রাজধানীর কাছের জেলা গাজীপুর। শহরের কোলাহল আর ইট-পাথরের ব্যস্ততা পেরিয়ে সবুজের কাছে কিছুটা সময় কাটাতে ছুটির দিনে এখানে ভিড় করেন ভ্রমণপিপাসুরা। শাল-গজারির বন, নদী-খালসহ প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একের পর এক রিসোর্ট ও বিনোদনকেন্দ্র। সদর, শ্রীপুর, কালিয়াকৈর, রাজেন্দ্রপুর ও পুবাইল এলাকায় দিন দিন বাড়ছে এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা।
তবে পর্যটনের সম্ভাবনা বাড়লেও রিসোর্টকেন্দ্রিক বিনোদনের খরচ নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। বিভিন্ন রিসোর্টে রাতযাপন ও বিনোদনের প্যাকেজের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে বলে অভিযোগ পর্যটকদের। সংশ্লিষ্টদের মতে, অতিরিক্ত খরচের কারণে গাজীপুরের পর্যটন সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
গাজীপুরের নলজানি এলাকায় অবস্থিত ভাওয়াল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা সেন্টারে রয়েছে বিভিন্ন শ্রেণির কক্ষ ও দিনব্যাপী প্যাকেজ। সেখানে এক রাত থাকার জন্য ওয়ান বেডরুম ভিলার ভাড়া ১১ হাজার টাকা থেকে শুরু করে টু বেড সুইট পুল ভিউয়ের জন্য সর্বোচ্চ ৩২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। সকালের নাশতা ভাড়ার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও দুপুর ও রাতের খাবারের জন্য আলাদা অর্থ দিতে হয়।
শ্রীপুরের রাজাবাড়ি ইউনিয়নে রয়েছে বিলাসবহুল অবকাশকেন্দ্র সারাহ্ রিসোর্ট। প্রিমিয়াম ভিলা, লেকসাইড ভিলা, ওয়াটার লজ, ট্রি হাউজ, হাউজ বোট ও রাজ ভিউ টাওয়ারসহ প্রায় ১০৯টি রুম ও ভিলা রয়েছে সেখানে। পাশাপাশি সুইমিং পুল, ওয়াইফাই, রেস্তোরাঁ, কনফারেন্স রুম ও শিশুদের খেলার জায়গার সুবিধাও রয়েছে।
শ্রীপুরের ভাংনাহাটি এলাকায় রয়েছে গ্রীণ ভিউ রিসোর্ট। সুইমিংপুল, জাকুজি, শিশুদের কিডস জোন, মিনি চিড়িয়াখানা, অর্গানিক রেস্তোরাঁ, সাইক্লিং, ব্যাডমিন্টনসহ বিভিন্ন ইনডোর ও আউটডোর গেমসের পাশাপাশি ডিলাক্স গলফ ভিলা ও সোয়ান ভিলার মতো থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। এসব সুবিধার কারণে পর্যটকদের কাছে রিসোর্টটির চাহিদা রয়েছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে কথা বলতে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি শ্রীপুরের একটি রিসোর্টে দুই রাত অবস্থান শেষে শনিবার সকালে বের হচ্ছিলেন রাজধানীর এক ব্যবসায়ী। নাম-পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি বলেন, এক রাত রিসোর্টে থাকার জন্য তার ৩০ হাজার টাকার বেশি বিল হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এক রাতে ৩০ হাজার টাকা বিল অনেকটাই বেশি বলে মনে হচ্ছে। অন্যান্য জায়গার চেয়ে খরচ অনেক বেশি। ব্যস্ত জীবন, তাই ঢাকার বাইরে যাওয়ার সময় হয়ে ওঠে না। তাই ঢাকার কাছাকাছি হিসেবে এই এলাকাকে আমরা বেছে নিচ্ছি।’
সম্প্রতি শ্রীপুরের আরেকটি রিসোর্টে পরিবার নিয়ে রাতযাপন শেষে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন লতিফুর রহমান। তিনি বলেন, ‘স্ত্রী-সন্তান নিয়ে রিসোর্টে এসেছিলাম। মাঝারি আকারের রিসোর্ট। অন্যান্য রিসোর্টের তুলনায় খরচ কম, সেবার মানও সন্তোষজনক। তবে ধার্য করা বিলটিও বেশি।’
তার মতে, গাজীপুরের রিসোর্টগুলোতে সরকারি নজরদারি জোরদার করা হলে সেবার মান বাড়ার পাশাপাশি অস্বাভাবিক বা চড়া খরচও কমতে পারে। এতে জেলার পর্যটন শিল্প আরও বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
গাজীপুরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে রিসোর্ট ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে উঠলেও এসব স্থাপনা ঘিরে পরিবেশের ওপর চাপের অভিযোগও রয়েছে।
গাজীপুরের নদ-নদী ও প্রকৃতি নিয়ে কাজ করা নদী ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলমের অভিযোগ, গাজীপুরের প্রকৃতি ধ্বংস করে যত্রতত্র রিসোর্ট ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এসব রিসোর্ট বা বিনোদনকেন্দ্রের ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এ ধরনের রিসোর্ট থেকে এলাকার কোনো ধরনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে না। এলাকার সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানও হয় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বন ধ্বংস করে রিসোর্ট তৈরির অভিযোগও রয়েছে। এসব কার্যক্রমে ক্রমেই বনের জমি ধ্বংস হচ্ছে। বেশির ভাগ রিসোর্টই বনের পাশে বা বনকেন্দ্রিক গড়ে তোলা হচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্যই থাকে বনের জমি দখল ও প্রকৃতি ধ্বংস করা।’
বাংলাদেশ পর্যটক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান বলেন, গাজীপুর একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন অঞ্চল। এখানকার বনাঞ্চল, খাল-বিল ও নদী সহজেই মানুষকে আকৃষ্ট করে। একইভাবে রিসোর্টগুলোও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
তিনি বলেন, ‘বাজারদরের চেয়ে এসব রিসোর্টের মূল্য আমার কাছে অনেক বেশি মনে হয়। যে কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ভ্রমণপ্রেমী পর্যটকেরা গাজীপুরের রিসোর্টগুলোতে আসতে উৎসাহী হলেও খরচ তাদের সাধ্যের বাইরে চলে যায়। এসব রিসোর্টে মধ্যবিত্ত মানুষের যাওয়া খুব কঠিন, আর নিম্নবিত্তরা তো চিন্তাই করতে পারে না।’
রিসোর্টগুলোর বিভিন্ন ইভেন্টের মূল্য কমানোর পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশের সুযোগ রাখার পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে বুকিং ব্যবস্থা সহজ করা এবং পর্যটন সম্ভাবনাময় এলাকায় উপজেলা ভিত্তিক পর্যটক কর্মকর্তা নিয়োগের দাবি জানান।
গাজীপুরের পর্যটন আকর্ষণের অন্যতম জায়গা গাজীপুর সাফারি পার্ক। থাইল্যান্ডের সাফারি ওয়ার্ল্ডের আদলে শ্রীপুরের মাওনা ইউনিয়নে প্রায় ৪ হাজার একর জায়গার ওপর ২০১৩ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।
দেশি-বিদেশি বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ও দর্শনার্থীদের বিনোদনের জন্য শুরুতে পার্কটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। দেশের বিনোদন ও পর্যটনে এটি ভিন্নমাত্রা যোগ করেছিল। তবে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে ধীরে ধীরে এর জৌলুস কমতে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতি অর্থবছরে সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও অব্যবস্থাপনার কারণে গাজীপুর সাফারি পার্ক পর্যটক টানতে বা ধরে রাখতে পারছে না বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গাজীপুরের প্রকৃতি, রাজধানীর নিকটবর্তী অবস্থান এবং যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধা জেলাটিকে স্বল্প সময়ের ভ্রমণের জন্য সম্ভাবনাময় করে তুলেছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠছে নতুন নতুন রিসোর্ট ও বিনোদনকেন্দ্র।
কিন্তু রিসোর্টের উচ্চ খরচ, সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকা বিভিন্ন প্যাকেজ এবং প্রকৃতি ধ্বংসের অভিযোগ পর্যটন শিল্পের বিকাশের পথে প্রশ্ন তৈরি করছে।








