রাজধানীজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ এখন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা, তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন রেকর্ড। হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ, আর ঘরে ঘরে দেখা দিয়েছে মশাবাহিত এই রোগ নিয়ে তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্ক। এমন পরিস্থিতিতে এডিস মশার হাত থেকে বাঁচতে রাজধানীবাসীর নির্ভরতা বেড়েছে মশারি ও মশা তাড়ানোর নানা উপকরণের ওপর।
হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে মশারির কদর। আগে যেসব দোকানে লুঙ্গি, গামছা কিংবা অন্যান্য কাপড়ের পণ্যই বেশি জায়গা দখল করে থাকত, সেসব দোকানে এখন চোখে পড়ছে সারি সারি মশারি। দোকানের সামনের অংশ থেকে শুরু করে ভেতরের তাক পর্যন্ত ঝুলছে নানা রঙ ও আকারের মশারি। শুধু মশারিই নয়, ডেঙ্গুর আতঙ্কে চাহিদা বেড়েছে মশার কয়েলেরও।
রাজধানীজুড়ে ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তারে এডিস মশার কামড় থেকে বাঁচতে মশারি ও কয়েলের চাহিদা বহুলাংশে বেড়েছে। সাধারণ কাপড়ের দোকানেও এখন স্থান করে নিয়েছে নানা আকারের মশারি, বিক্রি বেড়েছে দ্বিগুণ পর্যন্ত। তবে, বোনাফাইড বা অ্যাঞ্জেল ম্যাজিক মশারির চড়া দাম সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের পকেটে বড় ধরনের টান ফেলছে
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর বড় বড় সুপারশপ থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার ছোট মুদি দোকান— সবখানেই এখন কয়েলের দাপট। কোথাও সাজানো হয়েছে কয়েলের স্তূপ, আবার কোথাও মশারির পাশাপাশি রাখা হয়েছে মশা তাড়ানোর নানা সামগ্রী।
বর্তমানে বাজারে বেশ কয়েক ধরনের মশারি পাওয়া যাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের বোনাফাইড, বোনাফাইড ম্যাজিক, অ্যাঞ্জেল প্লাস, অ্যাঞ্জেল ম্যাজিক, গুড নাইট, প্যারাগন ও সোহান ম্যাজিক এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। মশারির আকৃতি বা সাইজের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হচ্ছে দাম। সিঙ্গেল, সেমি-ডাবল ও ডাবল সাইজের মশারিতে ভরপুর বাজার। সাইজের পাশাপাশি নানা রঙের মশারি ঝুলতে দেখা যায় দোকানগুলোতে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল মার্কেটের ‘নূরানী শাড়ী হাউজ’-এর বিক্রেতা কাউসার পাটওয়ারী বলেন, প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত আমাদের দোকান খোলা থাকে। ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার কারণে আগের চেয়ে মশারির ক্রেতা কিছুটা বেশি পাওয়া যাচ্ছে। তবে, অন্যান্য সাধারণ ব্যবসার অবস্থা কিছুটা মন্দা। আগের মতো শাড়ি, লুঙ্গি বা গামছা প্রত্যাশা অনুযায়ী বিক্রি হচ্ছে না।
তিনি আরও জানান, আগের তুলনায় বর্তমানে মশারির বেচাকেনা ভালো। বাজারে ১৮০ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত মশারি বিক্রি হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের বোনাফাইড মশারির মধ্যে সিঙ্গেল ৩০০ টাকা, সেমি-ডাবল ৩৫০ টাকা ও ডাবল ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া বোনাফাইড ম্যাজিক ৪০০ টাকা, অ্যাঞ্জেল প্লাস ১ হাজার ৬০০ টাকা, অ্যাঞ্জেল ম্যাজিক ১ হাজার টাকা, লাক্সারি ৬০০ টাকা, গুড নাইট ৪৫০ টাকা, প্যারাগন ডাবল ৫০০ টাকা এবং সোহান ম্যাজিক ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ধানমন্ডির শংকর এলাকা থেকে মশারি কিনতে মোহাম্মদপুর টাউন হল মার্কেটে এসেছেন পারভীন আখতার। তার এক আত্মীয় বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি, তার জন্যই মশারি কিনতে আসা। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘একটি ছোট মশারি কিনতে এসেছিলাম, সেটির দামও ৩০০ টাকা চাইছে। ম্যাজিক মশারি কিনতে কমপক্ষে ৫০০ টাকা লাগবে। মানুষ অসুখে ভুগছে আর ব্যবসায়ীরা এই সুযোগে পকেট কাটছে।’
