একাধিক শিক্ষা বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী ২০২৫ সালে অকৃতকার্য হওয়ার পর ২০২৬ সালে পুনরায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি। এর মধ্যে যশোর, সিলেট ও রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে ২০২৫ সালে এসএসসিতে ফেল করা প্রায় ২৬ শতাংশই ঝরে পড়েছে।
চলতি বছরের ফলাফলে পাসের হার ছিল ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ১০ আগস্ট প্রকাশিত মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী এ বছর ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি। বোর্ডগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এসএসসির রেজিস্ট্রেশন কার্ডের মেয়াদ সাধারণ তিন বছর বা তিনটি ধারাবাহিক পরীক্ষা পর্যন্ত বলবৎ থাকে। কোনো শিক্ষার্থী একবার অনুত্তীর্ণ হলে পরেরবার শুধু অনুত্তীর্ণ বিষয়ে পরীক্ষার আবেদন করেই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারে। প্রথমবার অকৃতকার্য অধিকাংশ শিক্ষার্থীই পরের বছরই অকৃতকার্য বিষয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে উত্তীর্ণ হওয়ার চেষ্টা করে। এক বা দুই বছর পর অংশগ্রহণের হার খুবই কম।
যশোর, সিলেট ও রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ তিন বোর্ডের অধীনে ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় মোট ১ লাখ ৮ হাজার ৯৮৭ শিক্ষার্থী অনুত্তীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের পরীক্ষায় মোট অনিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে অংশ নিয়েছে ৮০ হাজার ৮০৩ জন। অর্থাৎ তিন বোর্ডে সম্মিলিতভাবে গত বছর ২৮ হাজার ১৮৪ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার পর এ বছর পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। সামগ্রিকভাবে এ তিন বোর্ডে অকৃতকার্যদের পুনরায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করার গড় হার ২৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
দেশের অন্যতম পুরনো শিক্ষা বোর্ড যশোর শিক্ষা বোর্ড। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা বিভাগের জেলাগুলোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে এ বোর্ড। যশোর শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যশোর শিক্ষা বোর্ডে ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়েছিল মোট ৩৬ হাজার ৫৩২ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ২০২৬ সালের পরীক্ষায় অনিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করেছে ২৫ হাজার ৬৭৮ জন। অর্থাৎ গতবারের অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১০ হাজার ৮৫৪ জন আর পুনরায় পরীক্ষায় বসেনি। বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শতকরা হিসাবে গত বছর যশোর বোর্ডের অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে অন্তত ২৯ দশমিক ৭১ শতাংশই পুনরায় এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি।
স্থানীয় শিক্ষা প্রশাসনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমান্ত এলাকার দারিদ্র্য, অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব এবং শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহের কারণেই শিক্ষার্থীদের একটি অংশ অকৃতকার্য হওয়ার পর আর পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে না। যশোর শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর ড. মো. আব্দুল মতিন বলেন, ‘ফেল করা শিক্ষার্থীরা যাতে ঝরে না পড়ে এবং আরো ভালোভাবে ফিরে আসে, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা বারবার বলেছি। তবে প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বলা হয়, ঝরে পড়া বা ফেল করা অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে কোনোভাবেই ক্লাসমুখী বা প্রতিষ্ঠানমুখী করা যায় না।’
