দাহ্য পদার্থ কী, আগুন দ্রুত ছড়ায় যেভাবে

17 October, 2026

প্রকাশের সময়: 06:56 pm, 17th Oct, 2026

সর্বশেষ আপডেট: 06:56 pm, 17th Oct, 2026

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকত এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লেগে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তিনতলা কাঠের স্থাপনাটিতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটি অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা সনদও ছিল না। এ ঘটনা পর্যটনকেন্দ্রের রিসোর্টসহ বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে।
কাঠ, বাঁশ, খড়ের মতো উপকরণ দিয়ে দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় তৈরি হচ্ছে ইকো রিসোর্ট। প্রাকৃতিক উপকরণে তৈরি এসব স্থাপনা পরিবেশবান্ধব হলেও অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। শুধু স্থাপনার কাঠামো নয়, ঘরের ভেতরে ব্যবহৃত আসবাব, পর্দা, কার্পেট এবং অন্দরসজ্জার উপকরণও আগুন ছড়িয়ে পড়ার কারণ হতে পারে।


দাহ্য পদার্থ কী

যেসব পদার্থ আগুনের সংস্পর্শে এলে জ্বলতে পারে, সেগুলোকে দাহ্য পদার্থ বলা হয়। কাঠ, কাগজ, কাপড়, শুকনা পাতা, খড়, প্লাস্টিক ও ফোমের মতো উপকরণ এর উদাহরণ। পেট্রল, কেরোসিন, অ্যালকোহল এবং কিছু রাসায়নিক পদার্থও দাহ্য। তবে সব দাহ্য পদার্থের বৈশিষ্ট্য এক নয়। কোনোটিতে সহজে আগুন ধরে, কোনোটি ধীরে জ্বলে, আবার কোনোটি আগুনের তীব্রতা বাড়াতে পারে।
আগুন জ্বলতে সাধারণত তিনটি উপাদান প্রয়োজন—জ্বালানি, অক্সিজেন ও তাপ। কোনো স্থাপনায় দাহ্য উপকরণ বেশি থাকলে আগুন এক বস্তু থেকে অন্য বস্তুতে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ বাড়ে। তাপের বিকিরণ, গরম ধোঁয়া ও আগুনের শিখার মাধ্যমে আশপাশের উপকরণ উত্তপ্ত হয়ে জ্বলতে শুরু করতে পারে।


কাঠ, বাঁশ ও খড়ের স্থাপনায় ঝুঁকি কোথায়?

কাঠ ও বাঁশ নির্মাণকাজে বহুল ব্যবহৃত উপকরণ। এগুলো যথাযথভাবে নকশা ও অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা রেখে ব্যবহার করা সম্ভব। কিন্তু কাঠের দেয়াল, বাঁশের বেড়া, খড়ের ছাউনি এবং অন্যান্য দাহ্য উপকরণ কাছাকাছি থাকলে আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। কাঠের তৈরি ভবনে অগ্নিপ্রতিরোধী ব্যবস্থা না থাকলে আগুনের তাপে কাঠ জ্বলতে শুরু করে এবং শিখা দ্রুত অন্য অংশে পৌঁছাতে পারে।


পর্দা, কার্পেট ও ফোমেও বাড়ে ঝুঁকি

ঘরের অন্দরসজ্জায় ব্যবহৃত অনেক উপকরণই দাহ্য। সিনথেটিক পর্দা, কার্পেট, সোফার ফোম, গদি, বিছানার চাদর এবং প্লাস্টিকের সাজসজ্জার সামগ্রী আগুনের সংস্পর্শে এলে জ্বলে ওঠে। পর্দা বা ঝুলন্ত কাপড়ে আগুন লাগলে শিখা ওপরের দিকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে আগুন সিলিং বা আশপাশের আসবাবে পৌঁছাতে পারে।
ফোম ও কিছু সিনথেটিক উপকরণ পুড়লে ঘন ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয়। আগুনের ঘটনায় অনেক সময় শিখার পাশাপাশি ধোঁয়াও প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। ধোঁয়ায় দৃষ্টিসীমা কমে যায়, শ্বাস নিতে সমস্যা হয় এবং নিরাপদে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।


সিলিং ও দেয়ালের উপকরণ কেমন হওয়া দরকার

অন্দরসজ্জায় কাঠের প্যানেল, বোর্ড, প্লাস্টিকের আবরণ এবং অন্যান্য উপকরণ ব্যবহারের আগে সেগুলোর অগ্নিপ্রতিরোধী বৈশিষ্ট্য যাচাই করা জরুরি। সব ধরনের বোর্ড বা সিলিং উপকরণ সমান ঝুঁকিপূর্ণ নয়। কোনো উপকরণ আগুনের সংস্পর্শে কেমন আচরণ করে, তা নির্ভর করে তার উপাদান, নির্মাণপদ্ধতি ও অগ্নিপরীক্ষার ফলের ওপর।
বিশেষ করে সিলিংয়ের ভেতরে আগুন বা ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে তা বাইরে থেকে সঙ্গে সঙ্গে বোঝা না–ও যেতে পারে। সিলিংয়ের ফাঁকা অংশ, দেয়ালের গোপন জায়গা কিংবা বিভিন্ন পাইপ ও তারের চলাচলের ফাঁক দিয়ে আগুন এক অংশ থেকে অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণে ভবনের নকশা ও নির্মাণে আগুন ও ধোঁয়া প্রতিরোধের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।


অগ্নিনিরাপত্তায় যা জরুরি

রিসোর্ট, হোটেল, রেস্তোরাঁ কিংবা বাড়ি—সব ধরনের স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তাকে নির্মাণ ও পরিচালনার অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। শুধু অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। স্থাপনার ধরন ও আয়তন অনুযায়ী অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা, ধোঁয়া শনাক্তকারী অ্যালার্ম, অগ্নিসংকেত, জরুরি বহির্গমনপথ এবং প্রয়োজনীয় পানির সংযোগসহ অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
পাশাপাশি বৈদ্যুতিক সংযোগ ও রান্নাঘরের সরঞ্জাম নিয়মিত পরীক্ষা করা, দাহ্য উপকরণ নিরাপদে রাখা এবং কর্মীদের অগ্নিনিরাপত্তার প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। অতিথিদেরও জানাতে হবে, আগুন লাগলে কোন পথে বের হতে হবে।
অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতে ভবন নির্মাণের সময়ই অগ্নিনিরাপত্তার পরিকল্পনা করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে আইনগত বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। বিশেষ করে পর্যটন রিসোর্টে অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের। নান্দনিক নকশা বা প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহার যেন নিরাপত্তার বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়।
সূত্র: ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স

শেয়ার করুন!