দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পাবলিক পরীক্ষার ফল দীর্ঘদিন ধরে সাফল্যের অন্যতম প্রধান সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। বছরের পর বছর ফল প্রকাশের দিন বাড়ে পাসের হার, প্রকাশ পায় লাখো জিপিএ-৫ আর শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ তালিকা— এভাবেই শিক্ষার অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় একসময় এসএসসি ও এইচএসসিতে পাসের হার ৯০ শতাংশের ঘর ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক দুই বছরে সেই চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। পাসের হার নেমে এসেছে ৬০ শতাংশের ঘরে, একইভাবে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। ফলে এখন শিক্ষাঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে— আগের বছরগুলোতে পাসের হার এত বেশি ছিল কেন, আর এত ‘ভালো ফল’-ই বা কীভাবে সম্ভব হয়েছিল?
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী। এর আগের বছর ২০২৫ সালে পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬টি।
পরিবর্তনের মাত্রা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০২৪ সালের ফলাফলের সঙ্গে তুলনা করলে। ওই বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯ জন। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ২০ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৬৫ হাজার ৪৫৩ জন।
দুই প্রধান পাবলিক পরীক্ষার দীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এই পরিবর্তনের তীব্রতা আরও স্পষ্ট হয়। ২০০১ সালে এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল মাত্র ৩৫ দশমিক ২২ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি ১০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬৫ জনই অকৃতকার্য হয়েছিল। এরপর পাসের হার ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে; ২০০৯ সালে তা ৬৭ দশমিক ৪১ শতাংশ, ২০১১ সালে ৮২ দশমিক ৩১ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে রেকর্ড ৯২ দশমিক ৬৭ শতাংশে পৌঁছায়।
এরপরও বেশ কয়েক বছর উচ্চ পাসের হার অব্যাহত ছিল। করোনাকালের বিশেষ পরিস্থিতিতে ২০২১ সালে এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ৯৩ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ৮৩.০৪ শতাংশ পাসের হার ২০২৫ সালে নেমে আসে ৬৮.৪৫ শতাংশে, এবং ২০২৬ সালে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৬২.২৫ শতাংশে— যা ২০০৭ সালের পর সর্বনিম্ন। অর্থাৎ যে পরীক্ষায় একসময় ১০০ জনের মধ্যে ৯০ জনেরও বেশি পাস করত, সেখানে এখন পাস করছে প্রায় ৬২ জন। শিক্ষার্থীদের সক্ষমতায় হঠাৎ এত বড় পতন ঘটেছে, নাকি মূল্যায়নের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে— তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
জিপিএ-৫-এর ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন দৃশ্যমান। চালুর শুরুর দিকে জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংখ্যা হাতে গোনা হলেও ২০২২ সালে তা রেকর্ড ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ জনে পৌঁছায়। কিন্তু ২০২৪ সালে তা কমে ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯, ২০২৫ সালে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ এবং ২০২৬ সালে মাত্র ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জনে নেমে এসেছে।
দীর্ঘদিন ধরে পাবলিক পরীক্ষার পাসের হার এবং জিপিএ-৫-এর ঊর্ধ্বগতিকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রগতির প্রধান সূচক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য, শিক্ষা প্রশাসনের কার্যকারিতা এবং সরকারের অর্জনের বড় মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল এই ফলাফল। ফলে পাসের হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার মানও বাড়ছে— এমন একটি ধারণা জনপরিসরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
তবে, ২০২৫ সালের এসএসসি ফল প্রকাশের পর সেই ধারণায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। ২০২৪ সালে এসএসসিতে পাসের হার ছিল ৮৩.০৪ শতাংশ, যা পরের বছর এক ধাক্কায় ১৪.৫৯ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৬৮.৪৫ শতাংশে। একই সময়ে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯ থেকে কমে হয় ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২; অর্থাৎ এক বছরেই কমে যায় ৪৩ হাজারের বেশি জিপিএ-৫।
