বিএনপির হাত ধরে যাত্রা র‍্যাবের, দুই দশক পর সেই বিএনপির হাতেই বিলুপ্তি

11 September, 2026

প্রকাশের সময়: 02:25 pm, 11th Sep, 2026

সর্বশেষ আপডেট: 02:25 pm, 11th Sep, 2026

দেশে জঙ্গি, সন্ত্রাস দমন ও আইনশৃঙ্খলার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। দুই দশকের বেশি সময় পর সেই বিএনপি সরকারের হাত ধরেই বিলুপ্ত হলো আলোচিত এই বাহিনী। ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে কণ্ঠভোটে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল-২০২৬’ পাসের মধ্য দিয়ে র‍্যাবের অবসান ঘটে।


তবে র‍্যাবের নাম মুছে এসআরবি—নতুন নামে কি সত্যিই নতুন বাহিনী? এ নিয়েই ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ নতুন বাহিনীতে র‍্যাবের জনবল, সম্পদ, সরঞ্জাম, নথি, স্থাপনা ও অন্যান্য সম্পদ হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে। ফলে সমালোচকদের প্রশ্ন, বাহিনীর নাম বদলালেই কি বদলাবে এর কাঠামো, সংস্কৃতি ও জবাবদিহির ব্যবস্থা? সরকার বলছে, র‍্যাব বিলুপ্ত করে সম্পূর্ণ নতুন কাঠামোয় এসআরবি গঠন করা হচ্ছে এবং দুই বাহিনীর কোনো সংস্পর্শ নেই।


র‍্যাবের ইতিহাস ও গঠনের প্রেক্ষাপট
২০০৪ সালে দেশে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলায় একটি বিশেষায়িত বাহিনীর প্রয়োজন থেকে র‍্যাব গঠন করা হয়। পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনীসহ বিভিন্ন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে তৈরি এই বাহিনী শুরুতেই দ্রুত অভিযান পরিচালনার সক্ষমতার কারণে আলোচনায় আসে।


ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী দমন এবং জেএমবিসহ জঙ্গি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে অভিযানে র‍্যাবের সাফল্য সাধারণ মানুষের মধ্যে বাহিনীটির জনপ্রিয়তা বাড়ায়। বিশেষ করে ২০০৫ সালের দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার পর জঙ্গিবিরোধী অভিযানে র‍্যাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


অপরাধ দমনে এলিট ফোর্স
প্রচলিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তুলনায় দ্রুত অভিযান, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং বিশেষ অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা র‍্যাবকে দেশের অন্যতম আলোচিত এলিট ফোর্সে পরিণত করে।


শুরুতে শীর্ষ সন্ত্রাসী, চরমপন্থী ও জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে বাহিনীটির ভূমিকা ব্যাপক প্রশংসা পায়। কিন্তু এই সাফল্যের পাশাপাশি অভিযানের ধরন, বলপ্রয়োগ এবং আটক ব্যক্তিদের পরিণতি নিয়েও ধীরে ধীরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।

ক্রসফায়ার বিতর্কে র‍্যাব
র‍্যাবের কার্যক্রমের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আলোচিত শব্দগুলোর একটি হয়ে ওঠে—‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’। বিশেষ করে বিএনপি আমলের শুরুর দিকে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযানে কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।


পরবর্তীতে বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে মৃত্যু, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ক্রমেই বাড়তে থাকে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুন, টেকনাফে কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন ঘটনায় র‍্যাব সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। ফলে অপরাধ দমনে সাফল্যের পাশাপাশি বাহিনীটির বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও এর পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়।


র‍্যাবকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার
২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে র‍্যাবের ব্যাপক ব্যবহার হয়। শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদে বাহিনীটির ভূমিকা নিয়ে তখন থেকেই রাজনৈতিক ব্যবহারের প্রশ্ন ওঠে।


পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের গুম, গ্রেপ্তার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে র‍্যাবের নাম বারবার আসে। ফলে একটি অপরাধ দমনকারী বিশেষায়িত বাহিনী ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে—এমন অভিযোগও জোরালো হয়।


মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
র‍্যাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বড় ধরনের চাপ তৈরি করে। ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র র‍্যাব এবং এর সাতজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার ওপর গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি হিউম্যান রাইটস অ্যাকাউন্টেবিলিটি অ্যাক্টের আওতায় নিষেধাজ্ঞা দেয়।


গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ভিত্তিতে দেওয়া এই নিষেধাজ্ঞা র‍্যাবের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে বড় ধাক্কা দেয়। এর পর থেকেই বাহিনীটির সংস্কার, জবাবদিহি এবং ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়তে থাকে।


২৪-এর আন্দোলনে র‍্যাবের ভূমিকা
২০২৪ সালের গণআন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। আন্দোলন দমনে র‍্যাবের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ ওঠে। এর ফলে দীর্ঘদিনের মানবাধিকার বিতর্কের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয় গণআন্দোলনে বাহিনীটির ভূমিকার প্রশ্ন।


রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর র‍্যাব বিলুপ্তির দাবি আরও জোরালো হয়। বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতেও র‍্যাব বিলুপ্তির বিষয়টি ছিল। শেষ পর্যন্ত ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সংসদে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ পাসের মধ্য দিয়ে র‍্যাবের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে।


তবে র‍্যাবের অবসানের পরও প্রশ্ন থেকে যায়—নাম বদলে এসআরবি হলে কি দুই দশকের বিতর্কেরও অবসান হবে, নাকি পুরোনো কাঠামো ও জনবল নিয়ে নতুন নামে আবারও জন্ম নেবে একই ধরনের একটি এলিট ফোর্স?
কারণ এসআরবির লক্ষ্যও জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো। পার্থক্যটা তাই শুধু নামের নয়—মূল পরীক্ষা হবে জবাবদিহি, মানবাধিকার, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা যায় কি না, তার ওপর।


বিরোধী দলের আপত্তি
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, র‍্যাব বিলুপ্তির দাবি থাকলেও একই ধরনের আরেকটি বাহিনী গঠনের দাবি ছিল না। তাঁর অভিযোগ, র‍্যাবের কাঠামো ও জনবল প্রায় অক্ষুণ্ন রেখে এসআরবি গঠন করা হচ্ছে; তাই বিলটি প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি।


বিরোধী দলের সদস্য নুরুল ইসলাম র‍্যাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গুমের অভিযোগ তুলে দ্রুত বিল পাসের উদ্যোগের সমালোচনা করেন। আর নাজিবুর রহমান বলেন, বিলের ২৭ ধারায় র‍্যাবের জনবল, সম্পদ, নথি ও দায়দায়িত্ব এসআরবিতে হস্তান্তরের বিধান থাকায় “শুধু সাইনবোর্ডটাই পরিবর্তন হচ্ছে, নতুন বোতলে পুরোনো মদ”। এতে অতীতের অপরাধের মামলা ও তদন্ত নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।


স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাব
বিরোধীদের আপত্তির জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠন করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, বিল পাসের মাধ্যমে র‍্যাবের অস্তিত্বেরই অবসান ঘটবে। র‍্যাবের অস্ত্র, সরঞ্জাম ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সম্পদ এসআরবিতে হস্তান্তরের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, এসব সম্পদ নষ্ট না করে নতুন বাহিনীর কাজে লাগানোই যুক্তিসংগত।

শেয়ার করুন!