তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ভাসমান টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সারা দেশে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দেয়। প্রায় দুই সপ্তাহ জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ কম থাকার পর গত ৭ আগস্ট বাড়ায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছিল।
তবে চারদিনের মাথায় দেখা দিয়েছে নতুন সংকট। বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজিবাহী জাহাজ ভিড়তে না পারায় অন্য টার্মিনাল থেকে এবার গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। ফলে সারা দেশে নতুন করে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশে বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) রয়েছে। এগুলোর দৈনিক এলএনজি সরবরাহ সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত টার্মিনালে গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় দুই সপ্তাহ মেরামতের পর ৭ আগস্ট এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে পুনরায় এলএনজি সরবরাহ শুরু হয়। ফলে চারদিন ধরে দুটি টার্মিনাল থেকেই এলএনজি সরবরাহ হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংকট কিছুটা কমে আসে। তবে গত সোমবার সামিট গ্রুপ পরিচালিত অন্য এলএনজি টার্মিনাল থেকে সরবরাহ আবার কমে যায়। বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজিবাহী জাহাজ ভিড়তে না পারায় টার্মিনালটির দৈনিক সরবরাহ সক্ষমতা কমে প্রায় ২৫ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দুটি টার্মিনাল থেকে প্রায় ৫৩ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ হচ্ছে। এর মধ্যে এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে প্রায় ২৮ কোটি ও সামিটের টার্মিনাল থেকে ২৫ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যাচ্ছে। অর্থাৎ টার্মিনাল দুটির সম্মিলিত দৈনিক সরবরাহ সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুট হলেও বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে অর্ধেকেরও কম। ফলে এলএনজিনির্ভর গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে গ্যাস সংকট আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পেট্রোবাংলার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলএনজি টার্মিনালের একটি কারিগরি ত্রুটির কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারছে না। আরেকটি এফএসআরইউতে জাহাজ ভিড়তে পারছে না বৈরী আবহাওয়ার কারণে। এর মধ্যে আবার এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনালটিকে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে পুনরায় সাময়িকভাবে ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার জন্য শাটডাউন বা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে আরো বেশ কয়েকদিন সংকট থাকবে। তবে এলএনজি সরবরাহ যাতে দৈনিক সাড়ে ৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে না নামে সে চেষ্টা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) মো. শোয়েব বলেন, ‘এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা হচ্ছে। তবে বিদ্যমান যে সরবরাহ হচ্ছে সেটি যাতে না কমে সে চেষ্টা চলছে।’
এক্সিলারেটের টার্মিনালে দুটি বয়লার রয়েছে। প্রতিটির দৈনিক গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে একটি বয়লার গত ২১ জুলাইয়ের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি পুনরায় চালুর জন্য কাজ চলছে। চালুর উপযোগী হলে সেটির পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বর্তমানে সচল বয়লারটিও সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হবে। এ সময় এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকবে। সেটি থেকে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরতে কিছুটা সময় লাগবে। এ কারণে গ্যাসের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকে এমন ছুটির দিনে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ করতে চায় পেট্রোবাংলা।
এলএনজি টার্মিনালের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ (এফইআরবি) আয়োজিত গতকালের এক সেমিনারে কথা বলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি বলেন, ‘একটি এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার কারণে সারা দেশে হাহাকার লেগে গেছে। একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আরেকটি বয়লার চালু করার জন্য ৭২ ঘণ্টা সময় প্রয়োজন। এ সময়টা কখন ঠিক করব, সেটা নিয়ে আমরা চিন্তায় আছি।’
দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। দুটি এলএনজি টার্মিনাল স্বাভাবিকভাবে চালু থাকলে স্থানীয় গ্যাসের সঙ্গে মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। কিন্তু টার্মিনাল দুটির সংকটের কারণে বর্তমানে গ্রিডে সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২১৫ কোটি ঘনফুটে। ফলে চাহিদার তুলনায় প্রতিদিন প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে আবাসিক পর্যায়েও। বিশেষ করে কয়েকদিন ধরে গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সারা দেশে লোডশেডিং তীব্র আকার ধারণ করেছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি) সূত্রে জানা গেছে, কয়েকদিন ধরে দেশে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। গত সোমবার রাত ৮টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। এর আগের দিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। গতকাল সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াটের মতো। অর্থাৎ ওই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকেরও বেশি ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। দিনের অধিকাংশ সময়ই এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে বিদ্যুৎ খাতকে। গ্যাস সংকটই এর প্রধান কারণ।
সৌজন্য: বণিক বার্তা








