নায়ক ওডেসিয়াস (ম্যাট ডেমন)। ট্রোজান যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও আট বছর পেরিয়ে গেছে। অথচ ইথাকার রাজা ওডেসিয়াস এখনো নিজের রাজ্যে ফিরতে পারেননি।
এদিকে ইথাকায় ওডেসিয়াসের স্ত্রী পেনেলোপে প্রায় আঠারো বছর ধরে ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করে চলেছেন স্বামীর জন্য। ছেলে তেলেমাকাস (টম হল্যান্ড) বাবাকে ছাড়াই বড় হয়েছে। রাজপ্রাসাদ ভরে গেছে পেনেলোপের পাণিপ্রার্থীতে। তাঁরা সবাই পেনেলোপেকে বিয়ে করতে চান। কারণ, তাঁরা ধরে নিয়েছেন, ওডেসিয়াস আর বেঁচে নেই। কিন্তু পেনেলোপি এখনো আশা ছাড়েননি। পেনেলোপ বিশ্বাস করেন, তাঁর স্বামী ফিরে আসবেন।
অন্যদিকে বহুদূরের এক দ্বীপে স্মৃতি হারিয়ে বসে আছেন ওডেসিয়াস। তিনি কীভাবে সেখানে পৌঁছালেন, কেন এত বছর ধরে ঘরে ফিরতে পারলেন না—এসব প্রশ্নের উত্তর পুরো সিনেমায় ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। তিনি কি শেষ পর্যন্ত ইথাকায় ফিরতে পারবেন, নাকি ঘরে ফেরার আগেই সবকিছু হারিয়ে ফেলবেন? এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়েই এগিয়ে যায় ‘দ্য অডিসি’। একে একে সামনে আসে একের পর এক পৌরাণিক চরিত্র—একচোখা সাইক্লোপস, দৈত্য লায়েস্ট্রিগোনিয়ান, জাদুকরি সির্সি (সামান্থা মর্টন), ক্যালিপসো (শার্লিজ থেরন), মোহনীয় সাইরেনরা এবং ওডিসিউসের সহায়ক দেবী অ্যাথেনা (জেনডায়া)।
১৭ জুলাই বিশ্বজুড়ে মুক্তি পায় ‘দ্য অডিসি’। মুক্তির পরেই বক্স অফিসে ঝড়। এ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে আয় করেছে ৩৯০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা)। বাংলাদেশেও হুলস্থুল, দিনে ৫০টিরও বেশি শো। এক সপ্তাহেই আয় করেছে প্রায় দুই কোটি টাকা।
‘দ্য অডিসি’ দেখতে দেখতে মনে হলো, এই সিনেমা দেখার সময় গত দুই দশকে ক্রিস্টোফার নোলানের চলচ্চিত্রগুলো মনে রাখাও জরুরি। এটি শুধু যুদ্ধের পর ক্লান্ত, বিশ্বস্ত এক মানুষের ঘরে ফেরার গল্প নয়, যা নোলানের প্রায় সব ছবিতেই বারবার ফিরে এসেছে। কখনো সন্তানদের কাছে, কখনো সহযোদ্ধাদের কাছে, কখনো পরিবারের কাছে, আবার কখনো নিজের কাছেই ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। বরং নোলানের চলচ্চিত্রভাষার বহু পরিচিত দৃশ্য ও ভাবনাও এখানে নতুন রূপে ফিরে এসেছে।
সমুদ্রতীরে স্মৃতির সঙ্গে লড়াই করা বিভ্রান্ত মানুষ (‘ইনসেপশন’), ভাঙা স্মৃতি জোড়া লাগিয়ে অতীতকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা (‘মেমেন্টো’), আহত নায়কের অবরুদ্ধ শহরে ফিরে আসা (‘দ্য ডার্ক নাইট’ ত্রয়ী), অন্ধ চরিত্র, জয়ের প্রতি আসক্তি (‘দ্য প্রেস্টিজ’), জল ও স্থলে যুদ্ধ (‘ডানকার্ক’), প্রতারণার কৌশল (‘ইন্টারস্টেলার’), নিজের আবিষ্কারের পরিণতিতে তাড়িত এক বিজ্ঞানী (‘ওপেনহেইমার’), অপরাধবোধে নিদ্রাহীন এক সাবেক সেনা (‘ইনসমনিয়া’)—সবকিছুর প্রতিধ্বনি যেন ‘দ্য অডিসি’–তে এসে মিলেছে। দেখতে দেখতে মনে হয়, নোলান যেন তাঁর পুরো ক্যারিয়ারেই ধীরে ধীরে ‘দ্য অডিসি’ নির্মাণের প্রস্তুতি নিয়েছেন!