২০২৬ সালের ফলাফলে এই পতনের ধারা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে; পাসের হার আরও কমে দাঁড়ায় ৬২.২৫ শতাংশে এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্তের সংখ্যা কমে যায় আরও ২২ হাজারের বেশি। সংশ্লিষ্টদের মতে, ফলাফলের এই বড় পরিবর্তনের পেছনে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের একটি বড় প্রভাব রয়েছে। কারণ, ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষাটি ছিল ওই পটপরিবর্তনের পর প্রথম বড় পাবলিক পরীক্ষা।
শুধু এসএসসি নয়, সাম্প্রতিক সময়ে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলেও একই ধরনের বড় পতন দেখা গেছে। ২০২৪ সালে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৭৭.৭৮ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে ১৮.৯৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে দাঁড়ায় ৫৮.৮৩ শতাংশে।
একই সঙ্গে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও বড় ধস নামে। ২০২৪ সালে যেখানে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯১১ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল, ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা প্রায় অর্ধেক কমে দাঁড়ায় মাত্র ৬৯ হাজার ৯৭ জনে; অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ কমেছে ৭৬ হাজার ৮১৪টি।
এমন অবস্থায় শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমে যাওয়ার পেছনে উত্তরপত্র মূল্যায়ন পদ্ধতিতে কড়াকড়ি আরোপ বড় ভূমিকা রেখেছে। দীর্ঘদিন ধরে পাবলিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে শিক্ষার্থীদের প্রতি একধরনের ‘সহানুভূতি’ দেখানোর অলিখিত চর্চা চলে আসছিল। কোনো শিক্ষার্থী পাস নম্বরের কাছাকাছি থাকলে তাকে পাস করিয়ে দেওয়া, গ্রেড উন্নীত করতে কৃত্রিমভাবে নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া কিংবা উত্তরপত্রে অসংলগ্ন কিছু লিখলেও নম্বর দেওয়ার প্রবণতা ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকেরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক এক প্রধান পরীক্ষক জানান, আগে খাতা মূল্যায়নে সহানুভূতিশীল হওয়ার জন্য শিক্ষা বোর্ড থেকেই পরীক্ষকদের মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হতো। বিশেষ করে অল্প নম্বরের ঘাটতিতে থাকা শিক্ষার্থীদের ফেল না করানো এবং গ্রেড পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখানোর একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘বোর্ড থেকে সরাসরি লিখিত আদেশ না থাকলেও খাতা সংগ্রহের বৈঠক কিংবা বিতরণের সময় পরীক্ষকদের বলা হতো যেন অল্প নম্বরের জন্য কেউ ফেল না করে। বিশেষ করে ২৮, ২৯, ৩০ বা ৩১ নম্বরের মতো পাস নম্বরের কাছাকাছি থাকা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখানোর বার্তা দেওয়া হতো। ফলে পরীক্ষকেরাও প্রাপ্য নম্বরের চেয়ে কিছুটা বাড়িয়ে দিতেন।’
সাবেক প্রধান পরীক্ষক আরও জানান, কেবল পাসের ক্ষেত্রেই নয়, গ্রেড পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নমনীয়তা ছিল। কোনো শিক্ষার্থী পরবর্তী গ্রেডের সীমার কাছাকাছি থাকলে তাকে পরের গ্রেডে তুলে দেওয়া হতো। এছাড়া প্রশ্নে যা-ই চাওয়া হোক না কেন, খাতায় কিছু লেখা থাকলেই ‘চেষ্টার’ মূল্যায়ন হিসেবে নম্বর দেওয়ার অলিখিত রেওয়াজ ছিল। উত্তর পুরোপুরি সঠিক বা প্রাসঙ্গিক না হলেও পরীক্ষকেরা আংশিক নম্বর দিতে বেশ উদারতা দেখাতেন।
তবে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে অলিখিত উদারতার চর্চা থেকে সরে এসে পরীক্ষার্থীর লিখিত উত্তরের ভিত্তিতে প্রাপ্য নম্বর দেওয়ার ওপর কঠোর জোর দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। ফলে এখন আর ২৮ নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীকে বাড়িয়ে ৩৩ দিয়ে পাস করানো কিংবা গ্রেড পরিবর্তনের জন্য কৃত্রিমভাবে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার সুযোগ নেই। একইভাবে প্রশ্নে যা জানতে চাওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে সম্পর্কহীন উত্তর লিখলে কোনো নম্বর দেওয়া হচ্ছে না। আংশিক উত্তরের জন্য কেবল তার সমপরিমাণ নম্বর দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, খাতায় কতটা লেখা হয়েছে— তার চেয়ে উত্তর কতটা সঠিক ও প্রাসঙ্গিক, সেটিই এখন মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি।
শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন, এই পরিবর্তনের মূল উদ্দেশ্য পাসের হার বা জিপিএ-৫ কমানো নয়; বরং পরীক্ষার ফল যেন শিক্ষার্থীর প্রকৃত যোগ্যতার সঠিক প্রতিফলন ঘটায়। এতদিন উচ্চ পাসের হার কিংবা জিপিএ-৫-এর সংখ্যাকে সাফল্যের সূচক ভাবা হলেও এখন পরিসংখ্যানের চেয়ে মূল্যায়নের নির্ভুলতাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি এবং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘খাতা মূল্যায়নে উদারনীতি বা কঠোরনীতি— কোনোটিই অনুসরণ করা হচ্ছে না; বরং বাস্তবধর্মী ও সঠিক মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কৃত্রিমভাবে বেশি পাস বা বেশি জিপিএ-৫ দেখানো আমাদের উদ্দেশ্য নয়, যোগ্য শিক্ষার্থীকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করাই আসল লক্ষ্য। সে অনুযায়ী পরীক্ষকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, ‘অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে ১০০ জনকে পাস করানোর চেয়ে প্রকৃত মূল্যায়নের মাধ্যমে ঠিক যতজন পাসের যোগ্য, সেই ফল প্রকাশ করাই শ্রেয়। পাসের হার কমে যাওয়াকে আমি শিক্ষার ক্ষতি হিসেবে দেখছি না; বরং এর মাধ্যমে শিক্ষার আসল ও বাস্তব চিত্র সামনে আসছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান শিক্ষা প্রশাসন দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, ভুল-ত্রুটি ও বিচ্যুতি থেকে শিক্ষা নিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে সঠিক অবস্থানে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানানো উচিত। কেবল পাসের হার বেশি দেখানোর জন্য খাতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করা কখনোই শিক্ষার উন্নয়নের পথ হতে পারে না; বরং এতে শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিই হয়েছে।’
উত্তরপত্র মূল্যায়নের বিষয়ে ড. জিন্নাহ বলেন, ‘এবার অন্তত সঠিক ও যথাযথ মূল্যায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শিক্ষকদের যেমন দায়িত্বশীলতার সঙ্গে খাতা মূল্যায়ন করতে হবে, তেমনি শিক্ষার্থীদেরও পড়াশোনা করে পরীক্ষায় ভালো ফল করার মানসিকতা নিতে হবে। শিক্ষকের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা বজায় রেখে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা এবং পুরো প্রক্রিয়ায় শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।’
সাম্প্রতিক ফলাফলের পতনের পেছনে কেবল মূল্যায়ন পদ্ধতি নয়, রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন এই শিক্ষাবিদ। তার মতে, রাজনৈতিক আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। পাশাপাশি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও পরিবারের আয় কমে যাওয়ার মতো অর্থনৈতিক সংকটও অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তাই ফলাফলের সূচক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এসব সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘আগে পরীক্ষার ফলাফলকেই মূলত শিক্ষার মানের প্রধান সূচক হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু একজন শিক্ষার্থী কত নম্বর বা জিপিএ-৫ পেল, তার চেয়ে সে কতটা শিখল, বিষয়বস্তু কতটা অনুধাবন করতে পারল এবং বাস্তব জীবনে সেই জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারছে কি না— সেটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
ড. সহিদুজ্জামান আরও বলেন, ‘মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন, প্রশ্নপত্রের ধরন, মুখস্থনির্ভরতা কমানোর পদক্ষেপ এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে কড়াকড়ির মতো বিষয়গুলো ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে, ফলাফল যদি ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে, তবে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করা জরুরি। শিক্ষার্থীরা কোথায় পিছিয়ে পড়ছে, কোন বিষয়ে তাদের দুর্বলতা বেশি, শিক্ষকদের পাঠদানের সক্ষমতা ও প্রশিক্ষণ যথাযথ কি না, বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় একাডেমিক পরিবেশ রয়েছে কি না এবং শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের সুযোগের বৈষম্য কতটা— এসব মৌলিক বিষয় গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।’
‘শিক্ষার মূল লক্ষ্য কেবল বিপুল সংখ্যক জিপিএ-৫ বা উচ্চ পাসের হার অর্জন করা নয়, আবার ফলাফল কমে যাওয়াকে স্বভাবসিদ্ধ বলে মেনে নেওয়ারও সুযোগ নেই। শিক্ষার সঠিক মান নিশ্চিত করতে হলে ফলাফলের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা, সৃজনশীল চিন্তা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং ক্ষেত্রভিত্তিক বাস্তব জ্ঞান অর্জনের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে’— যোগ করেন এই শিক্ষাবিদ।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমে যাওয়াকে একেবারে নেতিবাচকভাবে দেখার আগে ভাবতে হবে— আগের উচ্চ ফলাফল শিক্ষার্থীদের প্রকৃত সক্ষমতার কতটা প্রতিফলন ছিল। দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার ফলকেই সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি বানানো হয়েছিল, যার ফলে প্রকৃত শেখার চেয়ে ভালো ফলাফলের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করার প্রবণতা তৈরি হয়। এখন মূল্যায়ন তুলনামূলক কঠোর হওয়ায় এবং মুখস্থনির্ভরতার সুযোগ কমে আসায় ফলাফলে তার প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।
বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত ফল না পেলে কেবল ‘মূল্যায়ন কঠোর হয়েছে’ বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। বরং দেখতে হবে শিক্ষার্থীরা নতুন এই মূল্যায়ন পদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না কেন। এ ক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মান, একাডেমিক পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের মৌলিক জ্ঞান ও দক্ষতা তৈরিতে দীর্ঘদিনের ঘাটতি রয়েছে কি না— তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি
ড. মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, উপ-উপাচার্য, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
“তবে, বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত ফল না পেলে কেবল ‘মূল্যায়ন কঠোর হয়েছে’ বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। বরং দেখতে হবে শিক্ষার্থীরা নতুন এই মূল্যায়ন পদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না কেন। এ ক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মান, একাডেমিক পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের মৌলিক জ্ঞান ও দক্ষতা তৈরিতে দীর্ঘদিনের ঘাটতি রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি”— যোগ করেন তিনি।
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। এর মধ্যে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ৫৭টি, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের ২২৬টি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২৯টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০২৫ সালে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান ছিল ১৩৪টি; ফলে এক বছরের ব্যবধানে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ১৭৮টি।
এমন ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ খুঁজতে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বিশেষ নজর দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডগুলো। এরই অংশ হিসেবে দাখিল পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থীও পাস না করা ২২৬টি মাদ্রাসার প্রধানদের বোর্ডে ডেকে কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে। লিখিত বক্তব্যসহ সশরীরে উপস্থিত হয়ে তাদের কৈফিয়ত দিতে বলা হয়েছে।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে গত ১৬ আগস্ট ঢাকা ও ময়মনসিংহ, ১৭ আগস্ট রাজশাহী, ১৮ আগস্ট রংপুর, ১৯ আগস্ট চট্টগ্রাম ও সিলেট, ২০ আগস্ট খুলনা ও কুমিল্লা এবং সবশেষে ২৩ আগস্ট বরিশাল অঞ্চলের মাদ্রাসাগুলোর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান বলেন, ‘এবারের দাখিল পরীক্ষায় ফলাফল খারাপ হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। বিশেষ করে পরীক্ষার পরিবেশ ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা এর অন্যতম প্রধান কারণ।’
শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে বিশেষ পদক্ষেপের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের বোর্ডের অধীনে ২২৬টি প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি। আমরা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ করে সংশ্লিষ্ট প্রধানদের সঙ্গে আলাদাভাবে আলোচনা করছি। কেন একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারল না, শিক্ষার মান কেমন ছিল, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং সার্বিক একাডেমিক কার্যক্রম কী অবস্থায় রয়েছে— এসব বিষয় গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হতে পারেনি, তাদের এমপিওভুক্তির বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক। শুনানির ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১৮ লাখ ৫৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেছিল। এর মধ্যে সাধারণ নয়টি বোর্ডের অধীন এসএসসিতে ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৮ জন, মাদ্রাসা বোর্ডের অধীন দাখিলে ৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ জন এবং কারিগরি বোর্ডের অধীন এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
ঢাকা পোস্ট অবলম্বনে








