ঢামেকে চার বেলার খাবারে বরাদ্দ মাত্র ১৪৯ টাকা

05 September, 2026

প্রকাশের সময়: 03:35 pm, 5th Sep, 2026

সর্বশেষ আপডেট: 03:35 pm, 5th Sep, 2026

ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘১৭৫ টাকার মধ্যে ভ্যাট বাদ দিলে থাকে ১৪৯ টাকা। ঠিকাদার যদি ১০ শতাংশও লাভ করে, তাহলে সেই টাকা নেমে আসে প্রায় ১৩৫ টাকায়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে রোগীপ্রতি চার বেলা খাবারের জন্য বরাদ্দ মাত্র ১৪৯ টাকা। এ খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। বিশেষ করে দুপুর ও রাতের খাবারের মান নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। তারা জানান, এ খাবার খাওয়ার উপযোগী না হওয়ায় বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে এনে খেতে হচ্ছে তাদের। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, পর্যাপ্ত সংখ্যক পুষ্টিবিদ না থাকায় খাবারের মান নিয়ন্ত্রণ কষ্টকর হচ্ছে।

সম্প্রতি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে সরজমিনে দেখা যায়, দুপুরের খাবার হাতে পাওয়ার পর মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন রোগী ও স্বজনরা। তাদের অভিযোগ, খাবারে বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমান দুটিই কম, বিশেষ করে তরকারির মান নিয়ে তাদের আপত্তি বেশি।

হাসপাতালে ১৮ দিন ধরে রোগী নিয়ে অবস্থান করছেন আবিদ আহমেদ। তার রোগী অপারেশনের অপেক্ষায় রয়েছেন। খাবারের মান নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তরকারির মান খুবই খারাপ, খাওয়ার উপযোগী না। বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে গেলে খরচ অনেক পড়ে, তাই ভাতটা বাধ্য হয়েই খাই। তরকারি বাইরে থেকে কিনে খেতে হয়।’ তবে সকালের নাশতার মান নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।

আরেক রোগীর স্বজন হানিফ মাহমুদ বলেন, ‘দুপুর ও রাতে যে খাবার দেয়া হয়, তার মান খুবই নিম্ন। ভাতের গায়ে পানি লেগে থাকে। তরকারিতে হলুদ আর লবণ ছাড়া আর কিছু থাকে না। যারা দায়িত্বে আছেন, তারা ঠিকমতো তদারকি করেন বলে মনে হয় না।’

হাসপাতাল সূত্র জানা গেছে, রোগীদের জন্য চার বেলা খাবারের মোট বরাদ্দ ১৭৫ টাকা। এর মধ্যে সকালের নাশতায় ৫৩ দশমিক ৬৭ টাকা, দুপুরের খাবারে ৫২ দশমিক ৭৯ টাকা, বিকালের নাশতায় ৩০ দশমিক ৮৭ টাকা এবং রাতের খাবারে ৩৭ দশমিক ৬৭ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। তবে এই ১৭৫ টাকার মধ্যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ভ্যাট বাদ দিলে রোগীর খাবারের জন্য কার্যকর বরাদ্দ দাঁড়ায় ১৪৯ টাকায়।

ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘১৭৫ টাকার মধ্যে ভ্যাট বাদ দিলে থাকে ১৪৯ টাকা। ঠিকাদার যদি ১০ শতাংশও লাভ করে, তাহলে সেই টাকা নেমে আসে প্রায় ১৩৫ টাকায়। বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী এ টাকা আসলেই প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে বরাদ্দ বাড়ানোর অনুরোধ করা হয়েছে।’

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, করোনা মহামারীর সময় রোগীদের খাবারের বরাদ্দ ১২৫ থেকে বাড়িয়ে ১৭৫ টাকা করা হয়েছিল। সে সময় রোগীদের খাবারে আমিষের পরিমাণও তুলনামূলক বেশি ছিল। ৫৩-৬৫ গ্রাম পর্যন্ত আমিষ সরবরাহ করা হলেও সময়ের সঙ্গে তা কমে বর্তমানে প্রায় ৪০-৪৫ গ্রামে নেমে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

খাবারের পুষ্টিমান কমে যাওয়ার বিষয়টি রোগীদের স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. নাজমা শাহীন বলেন, ‘একজন রোগীর জন্য ওষুধ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, পুষ্টিকর খাবারও তেমনই। শুধু ওষুধ দিয়ে তো রোগীদের সুস্থ করা যায় না। রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন ডায়েট প্রয়োজন। সব রোগীর খাবার এক হতে পারে না। জেনারেল ডায়েট দিয়ে সব রোগীর প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয়। চিকিৎসাধীন একজন মানুষের সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালরি, আমিষ, ভিটামিন ও খনিজ উপাদানও খাবারের মাধ্যমে নিশ্চিত করার কথা।’

তার মতে, রোগীদের খাবারের মান ও পুষ্টিমান পরীক্ষা এবং খাবারের তালিকা নির্ধারণে নিউট্রিশনিস্টদের সম্পৃক্ত করা জরুরি। নির্ধারিত পুষ্টি নিশ্চিত করা না গেলে রোগীরা প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হয় এবং সুস্থ হতে বেশি সময় লাগে।

হাসপাতালে পর্যাপ্ত পুষ্টিবিদেরও ঘাটতি রয়েছে। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, ঢামেকে আগে একজন পুষ্টিবিদ ছিলেন। তার অন্য হাসপাতালে পোস্টিং হয়েছে এবং এ বিষয়ে মামলা চলমান রয়েছে।

এত বড় হাসপাতালে পুষ্টিবিদের সংখ্যা একজন কেন—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, পুষ্টিবিদ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, দ্রুতই নিয়োগ দেয়া হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ ইনফরমেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. তাজউদ্দিন সিকদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রোগীদের জন্য খাবারের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে হাসপাতালগুলোকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসরণ করা উচিত। খাবারের মান যদি নির্ধারিত গাইডলাইনের নিচে থাকে, তাহলে সেটিকে নির্দিষ্ট মানদণ্ডে উন্নীত করা প্রয়োজন।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালে খাবারের মান নিশ্চিত করতে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না। খাবারের কাঁচামালের মান, রান্নার পদ্ধতি, পরিবেশন, পুষ্টিমান এবং রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী ডায়েট—সব বিষয় নিয়মিত তদারকির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে খাবারে নির্ধারিত পরিমাণ আমিষ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থাকছে কিনা তাও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

খাবারের মান নিয়ে রোগী-স্বজনদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘মূল্যবৃদ্ধি ও আনুষঙ্গিক কিছু বিষয়ে খাবারের মান নিয়ে কিছু কিছু অভিযোগ হয়তো আছে। তবে আমরা আন্তরিকভাবে সবসময় চেষ্টা করি ঠিকাদারের কাছ থেকে ভালো মানের খাবার নিশ্চিত করতে।’

শেয়ার করুন!