তীব্র গ্যাস সংকট ও মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে নরসিংদীর শিল্প খাত। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে জেলার অধিকাংশ শিল্প-কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। কোনো কোনো কারখানার ইউনিট পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় নিয়মিত কারখানায় এসেও অলস সময় কাটাতে হচ্ছে বহু শ্রমিককে। শিল্প মালিকদের দাবি, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় প্রতিদিন বিপুল অংকের লোকসান হচ্ছে এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সংকটের প্রভাব পড়েছে দেশের বৃহত্তম ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানায়ও। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় সক্ষমতা অনুযায়ী ইউরিয়া উৎপাদন করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি।
অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, নরসিংদীতে ১ লাখ ৯১ হাজারের বেশি অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে, যেখানে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ মানুষ কর্মরত। স্থানীয় শিল্প মালিক ও ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি, জ্বালানি সংকটের কারণে জেলার শিল্পাঞ্চলে প্রতিদিন গড়ে ৩০০-৪০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। শত শত ডায়িং, প্রিন্টিং, টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলের উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়েছে। অতীতে লোডশেডিং কিংবা গ্যাসের চাপ কম থাকলেও কোনোভাবে কারখানাগুলোর উৎপাদন চালু রাখা যেত। তবে এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। গ্যাস ও বিদ্যুৎ দুটির সংকট একসঙ্গে তীব্র হওয়ায় অনেক কারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানা পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ গ্যাস প্রয়োজন হয়। তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে কারখানাটি বন্ধ হয়ে গেলেও সম্প্রতি আবার চালু হয়েছে। এতে সার কারখানায় বিপুল পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করতে গিয়ে নরসিংদীর অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাসের চাপ শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে এরই মধ্যে বিপুল পরিমাণ ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে। এতে আগে থেকেই চাপে থাকা কারখানা ও উদ্যোক্তারা আরো বিপাকে পড়েছেন। সংকট দীর্ঘ হলে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং উদ্যোক্তাদের পথে বসার আশঙ্কা রয়েছে।
সুতা, কাপড়, ফ্যাব্রিকস ও তৈরি পোশাক উৎপাদনে নরসিংদীর অন্যতম বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান থার্মেক্স গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় নয় হাজার কর্মী রয়েছেন। গ্যাস সংকটে গ্রুপটির সামগ্রিক উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। কারখানাগুলো পুরোদমে চালাতে ৫০ পিএসআই চাপের গ্যাস প্রয়োজন। তবে অন্তত ৩০ পিএসআই চাপ থাকলেও উৎপাদন সচল রাখা সম্ভব। অথচ মঙ্গলবার গ্যাসের চাপ ছিল শূন্য। কয়েক দিন ধরে চলা সংকটে গ্রুপটির ভারী যন্ত্রপাতি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যানুযায়ী, সুতা উৎপাদন সক্ষমতার ১০ শতাংশ, ফ্যাব্রিকস ৩০, গার্মেন্টস ৫০ ও স্পিনিং ইউনিটের উৎপাদন ২০ শতাংশে নেমে এসেছে।
গতকাল সরজমিনে দেখা যায়, কারখানাটির বেশির ভাগ ইউনিট গ্যাস সংকটের কারণে বন্ধ ও ফাঁকা পড়ে আছে। কয়েকটি ইউনিট আংশিক চালু থাকায় সেখানে কর্মীদের কাজ করতে দেখা যায়। শ্রমিকরা জানান, গ্যাসের অভাবে প্রতি শিফটে ৪ ঘণ্টার বেশি উৎপাদন বন্ধ থাকছে। স্পিনিং বিভাগের একটি অংশের শ্রমিকরা প্রায় তিন মাস এবং গার্মেন্টস বিভাগের একটি অংশের শ্রমিকরা প্রায় দুই মাস ধরে কাজ না থাকায় অলস সময় কাটাচ্ছেন।
নরসিংদীর পাকিজা কটন স্পিনিং মিলস লিমিটেডও গ্যাস সংকটের কারণে স্বাভাবিক উৎপাদন চালাতে পারছে না। এ বিষয়ে কারখানাটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা কথা বলতে রাজি হননি। তবে সেখানে কর্মরত এক শ্রমিক জানান, গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় দিনের বড় একটি অংশ উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
