রফতানি বহুমুখীকরণে ইসিফরজে প্রকল্প: ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান

30 July, 2026

প্রকাশের সময়: 08:49 am, 30th Jul, 2026

সর্বশেষ আপডেট: 08:49 am, 30th Jul, 2026

তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে রফতানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্য নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ‘এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস (ইসিফরজে)’ প্রকল্প দেশের অন্যতম সফল শিল্পোন্নয়ন উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।

প্রকল্পটির মাধ্যমে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা, প্লাস্টিক এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একইসঙ্গে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন ও শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) অর্থায়নে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০১৭ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পটি চালু করে।

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে লফতানি বহুমুখীকরণকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়।

প্রকল্প শুরুর সময় দেশের মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসতো তৈরি পোশাক খাত থেকে, যা অর্থনীতিকে একটি নির্দিষ্ট খাতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল করে তুলেছিল।

এ প্রেক্ষাপটে সম্ভাবনাময় ৪টি উৎপাদন খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং নতুন রফতানি বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্যেই ইসিফরজে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ আব্দুর রহমান বলেন, প্রকল্পটি প্রায় সব প্রধান কর্মসম্পাদন সূচকেই নির্ধারিত লক্ষ্য ছাড়িয়ে গেছে এবং দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য একটি টেকসই ভিত্তি তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, প্রকল্পের উদ্দেশ্য শুধু রফতানি বৃদ্ধিই নয়, বরং বাংলাদেশি শিল্পকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। প্রকল্পের ফলাফল প্রমাণ করে, রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দিলে শিল্পখাতের রূপান্তর উল্লেখযোগ্যভাবে ত্বরান্বিত করা সম্ভব।

আব্দুর রহমান বলেন, প্রকল্পের সবচেয়ে কার্যকর উদ্যোগ ছিল ‘এক্সপোর্ট রেডিনেস ফান্ড (ইআরএফ)’। এই ম্যাচিং গ্র্যান্ট কর্মসূচির আওতায় নারী উদ্যোক্তাপ্রতিষ্ঠানসহ ৫শ ৭০টি প্রতিষ্ঠান আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা পেয়েছে। এসব সহায়তার মাধ্যমে পরিবেশ, সামাজিক ও গুণগত মান (ইএসকিউ) সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ, দক্ষতা উন্নয়ন, উৎপাদনব্যবস্থা আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক সনদ অর্জন এবং নতুন বিদেশি বাজারে প্রবেশে প্রতিষ্ঠানগুলো সক্ষমতা অর্জন করেছে।

প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, উপকারভোগী প্রতিষ্ঠানগুলো ২শ ৬০টি আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স সনদ অর্জন করেছে। একইসঙ্গে ইআরএফের মাধ্যমে বেসরকারি খাত থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি সহ-অর্থায়ন (কো-ইনভেস্টমেন্ট) এসেছে, যা সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি অতিরিক্ত বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করেছে।

প্রকল্পের আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি ৫৯ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে প্রকল্পের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। একইসঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠান ২২টি নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করেছে।

প্রকল্প শুরুর আগে উপকারভোগী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রফতানিকারকের হার ছিল ৫৯ শতাংশ, যা বেড়ে ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একইসময়ে তাদের গড় রফতানির পরিমাণ বেড়েছে ১শ ৯২ শতাংশ।

এছাড়া ৭৩টি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানকে ১৪টি আন্তর্জাতিক সোর্সিং প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে নতুন ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব ও রফতানির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

শুধু আর্থিক সহায়তাই নয়, শিল্প অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়নেও বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে ইসিফরজে প্রকল্প। এর আওতায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লাস্টিকস ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (বিআইপিইটি) পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং বর্তমানে শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

এছাড়া গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বাংলাদেশ হাইটেক সিটিতে সেন্টার অব এক্সেলেন্স ফর ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (সিইইটি) এবং গাজীপুরের কাশিমপুরে ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজি সেন্টার ফর লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার (ডিটিসিএলএফ)-এর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।

ভবিষ্যত শিল্পায়নের ভিত্তি আরো শক্তিশালী করতে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে বিসিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে প্রস্তাবিত ইনস্টিটিউট অব জেনারেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (আইজিইটি) এবং চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (এনএসইজেড) প্রস্তাবিত ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব জেনারেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (আইআইজিইটি)-এর জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও সাইট উন্নয়নকাজও সম্পন্ন হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান রফতানিমুখী শিল্পের জন্য উন্নত প্রযুক্তিসেবা, পণ্য উন্নয়ন, পরীক্ষাগার সুবিধা এবং দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং কমপ্লায়েন্সবিষয়ক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রকল্পটি সরাসরি ১ লাখ ৭ হাজারের বেশি মানুষকে উপকৃত করেছে। তাদের মধ্যে ৩৮ শতাংশই নারী।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, সামগ্রিকভাবে এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন ও শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যা প্রকল্পের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ৬০ হাজারের প্রায় ৩ গুণ।

বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে আব্দুর রহমান বলেন, রফতানি বহুমুখীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকার ও বেসরকারি খাতের সফল অংশীদারত্বের একটি উদাহরণ হিসেবে ইসিফরজে প্রকল্পকে উল্লেখ করেছে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাটি।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রকল্পের আওতাভুক্ত তৈরি পোশাকবহির্ভূত খাতগুলোর রফতানি প্রায় ৮৩ শতাংশ বেড়েছে, যা প্রকল্পের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রাকে উল্লেখযোগ্যভাবে ছাড়িয়ে গেছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, প্রকল্পটির অন্যতম উদ্ভাবনী দিক ছিল অনুদান ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। আন্তর্জাতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত একটি স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের সংস্থা উপকারভোগী প্রতিষ্ঠান নির্বাচন, প্রকল্প বাস্তবায়ন তদারকি এবং নির্ধারিত অগ্রগতি যাচাইয়ের ভিত্তিতে অর্থ ছাড়ের কাজ পরিচালনা করেছে। এতে একদিকে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়েছে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগও উৎসাহিত হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক বলেছে, আর্থিক প্রণোদনার পাশাপাশি কারিগরি সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালনা করলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই বৈশ্বিক মানদণ্ড পূরণে সক্ষম হয়। ইসিফরজে প্রকল্পের সাফল্য তারই প্রমাণ।

শেয়ার করুন!