তিনি আরো বলেন, ‘কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আমার উপস্থিতিতেই বিভিন্ন ধরনের প্রোগ্রাম করেছে। পরীক্ষার কিছুদিন আগে একটি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেড় শতাধিক ফেল করা শিক্ষার্থীকে ডাকা হয়। কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র ১৫ জন উপস্থিত ছিল। সেখানে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের কাছে তাদের ফেল করার কারণ ও সমস্যার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। তাদের বক্তব্যে এর আগে সিলেবাস-সংক্রান্ত জটিলতা এবং বাড়িতে পড়ার প্রতি অনাগ্রহের বিষয়টি উঠে এসেছে। বিগত দিনে এমন একটি মানসিকতা তৈরি করা হয়েছিল যে বাড়িতে পড়তে হবে না, স্কুলেই সব পড়া হয়ে যাবে। এ মানসিকতার একটা বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীরা পারিপার্শ্বিক অবস্থার কথাও জানিয়েছে। এর মধ্যে পরিবারের অসচ্ছলতা ও পরিবার থেকে যথাযথ সাপোর্ট না পাওয়ার বিষয় রয়েছে। তবে এর পরও আমরা চেষ্টা করছি, ফেল করা শিক্ষার্থীরা যাতে ভালোভাবে ফিরে আসে।’
খুলনা অঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা পরিচালক প্রফেসর ড. মো. আনিস-আর-রেজা বলেন, ‘আমরা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের দেয়া রুটিনকাজের অংশ হিসেবে নিয়মিতই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করি। তখন শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে যতটুকু দেখেছি, এ অঞ্চলে তুলনামূলক দরিদ্রপ্রবণ এলাকাগুলোয়, বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় দারিদ্র্য-বাল্যবিবাহের কারণে অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। এছাড়া অভিভাবকদের অসচেতনতাও অনেক ক্ষেত্রেই একটি বড় কারণ। তবে এ অঞ্চলে শিক্ষার মান যাতে ভালো হয়, প্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষার মানসম্মত প্রচেষ্টা নিশ্চিত হয় সে বিষয়ে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।’
২০১৬ সালে যেসব শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬০ শতাংশের কম ছিল, তাদের একটি সিলেট শিক্ষা বোর্ড। এ শিক্ষা বোর্ডে এ বছর পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৩৩ ও অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৭ হাজার ১২২। ২০২৫ সালে এ শিক্ষা বোর্ডে মোট অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩২ হাজার ১২৮। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় এ বোর্ডে অনিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে অংশ নিয়েছে ২৩ হাজার ৭১৮ জন। অর্থাৎ গত বছর ফেল করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৮ হাজার ৪১০ শিক্ষার্থী আর পুনরায় এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়নি, যা ২০২৫ সালে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর অন্তত ২৬ দশমিক ১৭ শতাংশ।
সিলেট অঞ্চলের শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে বিদেশগমনের প্রবণতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়ার একটি বড় কারণ। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, সিলেটের চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. শহীদুল আলম বলেন, ‘হাওর ও চা বাগান এলাকার দারিদ্র্য, অভিভাবকদের অসচেতনতা এবং এ অঞ্চলের অধিবাসীদের একটি বড় অংশের বিদেশগমনের প্রবণতা এ অঞ্চলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার জন্য অনেকাংশে দায়ী। দেখা যায়, অনেক সময়ই অভিভাবকরা চিন্তা করেন অনুত্তীর্ণ হওয়ার পর সন্তানকে পুনরায় পরীক্ষা দেয়ানোর তুলনায় বিদেশে পাঠানোটা তার ভবিষ্যতের জন্য অধিক লাভজনক। আবার দরিদ্র পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা সন্তানকে আবার পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করিয়ে কাজে যুক্ত করে দেয়ার প্রতি অধিক আগ্রহী।’
এসব কারণের পাশাপাশি শিক্ষক সংকট ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সংকটও অন্যতম কারণ বলে মনে করেন সিলেট অঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা উপপরিচালক আবু সাঈদ মো. আব্দুল ওয়াদুদ। তিনি বলেন, ‘যেসব শিক্ষার্থী অনুত্তীর্ণ হচ্ছে তারা ভালোভাবে ফিরে আসুক সেটি আমরা প্রত্যাশা করি। এর জন্য অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে উৎসাহ তৈরি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে বেশির ভাগ সময় দেখা যায়, অভিভাবকরা সন্তানকে ন্যূনতম মাধ্যমিক শেষ করার আগেই বিদেশে পাঠানোয় উৎসাহী হয়ে ওঠেন, আর সন্তান যদি পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয় তখন এ প্রবণতা আরো বাড়ে। আবার শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ফলাফল খারাপ করলে উৎসাহের ঘাটতি তৈরি হয়। পর্যাপ্ত শিক্ষক-কর্মকর্তা থাকলে তখন অভিভাবক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন সচেতনতামূলক-উৎসাহমূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা যেত। কিন্তু আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষকের বড় ধরনের সংকট রয়েছে। শিক্ষা অফিসগুলোতেও পর্যাপ্ত কর্মকর্তা নেই। এসব কারণে চাইলেও আমরা অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য খুব বৃহৎ পরিসরে উদ্যোগ নিতে পারছি না। তবে সীমিত সামর্থ্যেও আমরা চেষ্টা করছি।’
তিন শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ২০২৬ সালে অনিয়মিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি ছিল রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে। বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার ৩২৭। এর মধ্যে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অনিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে অংশ নিয়েছে ৩১ হাজার ৪০৭ জন। অর্থাৎ বিগত বছরের ফেল করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৮ হাজার ৯২০ শিক্ষার্থী আর পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। রাজশাহী বোর্ডে ২০২৫ সালে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় পুনরায় অংশ না নেয়ার হার অন্তত ২২ দশমিক ১১ শতাংশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘অকৃতকার্য হওয়ার পর পুনরায় পরীক্ষায় অংশ না নেয়ার অর্থ হলো তাদের বড় অংশই মূলধারার শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়েছে, আর আমাদের সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় দশম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কোনো কারিগরি শিক্ষাও দেয়া হয় না, যা তাদের দক্ষ করে তুলতে পারে। সুতরাং এ শিক্ষার্থীদের মূলধারা থেকে ছিটকে যাওয়ার অর্থ হলো রাষ্ট্রের জনসম্পদের একটি বড় অপচয়। আমি মনে করি, ১০ বছর পড়াশোনার পর অকৃতকার্য হলেও শিক্ষার্থীর অর্জিত ভিত্তি নষ্ট হয় না, মূলত আমাদের সনাতন ও নেতিবাচক মূল্যায়ন পদ্ধতির ত্রুটির কারণেই সে ব্যর্থ সাব্যস্ত হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের মূলধারা থেকে ঝরে পড়া রোধে এক বা দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদের এক বছর বসিয়ে না রেখে তিন মাসের ক্র্যাশ প্রোগ্রামের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি কেবল তাত্ত্বিক পড়ালেখার বদলে দশম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষায় প্রায়োগিক ও কারিগরি দক্ষতা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। পাশাপাশি ফেল করা শিক্ষার্থীদের গভীর মানসিক চাপ ও আত্মহত্যার ঝুঁকি থেকে বাঁচাতে স্কুলগুলোয় সচেতনতামূলক সভা, সাইকোলজিক্যাল প্রোগ্রাম ও অভিভাবকদের নিয়ে বিশেষ সেশন আয়োজন করা জরুরি। এসএসসি জীবনের শেষ কথা নয়; জরুরি হলো জাতীয় পর্যায় থেকে ইতিবাচক বার্তা প্রদান, সান্ত্বনা এবং উপযুক্ত সুযোগের মাধ্যমে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জীবনে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস দেয়া।’
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রাষ্ট্রীয় অপচয়। এর পেছনে পরিবার, সরকার ও করদাতাদের অর্থ বিনিয়োগ হয়। তাই বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার এবং এ নিয়ে নিবিড় গবেষণা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা কেন অকৃতকার্য হচ্ছে, কেন ঝরে পড়ছে তার কারণ জানতে হবে। কোথায় গলদ ছিল, তা বের করতে হবে। এবারো ৩১২টি স্কুলে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি। এমনটি কেন হলো সেটি জানা অত্যন্ত জরুরি। আর সরকারকেও সুনির্দিষ্ট এলাকা ধরে কাজ করতে হবে। যেমন মাথাপিছু আয়ে সিলেট এগিয়ে অথচ সামাজিক উন্নয়নে পিছিয়ে। সাক্ষরতার হার, মাতৃমৃত্যুর হার ও শিশুমৃত্যুর হার—সব ক্ষেত্রেই সিলেট পিছিয়ে আছে। কেন এ অঞ্চল পিছিয়ে, কী করলে পরিস্থিতির উন্নয়ন হবে সেটি চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে।’








