১০ বছরে সাড়ে ৪ হাজারেরও বেশি শিশু অভিবাসীর মৃত্যু

17 October, 2026

প্রকাশের সময়: 11:57 am, 17th Oct, 2026

সর্বশেষ আপডেট: 11:59 am, 17th Oct, 2026

অভিবাসী শিশু, ছবি- সংগৃহীত

উন্নত জীবন ও নিরাপত্তার আশায় ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে অভিবাসনের চেষ্টাকালে এক দশকে বিশ্বজুড়ে সাড়ে ৪ হাজারেরও বেশি শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর সর্বশেষ এক প্রতিবেদনে এ উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করা হয়।

সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, নিখোঁজ ও নথিপত্রহীন ঘটনার কারণে শিশু মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা এই তালিকার চেয়ে আরো অনেক বেশি হতে পারে।

আইওএম-এর ‘মিসিং মাইডেলিকেট গ্রেন্টস প্রজেক্ট’ (নিখোঁজ অভিবাসী প্রকল্প)-এর বরাত দিয়ে প্রাপ্ত প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০১৪ সাল থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন অভিবাসন রুটে কমপক্ষে ৪ হাজার ৪শ ১৪ শিশু-অভিবাসীর মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ, মরুভূমির চরম আবহাওয়া এবং মানব পাচারকারীদের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে প্রতি বছর শত শত শিশু প্রাণ হারাচ্ছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক রুট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ভূমধ্যসাগর।

শুধুমাত্র এই রুট পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার পথেই অর্ধেকেরও বেশি শিশুর সলিল সমাধি ঘটেছে। মৃত ও নিখোঁজ শিশুদের একটি বড় অংশই সাবসাহারা আফ্রিকা, যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নাগরিক।

আইওএম এবং জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ যৌথ বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে, উদ্ধার করা মরদেহ বা ডুবে যাওয়া নৌকার আরোহীদের অর্ধেকেরও বেশি ক্ষেত্রে বয়স বা সঠিক পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। ফলে, নথিবদ্ধ তথ্যের বাইরে হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

আইওএম-এর মহাপরিচালক বলেন, আইনি ও নিরাপদ অভিবাসন পথের অভাবই শিশুদের এই চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্রতিটি শিশুমৃত্যু বিশ্ব নেতাদের জন্য একটি জরুরি সতর্কবার্তা।

সংস্থাটি বিশ্বজুড়ে মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনপদের শিশুদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবিলম্বে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

রুটভিত্তিক শিশু মৃত্যুর ভয়াবহ পরিসংখ্যান

ভূমধ্যসাগরীয় রুট

উত্তর আফ্রিকা থেকে সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার এই রুটটি শিশুদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রমাণিত হয়েছে। মোট শিশু মৃত্যুর অর্ধেকেরও বেশি (২,০০০-এর বেশি শিশু) এই রুটে সাগরে ডুবে মারা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্ত এবং আমেরিকা অঞ্চল

ল্যাটিন আমেরিকা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টাকালে মরুভূমির চরম আবহাওয়া ও নদীতে ডুবে কমপক্ষে ৮শ ৫০ শিশুর মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে।

আফ্রিকা মহাদেশীয় রুট

সাহারা মরুভূমি ও হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলের দুর্গম পথ পাড়ি দিতে গিয়ে আরো শত শত শিশু পানিশূন্যতা ও তীব্র গরমে প্রাণ হারিয়েছে।

লিঙ্গ ও বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণ

আইওএম জানায়, মৃত শিশুদের মধ্যে যাদের বয়স চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে, তাদের শতাধিক শিশুর বয়স ৫ বছরের কম ছিল। এ ছাড়া মোট মৃত্যুর মধ্যে মেয়েশিশুদের তুলনায় ছেলেশিশুদের মৃত্যুর হার কিছুটা বেশি (প্রায় ৬০ শতাংশ)। তবে অর্ধেকেরও বেশি ক্ষেত্রে (প্রায় ৫২ শতাংশ মরদেহ) বয়স বা লিঙ্গ কোনোটিই সঠিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

