নদীর পাড়ে প্রকৃতি ও বিনোদনের মেলবন্ধন বুড়িগঙ্গা ইকোপার্কে

30 September, 2026

প্রকাশের সময়: 06:01 pm, 30th Sep, 2026

সর্বশেষ আপডেট: 06:01 pm, 30th Sep, 2026

গেট দিয়ে ঢুকলেই নাক বরাবর ডাইনোসরের প্রতিকৃতি। হাতের ডানে তাকালে সিংহের প্রতিকৃতি। শিশু-কিশোররা ঢুকেই ডাইনোসর ও সিংহ বলে শোরগোল তুলে দৌড়ে যায়।

বলছিলাম রাজধানীর বুড়িগঙ্গা ইকোপার্কের কথা, যা অনেকের কাছে শ্যামপুর বা বিআইডব্লিউটিএ ইকোপার্ক নামেও পরিচিত।

ইকোপার্কটি গেন্ডারিয়া থানা থেকে মাত্র ৭০০ মিটার দূরে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। ঢাকার যে কোনো স্থান থেকে নিজস্ব গাড়ি বা বাসে যাত্রাবাড়ী ও ধোলাইপাড় হয়ে শ্যামপুরের বুড়িগঙ্গা ইকোপার্কে যাওয়া যায়।

নদী দখল রোধ এবং পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ২০১২ সালের অক্টোবরে এটি নির্মাণ করে। প্রায় এক কোটি ৪৭ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রাথমিকভাবে ২ দশমিক ৩ একর থেকে শুরু করে প্রায় ৭ একর জায়গায় পার্কটি গড়ে তোলা হয়।

পার্কটি পরিচালনার জন্য নেপচুন নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ১০ বছরের জন্য ইজারা দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ।

পার্কে দর্শনার্থীদের প্রবেশ ফি প্রথমে পাঁচ টাকা ছিল। পরে তা বাড়িয়ে ৫০ টাকা করা হয়। পার্কটি সপ্তাহের সাত দিনই ভোর থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত এবং বেলা ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

সকালে পার্কে প্রাতর্ভ্রমণ করতে আসেন স্থানীয় লোকজন। তখন কোনো ফি দিতে হয় না। বিকেল থেকে রাতে ফি দিয়ে প্রবেশ করতে হয় পার্কে। তখন শিশু-কিশোরদের নিয়ে আসেন অভিভাবকেরা।

সৌন্দর্যবর্ধনে পার্কজুড়ে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ। নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে পাড়ে রয়েছে হাঁটার পথ (ওয়াকওয়ে)। দর্শনার্থীদের বিশ্রাম ও বসার জন্য পার্কের চারপাশে আছে বেঞ্চ ও ছাউনি। এসব স্থানে বসেই নদী ও চারপাশের পরিবেশ দেখা যায়।

এসবের পাশাপাশি নদীতে নামার জন্য আছে বড় ঘাট। দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে নদীর পাড়ে রয়েছে একটি সেতু, যেখানে দাঁড়িয়ে নদীর অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করেন অনেকে।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকালে পার্কের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করছেন কয়েকজন। কেউ পার্কের ওয়াকওয়েতে হাঁটছেন, কেউ দৌড়াচ্ছেন। খোলা স্থানে শারীরিক কসরত করছিলেন কয়েকজন। কেউ কেউ ফুটবল খেলছিলেন। আবার কেউ দাঁড়িয়ে ও বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। পার্কের বেঞ্চে বসে বুড়িগঙ্গা নদীর দৃশ্য দেখছিলেন কয়েকজন।

পার্কের ওয়াকওয়েতে কথা হয় শ্যামপুরের বাসিন্দা ও অবসরপ্রাপ্ত এক সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘বুড়িগঙ্গা ইকোপার্ক নদীর তীরে অবস্থিত হওয়ায় এখানে ঘুরতে এলে একসঙ্গে নদীর দৃশ্য দেখা যায়, আবার ব্যায়াম করা যাচ্ছে, যা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এটি জিমে যাওয়ার খরচ ছাড়াই মুক্ত বাতাসে ফিট থাকার সুযোগ করে দেয়। আমি বলবো আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম তথা এলাকার যুবক ও তরুণদের এখানে আসা বেশি প্রয়োজন।’

