বেড়েছে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব ও আমানত

15 August, 2026

প্রকাশের সময়: 07:28 pm, 15th Aug, 2026

সর্বশেষ আপডেট: 07:28 pm, 15th Aug, 2026

স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা আশাব্যঞ্জক হারে বেড়েছে বলে এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে।

তাদের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা বর্তমানে ৫৪ লাখ ৪৪ হাজার ১শ ৪৭টি। শিক্ষার্থীদের ব্যাংকে সঞ্চয়ের পরিমাণ এখন দাঁড়িয়েছে, ২ হাজার ১শ ৯১ কোটি ৮ লাখ টাকায়।

এর মধ্যে শহরের শিক্ষার্থীদের রয়েছে ১ হাজার ৫শ ১ কোটি ৭১ লাখ টাকা এবং গ্রামের শিক্ষার্থীদের সঞ্চয় ৬শ ৮৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

এদিকে, চলতি বছরের মে মাসে শিক্ষার্থীদের হিসাব সংখ্যা ছিল ৫৩ লাখ ২৬ হাজার। অন্যদিকে, জমা করা আমানতের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৮ কোটি টাকা।

এক মাসের ব্যবধানে স্কুল ব্যাংকিংয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার হিসাব বেড়েছে এবং আমানত ১শ ৬৩ কোটি টাকা বেড়েছে।

চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ করা এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

স্কুল ব্যাংকিং

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা গ্রামে বেশি থাকলেও জমানো আমানতের সিংহভাগ শহরের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এসেছে; যা মোট আমানতের প্রায় ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে, গ্রামের আমানতের হার ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ।

এ বিষয়ে ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিক্ষার্থী ও কিশোর-কিশোরীদের সঞ্চয়ী মনোভাব গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত বিশেষ আর্থিক সেবাই হলো- স্কুল ব্যাংকিং।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১০ সালের ২ নভেম্বর এক সার্কুলারের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রমের যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের ২৮ অক্টোবর স্কুল ব্যাংকিং নীতিমালা হালনাগাদ ও বিস্তৃত করে নতুন নির্দেশিকা জারি করা হয়। এরপর থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্কুল ব্যাংকিং সেবা পুরোদমে চালু হয়।

স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রমের প্রধান লক্ষ্য হলো- আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই সঞ্চয়ের মানসিকতা গড়ে তোলা। এই লক্ষ্যগুলো অর্জিত হচ্ছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. আরিফুর রহমান খান।

মো. আরিফুর রহমান খান জানান, ঈদুল ফিতর বা বিভিন্ন উৎসবে শিক্ষার্থীরা স্বজনদের কাছ থেকে উপহার ও সেলামি হিসেবে যে ক্যাশ টাকা পায়, তা যাতে অপচয় বা অসৎ কাজে ব্যবহৃত না হয়, সেটি নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।

উপযুক্ত দিকনির্দেশনা না থাকলে উৎসবকেন্দ্রিক এই টাকা দিয়ে অনেক সময় শিক্ষার্থীরা অপ্রয়োজনীয় ভিডিও গেমস খেলা বা ক্ষেত্রবিশেষে মাদকের মতো ক্ষতিকর অভ্যাসে জড়িয়ে পড়তে পারে। ব্যাংকে টাকা জমা রাখার সুযোগ থাকায় তারা অপচয় ও অসৎ পথ থেকে দূরে থাকার শিক্ষা পায়।

স্কুল ব্যাংকিংয়ের এই সঞ্চয় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত চাহিদা মেটাতে বড় ভূমিকা রাখে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেমন কোনো শিক্ষার্থী যদি একটি কম্পিউটার কিনতে চায় এবং সেসময়ে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য কম থাকে, তবে তার নিজ অ্যাকাউন্টে জমানো ৫০ হাজার বা ১ লাখ টাকা দিয়েই সে সেই প্রয়োজন মেটাতে পারে।

সর্বোপরি, এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে অবদান রাখার সুযোগ তৈরি করছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এই দৃষ্টিকোণ থেকে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রমটি অনেকটাই সফল।

যারা ব্যাংক হিসাব খোলার যোগ্য

৬ বছর থেকে ১৮ বছর বয়েসি যেকোনো নিবন্ধিত শিক্ষার্থী এই হিসাব খুলতে পারেন। সাধারণ সঞ্চয়ী হিসাবের চেয়ে স্কুল ব্যাংকিং হিসাবে বেশি হারে সুদ দেওয়া হয়, যা ক্ষেত্রবিশেষে বার্ষিক ৫ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে (ব্যাংকভেদে ও নির্দেশনানুযায়ী পরিবর্তনশীল)।

শিশুদের আমানতে কোনো চার্জ বা ফি কাটা হয় না এবং সর্বনিম্ন স্থিতির বাধ্যবাধকতা নেই; সাধারণত ১শ টাকা জমা দিয়েই হিসাব খোলা যায়।

এছাড়া শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে এটিএম/ডেবিট কার্ড সুবিধা পায়। শিক্ষার্থী ১৮ বছরের কম হওয়ায় হিসাবটি যৌথভাবে তার মা-বাবা বা আইনি অভিভাবকের সহায়তায় ও তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।

শিক্ষার্থীর বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হলে স্কুল ব্যাংকিং হিসাবটি বাতিল হয় না, বরং সরাসরি শিক্ষার্থীর নামে একটি নিয়মিত সাধারণ সঞ্চয়ী হিসাবে (প্রাপ্তবয়স্ক গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে) রূপান্তরিত হয়।

এরপর থেকে শিক্ষার্থী নিজেই এককভাবে হিসাবটি পরিচালনা করতে পারে। অভিভাবকের পরিচালনা ক্ষমতা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ ব্যাংকিংয়ের পূর্ব অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের ব্যাংকিং সেবায় প্রবেশ করছে। স্কুল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পল্লী অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও ব্যাংকিং সুবিধা পাচ্ছে, যেখানে বর্তমানে হিসাবের সংখ্যা প্রায় ২৯ লাখ।

এছাড়া এই কার্যক্রমের মাধ্যমে গ্রামীণ মেয়েশিশুরা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় এসেছে, যা তাদের পরবর্তীতে সংসার জীবনে সঞ্চয় ও আয়বর্ধক কার্যক্রম শুরু করে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করছে।

তবে স্কুল ব্যাংকিংয়ে অ্যাকাউন্ট খোলা ও টাকা জমা বৃদ্ধি পেলেও মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের কিছু জায়গা এখনো অর্জিত হয়নি বলে মনে করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী।

তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, স্কুল ব্যাংকিংয়ের আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে আর্থিক সচেতনতা ও ব্যাংকিংয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা; কেবল অ্যাকাউন্ট খোলা বা আমানত সংগ্রহ করা নয়। বর্তমানে এটি মূলত কেবল টিউশন ফি সংগ্রহ ও আমানত বাড়ানোর মাধ্যমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে, যার ফলে মূল লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে না।

তিনি বলেন, আমাদের ক্যাশ-ভিত্তিক পেমেন্ট সিস্টেমকে স্মার্ট করতে হলে স্কুল পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের চেক ও অ্যাপ-ভিত্তিক নিরাপদ লেনদেন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি, যাকে মূলত ‘ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি’ বা আর্থিক সাক্ষরতা বলা হয়।

একটি আধুনিক ও ক্যাশলেস সোসাইটি গঠনের জন্য কেবল ব্যাংকগুলোর বাণিজ্যিক প্রচারণাই যথেষ্ট নয়; বরং দেশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তকের মধ্যেই এই আর্থিক শিক্ষার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা দরকার রয়েছে।

শেয়ার করুন!