‘এলইডি লাইটের বেচাকেনা অনেক কমে গেছে। অথচ এটি মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস। তারপরও তেমন ক্রেতা নেই। সারাদিনই দোকানে বসে থাকি। কোনো ক্রেতার দেখা পাই না।’
কথাগুলো বলছিলেন নারায়ণগঞ্জ শহরের শহরের ডিআইটি এলাকার বিদ্যুৎ বিতানের ম্যানেজার নুরুল ইসলাম মনা। তবে শুধু তিনি না, তার মতো ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, দাম বেড়ে যাওয়ায় বিক্রিতে ভাটা পড়েছে। বিশেষ করে খুব প্রয়োজন ছাড়া এলইডি লাইট ও ফ্যান কিনছেন না ক্রেতারা।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ পরিচালনা ব্যয় এবং চাহিদার মন্দার কারণে অনেক ব্যবসায়ীরা ব্যবসা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। ক্রেতার সংখ্যা অনেক কমে গেছে। সেই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের আগের তুলনায় অনেক বেশি বিনিয়োগ বেড়েছে। কিন্তু তাদের লাভের পরিমাণ কমে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এলইডি লাইট ও ফ্যানের মূল্য বাড়লেও কমে গেছে ক্রেতা। বেচাবিক্রির অভাবে অলস সময় কাটাচ্ছেন বিক্রেতারা। ক্রেতাদের কেউ কেউ বলছেন, ফ্যান এখন তাদের কাছে ‘বিলাসী’ পণ্য। অনেকের এখন নতুন ফ্যান কেনার সাধ্য নেই। কোনোরকম কম দামের ফ্যান কিনে নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে নিচ্ছেন।
ফতুল্লার বিসিক শিল্প এলাকার একটি গার্মেন্টসে চাকরি করেন পলাশ আহমেদ। আলাপকালে তিনি বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরেই অনেক গরম পড়ছে। বাসায় একটি ফ্যান ছিল, সেটি নষ্ট হয়ে গেছে। কারিগরের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম। তিনি জানান, এই ফ্যান আর চলবে না। কিন্তু এখন ফ্যান কেনার মতো টাকা নেই। আর কয়েকদিন কষ্ট করে পার করেই দেব। শীত চলে আসছে।’
একইভাবে শহরের তল্লা এলাকার বাসিন্দা নাজমুল হাসান বলেন, ‘বর্তমানে এলইডি লাইটের অনেক দাম। সবসময় চেষ্টা করি যত কম দামে লাইট কেনা যায়। অনেক সময় লাইট নষ্ট হয়ে গেলে কারিগরের কাছে নিয়ে যায়। উদ্দেশ্য একটাই—নতুন করে লাইট না কিনে আগেরটা দিয়েই কোনোরকম যেন কাজ চালানো যায়।’
শহরের ডিআইটি এলাকার বিদ্যুৎ বিতানের ম্যানেজার নুরুল ইসলাম মনা। আলাপকালে তিনি বলেন, ‘এলইডি লাইটের বেচাকেনা অনেক কমে গেছে। অথচ এই এলইডি লাইড মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস। তারপরও তেমন ক্রেতা নেই। সারাদিনই দোকানে বসে থাকি। কোনো ক্রেতার দেখা পাই না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সব লাইটেরই দাম বাড়ছে। লাইটপ্রতি ৫০-১০০ টাকা বেড়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে আগের দামই রয়ে গেছে। তারপরও ক্রেতার সংখ্যা কমে গেছে।’