মায়ের দোয়া বেডিং স্টোর-এর মালিক আবু দাউদ বলেন, বাজারে বেশকিছু আধুনিক মশারি এসেছে। যেমন বোনাফাইড ম্যাজিক মশারি সহজে ভাঁজ করা যায়। সেলফ-স্ট্যান্ড সুবিধা থাকায় এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। এসব মশারির দাম ৫৭০ থেকে ৭৫০ টাকা। অন্যদিকে, বোনাফাইড অ্যাঞ্জেল প্লাস মশারি প্রিমিয়াম মানের, যার দাম প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা। এছাড়া জিপার ও আকর্ষণীয় প্রিন্টযুক্ত স্টাইলিশ ফোল্ডেবল মশারির দাম ৯০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত। শিশুদের জন্য রয়েছে কার্টুন ও বেলুন প্রিন্টের ডোম আকৃতির ছাতা মশারি, যা ১৮০ থেকে ৪৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
নূরানী শাড়ী হাউজের কাউসার পাটওয়ারী জানান, আগে দিনে দু-একটি মশারি বিক্রি হলেও এখন দিনে ১৫ থেকে ১৬টি বিক্রি হচ্ছে। তাদের দোকানে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ৬ ফুট বাই ৭ ফুট সাইজের মশারি।
মশারির পাশাপাশি পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে নামিদামি ও বেনামি কয়েলের বিক্রি বহুগুণ বেড়েছে। সন্ধ্যা নামলেই ঘরে ঘরে কয়েল পোড়ানো হলেও কয়েলের ধোঁয়ায় মশা না মরার অভিযোগ তুলেছেন ক্রেতারা। সিটি করপোরেশনের স্প্রে কার্যকর না হওয়ায় বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত খরচ গুনে কয়েল ও মশারি ব্যবহার করছেন বাসিন্দারা
রায়েরবাজারের মশারি বিক্রেতা আমজাদ হোসেন বলেন, সারা বছরই কম-বেশি মশারি বিক্রি হয়। তবে, গত দুই সপ্তাহ ধরে বিক্রি অনেক বেড়েছে। আগে দোকান খুলে ক্রেতার জন্য বসে থাকতে হতো, এখন বিক্রি দ্বিগুণ হয়েছে। তবে, আমরা দাম খুব একটা বাড়াইনি; ভালো মানের মশারি ৫০০ টাকার মধ্যেই বিক্রি করছি।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সেলিম মিয়া বলেন, আগে কম দামে সাধারণ মশারি পাওয়া যেত, এখন তা নেই। একটা ম্যাজিক মশারি কিনতে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা লাগে। আগে পাড়া-মহল্লায় ফেরিওয়ালারা মশারি বিক্রি করত, এখন মশার প্রকোপ বাড়ায় বাজারে গিয়েই কিনে আনতে হচ্ছে।
একটি মিষ্টির দোকানে কাজ করা সোহেল মিয়া বলেন, আমি সারা বছরই মশারি টাঙিয়ে ঘুমাই। আগের মশারিটা পুরোনো হয়ে ছোট মশা ঢুকে যায়, তাই ডাবল ম্যাজিক মশারি নিতে এসেছি। কিন্তু দাম ৬৫০ টাকা চাইছে। এতো দাম হলে সাধারণ মানুষ কীভাবে কিনবে?
সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর প্রায় সব মুদি দোকানেই মশার কয়েল বিক্রি হচ্ছে। নামিদামি ব্র্যান্ডের পাশাপাশি ঈগল, বসুন্ধরা, সোলার, পাতাবাহার, নিমপাতা, এক্সট্রিম, গোদরেজ, বাংলার কিং এবং চায়নিজ কয়েল বাউমা ও ড্রাগনসহ নানা বেনামি কয়েলে বাজার সয়লাব। অধিকাংশ কয়েলের প্যাকেট ৫০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মুদি দোকানদার মাসুম আহমেদ বলেন, আমরা প্যাকেটের পাশাপাশি খুচরা ৫ ও ১০ টাকায় কয়েল বিক্রি করি। ডেঙ্গু বাড়ার পর কয়েলের বিক্রি অনেক বেড়েছে। আগে যেখানে মাসে এক কার্টন কয়েল বিক্রি করা কঠিন ছিল, এখন সপ্তাহে এক কার্টন শেষ হয়ে যাচ্ছে।
কয়েল কিনতে আসা স্কুলশিক্ষিকা লাভলী আখতার বলেন, সন্ধ্যা হলেই কয়েল না জ্বালিয়ে উপায় থাকে না। সিটি করপোরেশন থেকে স্প্রে করে গেলেও কিছুক্ষণ পর আবার মশার কামড় খেতে হয়। ঘরে মশারি ব্যবহার করার পরও কয়েল জ্বালাতে হয়, কারণ যেভাবেই হোক ডেঙ্গুর হাত থেকে বাঁচতে চাই।
ঢাকা পোস্ট অবলম্বনে








