সংকটে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংককে ৭ হাজার কোটি টাকা ধার দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। গ্রাহকদের আমানত পরিশোধ করতে ন্যাশনাল ব্যাংককে এ ধার দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
মো. শওকত আলী খান জানান, ৩ মাস মেয়াদী এই ধার বা ঋণের বিপরীতে শতভাগ নিশ্চয়তা (গ্যারান্টি) দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১০ শতাংশ সুদে এই ঋণ দেওয়া হয়েছে এবং এর মধ্যে লেনদেনও সম্পন্ন হয়েছে।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেহেতু গ্যারান্টি দিচ্ছে, সে কারণে আমাদের কোনো ঝুঁকি নেই। যদি ন্যাশনাল ব্যাংক নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংকই আমাদের টাকা ফেরত দেবে।
তিনি আশা প্রকাশ করে জানান, ধারের এই অর্থ ন্যাশনাল ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা ফেরাতে সহায়তা করবে। ন্যাশনাল ব্যাংককে এই অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এটি যেন সঠিক কাজেই ব্যয় হয়, সেটিই জরুরি।
এদিকে, ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবীন জানিয়েছেন, ১৫ অক্টোবর থেকে ব্যাংকটি পুরোপুরি কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মাধ্যমে গ্রাহকেরা তাদের আমানত তুলতে পারবেন। গ্রাহকসেবা স্বাভাবিক করার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ব্যাংকটি এরই মধ্যে আমানত উত্তোলনের আবেদন গ্রহণ শুরু করেছে।
তিনি জানান, মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) পর্যন্ত প্রায় ৭ হাজার গ্রাহক টাকা উত্তোলনের জন্য আবেদন জমা দিয়েছেন।
মেলিতা মেহজাবীন বলেন, আমরা এমনভাবে ব্যবস্থা নিচ্ছি যাতে আগামীকালের (বুধবার) মধ্যেই সব শাখায় পর্যাপ্ত অর্থ পৌঁছে যায়। আশা করছি, পরশু (বৃহস্পতিবার) থেকে আমরা সব গ্রাহককে সেবা দিতে পারবো।
এর আগে ৮ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংককে ঋণ দেবে না। অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে হবে ব্যাংকটিকে। তবে ন্যাশনাল ব্যাংকের এসব ঋণের গ্যারান্টার হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান মেলিতা মেহজাবীন ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল হক সাক্ষাৎ করেন।
সাক্ষাৎকালে আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ উত্তোলনের সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়ে এ নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে জানা যায়।
এসময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান ব্যাংকটির সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন।
তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ায় ব্যাংকটিতে সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। ব্যাংকের দক্ষতা ও কার্যক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে উদ্যোক্তা ব্যবস্থাপনাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানান, সম্প্রতি ন্যাশনাল ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি এবং আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে এসেছে।
এ প্রেক্ষিতে আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ, ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা বজায় রাখা এবং ব্যাংকিং কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, আমানতকারীদের সুরক্ষা দেওয়াই নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল অগ্রাধিকার।
এ এসময় তিনি ন্যাশনাল ব্যাংককে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেন, যেন গ্রাহকরা সব শাখা ও এটিএম বুথ থেকে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী টাকা তুলতে পারেন।
বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, কোনো অবস্থাতেই গ্রাহকদের ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। ১৫ অক্টোবর থেকে তারা তাদের টাকা ফেরত পাবেন। এ বিষয়ে ব্যাংকটিকে প্রয়োজনীয় তারল্য সহায়তা দেওয়া হবে।
২০২২ সাল থেকে ৪ বছরে ন্যাশনাল ব্যাংক প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা লোকসান করেছে। ব্যাংকটির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তাদের লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকার তুলনায় ৪১ শতাংশ বেশি।
২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ব্যাংকটির মোট ঋণের ৫৯ দশমিক ৬৯ শতাংশই ছিল খেলাপি।
বিগত মাসে ৪ জন আমানতকারী তাদের জমানো টাকা ফিরে পেতে হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে, সর্বশেষ এই তারল্য সহায়তার বিষয়টি সামনে আসে।
দেশের অন্যতম পুরনো বেসরকারি ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংক অনেকদিন ধরেই তহবিল সংকট ও উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণে রয়েছে। এই সংকটের কারণে বিগত কয়েক বছর ধরেই তারা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জামানতবিহীন তারল্য সহায়তা নিয়ে আসছিল।








