কয়েকদিন ধরে ঢাকাসহ অন্তত ৫টা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটেছে। খবর পেয়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও পরে কোনো আইন ব্যবস্থা গ্রহণের ঘটেনি।
থানাপুলিশ জানিয়েছে, কর্তৃপক্ষ বা ভুক্তভোগীদের কাছ কাছ থেকে তারা কোনো অভিযোগ পায়নি। এছাড়া প্রাণহানি ও গুরুতর আঘাতের মতো ঘটনা না ঘটলে তাদের ভূমিকা ততটা সক্রিয় হয় না।
এদিকে, পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হলে বা আইন ভঙ্গের পরিস্থিতি তৈরি হলে অভিযোগের অপেক্ষা না করেই পুলিশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতেও প্রাপ্ত তথ্য ও আইনি দিক বিবেচনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পুলিশ চাইলেই সব সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছারও অভাব থাকে। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে এসে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সহিংসতা ও অস্থিরতা বাড়তেই থাকবে।
৩ আগস্ট সোমবার রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও চেয়ার ছোড়াছুড়ির ঘটনা ঘটে। এতে দুই পক্ষের অন্তত ৫ জন আহত হন।
এ ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. ফেরদৌস রহমান জানান, মারামারিতে জড়িতদের ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের তাজহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম জানান, স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পুলিশ সরাসরি কোনো হস্তক্ষেপ করে না। সংঘর্ষের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে থানায় কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দুই পক্ষকে নিয়ে সমঝোতা করে দিয়েছে।
৪ আগস্ট (মঙ্গলবার) দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
পরে অনুষ্ঠান শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে জকসুর সমাজসেবা সম্পাদক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের প্রচার সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমানের ওপর কয়েকজন ছাত্রদল নেতা হামলা করেন। সেখানে শিবিরের নেতাকর্মীরাও ছিলেন। একপর্যায়ে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে শিবিরের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হন।
পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে অভিযোগ না পাওয়ায় আর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি তারা।
ডিএমপির কোতোয়ালি থানার ওসি কে এম রবিউল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে বলেছে, আমরা করেছি। এ বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আমরা এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি।
এদিকে, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের বাইরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সে ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি সূত্রাপুর থানার অধীনে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ বলতে পারবে।
সূত্রাপুর থানার ওসি মতিউর রহমান জানান, যখন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, তখন তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা কোনো ভুক্তভোগী অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
একই দিন রাজধানীর নিউমার্কেটসংলগ্ন ঢাকা কলেজ ও বকশীবাজারের সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ার সামনেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে দুই পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। নিউমার্কেট এলাকায় দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। এ দুই ঘটনায়ও পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করলেও পরে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে চকবাজার থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং সেইসঙ্গ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
৫ আগস্ট (বুধবার) জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে মারামারি ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন।
এ বিষয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মামুন অর রশিদ জানান, দুটি ছাত্র সংগঠনের মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি নিয়ে ক্যাম্পাসে এখন আর কোনো উত্তেজনা নেই। ওই দিন ওই সময়েই বিষয়টি সমাধান করা হয়েছে। বর্তমানে ক্যাম্পাস শান্ত ও স্বাভাবিক রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক জানিয়েছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ করে স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সব সময় পুলিশ সরাসরি পদক্ষেপ নিতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা এবং তাদের সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হয়।
তিনি বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আইনগত ব্যবস্থার চেয়ে একাডেমিক শাস্তিমূলক পদক্ষেপকে বেশি গুরুত্ব দেয়, যেমন বহিষ্কার, সাময়িক বরখাস্ত বা শৃঙ্খলাভঙ্গের অন্যান্য ব্যবস্থা। তবে এসব পদক্ষেপ সব সময় কার্যকরভাবে প্রয়োগ হয় না।