সকালে এরকম পার্কের সবুজ পরিবেশ এবং মুক্ত বাতাস মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা দূর করে মানসিক প্রশান্তি ও মন সতেজ রাখে বলে মনে করেন তিনি।

পার্কে দর্শনার্থীদের বিনোদনের জন্য রয়েছে নাইন-ডি (9D) সিনেমা, স্ট্রাইকিং কার, বুল ফাইট, রোলার কোস্টার, রেঞ্জার, ফ্রিজবী, সুইং চেয়ার, ব্লু-ওয়ার্ল্ড উইন্ড, ব্যাটারি কার, মেরি গো রাউন্ড, সেলফ কন্ট্রোল প্লেন, ওয়ান্ডার হুইল, টোরা টোরা, পাইরেট শিপ, ড্রাই স্লাইড, জাম্পিং প্যাড, ক্রস কান্ট্রি বাম্পার কার, রকিং বোট, কয়েন অপারেটর বেবি ফিগার, কাউ বয়, ফুডকোর্ট এবং ব্রাঞ্জি ট্রাম্পোলিনসহ বিভিন্ন ধরনের বিনোদনমূলক রাইড। এসব রাইডে চড়তে খরচ হবে ৩০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত।

গত শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় পার্কটিতে ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ শিশুরই পছন্দ মেরি গো রাউন্ড রাইড। এখানে শিশুদের একটু বেশি ভিড়। এছাড়া সেলফ কন্ট্রোল প্লেন, ব্যাটারি কার, রকিং বোট, কয়েন অপারেটেড বেবি ফিগার এবং ওয়ান্ডার হুইলসহ বিভিন্ন রাইডের সামনেও ছিল শিশুদের ভিড়।

বাবা-মায়েরা সন্তানদের নিয়ে একের পর রাইডে উঠছিলেন। স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তুলছিলেন, ভিডিও করছিলেন।

ইজারাদার প্রতিষ্ঠান নেপচুনের ব্যবস্থাপক মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বিআইডব্লিউটিএ ও নেপচুন যৌথভাবে বুড়িগঙ্গা ইকোপার্ক রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে। পরিবার-পরিজন বন্ধুদের সঙ্গে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানোর জন্য পার্কটি একটি চমৎকার স্থান। এটি শ্যামপুর ইকোপার্ক বা বিআইডব্লিউটিএ ইকোপার্ক নামেও পরিচিত।

তিনি জানান, এখানে সকালের দিকে মর্নিং ওয়ার্ক বা খেলাধুলার জন্য আসা দর্শনার্থীদের প্রবেশ ফি দিতে হয় না। তবে বিকেল ৩টা থেকে পার্কে প্রবেশের টিকিট মূল্য জনপ্রতি ৫০ টাকা নেওয়া হয়।

আসাদুজ্জামান আরও জানান, শিশু-কিশোরদের জন্য পার্কে ২৪টিরও বেশি রাইড আছে। তবে সবাই উপভোগ করতে পারে এমন কিছু রাইডও আছে। এছাড়া আছে ফুড কোর্ট, বিশ্রামের জন্য বসার জায়গা এবং নদীর তীরের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করার জন্য হাঁটার পথ।

নগর জীবনের ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বিনোদনের সমন্বয়ে এক অনন্য অভিজ্ঞতা দেয় বুড়িগঙ্গা ইকোপার্ক। পার্কটিতে প্রতিদিন গড়ে ১৫০ থেকে ২০০ জন এবং শুক্রবার ছুটির দিনে ২৫০ থেকে ৩০০ জনের মতো দর্শনার্থী আসেন। তবে ঈদের সময় একটু বাড়তি লোকজনের ভিড় থাকে বলে জানান আসাদুজ্জামান।

শেয়ার করুন!