মৃত্যুর প্রধান কারণ

নৌকাডুবি ও সলিলসমাধি

অনিরাপদ ও ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই প্লাস্টিক বা কাঠের নৌকা উল্টে যাওয়া।

চরম আবহাওয়া

মরুভূমিতে তীব্র তাপপ্রবাহ, পানিশূন্যতা এবং অনাহার।

পাচারকারীদের সহিংসতা

মানব পাচারকারী ও দালাল চক্রের হাতে শারীরিক নির্যাতন এবং ঝুঁকিপূর্ণ পথে জোর করে ঠেলে দেওয়া।

আন্তর্জাতিক সংস্থার জরুরি আহ্বান

আইওএম এবং ইউনিসেফ এক যৌথ বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, আইনি ও নিরাপদ অভিবাসন পথের অনুপস্থিতির কারণেই অভিভাবকেরা শিশুদের নিয়ে এই চরম আত্মঘাতী পথ বেছে নিচ্ছেন।

সংস্থা দুটি বিশ্বনেতাদের প্রতি ঝুঁকিপূর্ণ জনপদের শিশুদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সীমানাগুলোতে উদ্ধার তৎপরতা জোরদার এবং মানব পাচারকারী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।

প্রতিবেদনের মূল বিবরণ ও পরিসংখ্যান

৮১ হাজারের মধ্যে অর্ধেকেরই বয়স অজানা

বিগত এক যুগে বিশ্বজুড়ে সব মিলিয়ে প্রায় ৮১ হাজার অভিবাসীর মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা রেকর্ড করেছে আইওএম।

তবে এর মধ্যে ৪৪ হাজার ৮শ ৬২টি ক্ষেত্রে (৫৫.৫ শতাংশ) মৃত বা নিখোঁজ ব্যক্তির বয়স বা বয়সভিত্তিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে, এই বিশাল সংখ্যার ভেতরে আরো কত শত শিশু যে হারিয়ে গেছে, তা অজানা রয়ে গেছে।

অদৃশ্য মৃত্যু

প্রতিবেদনে উদাহরণ দিয়ে বলা হয়, ২০২৪ সালে সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় রুট দিয়ে ইতালি ও মাল্টায় পৌঁছানো মোট অভিবাসীর ১৯ শতাংশই ছিল শিশু। অথচ ওই রুটে রেকর্ড করা মোট মৃত্যুর মাত্র ২ শতাংশ শিশু হিসেবে নথিবদ্ধ হয়েছে।

এটি প্রমাণ করে যে, সমুদ্রের তলদেশে হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য শিশুর মৃত্যু নথির বাইরে ও সম্পূর্ণ অদৃশ্য থেকে যাচ্ছে।

তথ্যের উৎসের সীমাবদ্ধতা

আইওএম জানিয়েছে, মেডিকেল এক্সামিনার এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মতো অফিশিয়াল সরকারি উৎস থেকে মাত্র ১৮ শতাংশ শিশু মৃত্যুর নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়। বাকি সিংহভাগ তথ্যই আসে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা, সংবাদমাধ্যম এবং বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য থেকে।

এ বিষয়ে আইওএম-এর ডাটা ও পলিসি বিভাগের প্রধান স্টুয়ার্ট ক্যাম্পো বলেন, অভিবাসন যাত্রায় প্রাণ হারানো প্রতিটি শিশুর হিসাব পাওয়ার অধিকার রয়েছে, অথচ তথ্যের অভাবে অনেকেই এই তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে। আমরা যদি বিপদকে চোখেই না দেখি, তবে শিশুদের সুরক্ষাও দিতে পারবো না।

আন্তর্জাতিক ডাটা অ্যালায়েন্স ফর চিলড্রেন অন দ্য মুভ (আইডিএসি) এবং ইউনিসেফের যৌথ সহায়তায় প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বিশ্বনেতাদের প্রতি সীমান্তে মৃতদের বয়স ও অভিবাসন স্ট্যাটাস সঠিকভাবে নথিবদ্ধ করার এবং বিভিন্ন দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান বৃদ্ধির জন্য জরুরি আহ্বান জানানো হয়েছে।

শেয়ার করুন!