নরসিংদীর আরো কয়েকটি স্পিনিং কারখানায় সরজমিন ঘুরে শ্রমিকদের অলস বসে থাকতে দেখা যায়। শ্রমিকরা জানান, নিয়মিত কারখানায় এলেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন চালু না থাকায় তাদের কাজ করার সুযোগ হচ্ছে না। অধিকাংশ কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। আবার কয়েকটি কারখানা সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালু রাখলেও প্রতিদিন দীর্ঘ সময় যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
একটি কারখানার সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মো. জামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমি এ কারখানায় ১১ বছর ধরে কাজ করছি। সব মিলিয়ে এ খাতে আমার ৪৯ বছরের অভিজ্ঞতা। গ্যাস ও বিদ্যুতের এমন সম্মিলিত বিপর্যয় আগে কখনো দেখিনি। আগে গ্যাসের চাপ না থাকলে বিদ্যুৎ পাওয়া যেত, আবার বিদ্যুৎ না থাকলে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকত। এবার দুটিরই সংকট চলছে। সচল কারখানাটি এখন রুগ্ণ হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন পৌনে ৩ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। এভাবে লোকসান গুনে এবং কর্মীদের বসিয়ে রেখে কারখানাটি আর কতদিন টিকিয়ে রাখা যাবে জানি না।’
নরসিংদী দেশের অন্যতম একটি শিল্পাঞ্চল। এখানকার তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্পিনিং, নিটিং ও ডায়িং মিলের ওপর দেশের অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভরশীল। কিন্তু এক মাস ধরে গ্যাসের যে তীব্র সংকট চলছে, তাতে শিল্প-কারখানাগুলোর চাকা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রাশেদুল হাসান রিন্টু। তিনি বলেন, ‘প্রেসার না থাকায় আমরা উৎপাদন চালু রাখতে পারছি না। জ্বালানি সংকটের এ আগুনে এখন ঘি ঢালছে বিদ্যুতের মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিং। দিনে-রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় কলকারখানা সচল রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালাতে গিয়ে জ্বালানি তেলের পেছনে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় বহুলাংশে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে অনেক কারখানা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে শ্রমিকের কর্মসংস্থানে। আমরা যদি সময়মতো ক্রেতাদের কাপড়ের ডেলিভারি দিতে না পারি, তবে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজার দুটিই আমরা হারাব।’
এদিকে দেশের বৃহত্তম ইউরিয়া উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসিও গ্যাস সংকটের মুখে পড়েছে। নরসিংদীতে অবস্থিত কারখানাটির দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৮০০ টন। এ পরিমাণ ইউরিয়া উৎপাদনে প্রতিদিন ৭২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। তবে মঙ্গলবার কারখানাটিতে গ্যাস সরবরাহ কমতে শুরু করে। ওইদিন সরবরাহ করা হয় ৬৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। ফলে সক্ষমতার তুলনায় প্রায় ১৫০ টন কম ইউরিয়া উৎপাদন হয়েছে। বুধবার গ্যাস সরবরাহ আরো কমেছে। কারখানাটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গ্যাস সরবরাহ কমানোর বিষয়টি সরকারের পক্ষ থেকে আগেই জানানো হয়েছে। তবে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।
শিগগিরই গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান হবে বলে জানিয়েছেন জেলা বিএনপি সভাপতি ও নরসিংদী-৩ আসনের সংসদ সদস্য মনজুর এলাহী। তিনি বলেন, ‘গ্যাসের এ সংকট শুধু নরসিংদীর নয়, এটি জাতীয় সমস্যা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের লুটপাটের কারণে সংকট আরো তীব্র হয়েছে। আমরা সমস্যা সমাধানে কাজ করছি। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে, তিন-চার দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’
সৌজন্য: বণিক বার্তা