অনেকদিন ধরেই ফ্যানের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মো. রুবেল। তিনি বলেন, ‘আমি অনেকদিন ধরেই এই ব্যবসায় আছি। বিগত ২০ বছর আগে যে ব্যবসা ছিল, এখন আর সেই ব্যবসা নেই। বর্তমানে বেচাকেনার অবস্থা খুবই কম। এর কারণ বর্তমানে মানুষ অর্থনৈতিকভাবে অনেক দুর্বল। মানুষের কর্মসংস্থান কমে গেছে। যে কারণে আমাদের বেচাকেনাও অনেক কম হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে ফ্যানের দাম অনেক বাড়তি। আগে যে ফ্যানটা ১৫০০ টাকা থেকে ১৭০০ টাকার মধ্যে বিক্রি করতাম, এখন সেই ফ্যান দুই হাজার টাকার ওপরে আমাদেরই কিনতে হয়। এভাবে ফ্যানের দাম বাড়লেও মানুষের বাজেট বাড়েনি। সেক্ষেত্রে আমাদের লাভের পরিমাণ কমে গেছে। আগের মতো বিক্রিও আর হয় না।’
তবে নোমান ইলেক্ট্রনিকসের মালিক নোমান ইবনে আহমেদ বলেন, ‘বর্তমানে বেচাকেনা একটু কম যাচ্ছে। তবে একবারে বেচাকেনা হয় না এরকম নয়, তবে আগের তুলনায় কম। যে পরিমাণ বিক্রি হয় তা দিয়ে কোনোরকম চলা যায়।’
ডিআইটি মার্কেট বণিক সমিতির সভাপতি নুর উদ্দিন আহম্মেদ। তার ভাষ্য, সিলিং ফ্যান কিংবা অন্যান্য ফ্যান ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী রাখা হয়। বিগত এক বছর ধরেই বাজার নিম্নমুখী। তারপরও ক্রেতা খুবই কম। এর কারণ সবার সক্ষমতা নেই। নিম্নআয়ের মানুষ বেশি। এজন্য অনেকেই চেষ্টা করে ফ্যান না কিনে কোনোরকম চলে যাওয়ার জন্য।
তিনি বলেন, ‘ফ্যানের মূল্য ধারাবাহিকভাবেই বেড়ে আসছে। যেমন ২০ বছর আগে যে ফ্যানটা ১২০০ টাকা ছিল, সেটা এখন দুই হাজার কিংবা দুই হাজার ২০০ টাকার মধ্যে চলে এসেছে। সে হিসেবে অন্যান্য বছরেরর তুলনায় ফ্যানের দাম এখনো সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে।’
৭-৮ মাস আগে তামার মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রকারভেদে সব ফ্যানেরই ২০০-৩০০ টাকা দাম বেড়েছে বলে জানান এই ব্যবসায়ী।
নুর উদ্দিন বলেন, ‘কোনো কোম্পানিরই দামের ক্ষেত্রে আহামরি পার্থক্য দেখা যায়নি। আর মার্কেটে প্রতিযোগিতা বেশি। ব্যবসায়ী বেড়েছে। সেই সঙ্গে ক্রেতার সংখ্যা কম। ক্রেতারা অনেক বেশি যাচাই-বাছাই করার সুযোগ পান। যে কারণে কোনো পণ্যেই তেমন লাভ করা যায় না। কম লাভেই পণ্য বিক্রি করে দিতে হয়। তবে ফ্যানের মূল্য মানুষের ক্ষয়ক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে।’
নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সহ সভাপতি মোহাম্মদ আবু জাফর বলেন, ‘আসলে ব্যবসা একটা চেইনের মতো। চেইনের যদি এক জায়গায় সমস্যা তাহলে পুরো চেইনেই বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। তেমনি ব্যবসার একটি ক্ষেত্রে যদি সমস্যা থাকে, তাহলে পুরো ব্যবসায়ী মহলে প্রভাব পড়ে। যখনই কোনো একটা সেক্টর খারাপ হবে, এটা সংশ্লিষ্ট সব ব্যবসা খারাপ হবে। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে সব ব্যবসাতেই ক্রান্তিকাল যাচ্ছে।’
বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম চলছে বলে জানান জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নারায়ণগঞ্জ জেলা সহকারী পরিচালক হৃদয় রঞ্জন বনিক।
তিনি বলেন, ‘প্রতিমাসে ১০০-১৫০ অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। ভোক্তাদের প্রতি আমাদের অনুরোধ, কোথাও কেউ যদি প্রতারিত হন অথবা দাম বেশি রাখে, তাহলে আমাদের কাছে যেন লিখিত অভিযোগ করা হয়। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই প্রতিকার পাবেন।’








