‘গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন নয়, নতুন করে চুক্তি বাস্তবায়ন চায় বাংলাদেশ, যেখানে থাকবে গ্যারান্টি ক্লজ, রক্ষা হবে দেশের স্বার্থ’ বলে মন্তব্য করেছেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি।
তিনি বলেন, চলতি (২০২৬) বছরে শেষ হচ্ছে এই নদীর পানিবন্টন নিয়ে দুই দেশের চুক্তি। এরপর চুক্তিটি নবায়ন হবে নাকি নতুন করে চুক্তি হবে, সেই প্রশ্ন বাংলাদেশে উঠছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর গুলশান-তেজগাঁও লিঙ্ক রোডের আলোকি কনভেনশন সেন্টারে ‘কল্লোলিনী: এ রিভার ডায়লগ ২০২৬’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের জাতীয় সংলাপের উদ্বোধনী অধিবেশন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পানিসম্পদমন্ত্রী এ সব কথা বলেন।
বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে টিম ইউরোপ ইনিশিয়েটিভ অন ক্লাইমেট অ্যান্ড এনার্জি এই জাতীয় সংলাপের আয়োজন করে। এর আয়োজক হিসেবে ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এজেন্স ফ্রঁসেজ দ্য ডেভেলপমেন্ট (এএফডি), নেদারল্যান্ডস দূতাবাস, জিআইজেড এবং বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ড দূতাবাস। সমন্বয়ে ছিল- রেড অরেঞ্জ লিমিটেড ও ডেল্টারেস।
পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি নদী। কিন্তু শিল্পায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব নদীর ওপর পড়ছে। দূষণের মূল কারণ বের করা উচিত।
তিনি বলেন, ঢাকা মহানগরীতে প্রতিদিন ৩ হাজার ৯শ মিলিয়ন লিটার পানির বর্জ্য তৈরি হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ৫শ মিলিয়ন লিটার বর্জ্য নদীতে যায়। এর ফলে বছরে বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
গঙ্গার পানিবণ্টন প্রসঙ্গে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, শীত বা শুকনো মৌসুম বা বর্ষা মৌসুমে কী ধরনের হবে, সেখানে কোন সময় কতটা পানির প্রয়োজন, সেটার একটা হিসাব রয়েছে।
সে হিসাব অনুযায়ী, এখানে একটা গ্যারান্টি ক্লজ ইনক্লুড করা হয়। প্রাপ্যতার ভিত্তিতে আমি যেন সঠিক সময়ে সঠিক পানিটা পাই, সেটা হলো আমাদের সবচেয়ে বড় কাজ এবং গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, শুষ্ক মৌসুমে পানি না থাকলে এবং গ্যারান্টি ক্লজ যুক্ত না হলে অনেক ভোগান্তি হবে। এটা একটা মরুভূমি হয়ে যাবে। কৃষিকাজ ও মাছের উৎপাদন ব্যাহত হবে।
সর্বোপরি, একটা অর্থনৈতিক যে রূপান্তর, সেই রূপান্তর থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বো এবং সাধারণ মানুষ সুবিধা পাবে না; যা দেশের জন্য সবচেয়ে বড় ধরনের ক্ষতি হবে। বর্ষা মৌসুমে পানির ঢলে বন্যা বা অতি প্লাবনেও আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবো।
সংলাপের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, নদী আমাদের জন্য অর্থনীতির মেরুদণ্ড। পরিবর্তন এবং প্রাণের কারণে নদীর ওপর অনেক চাপ পড়ছে। দেশের নদনদীগুলোকে রক্ষার জন্য সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। নদীর দূষণ রোধসহ নদী রক্ষায় পলিসি বের করতে হবে।
তিনি বলেন, বুড়িগঙ্গা নদীকে দূষণমুক্ত রাখা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। এ বিষয়ে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে।
বাংলাদেশের নদ-নদীর ভবিষ্যত বিশেষ করে শহরের নদীগুলোর বর্তমান অবস্থা ও সুরক্ষায় করণীয় নিয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংলাপের এবারের প্রতিপাদ্য ছিল- ‘নদীকে জানি, সিদ্ধান্ত নিই একসঙ্গে’।
এই জাতীয় সংলাপে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, বিশেষজ্ঞ, গবেষক, নাগরিক সমাজ, বেসরকারি খাত, নদী-নির্ভর জনগোষ্ঠী ও তরুণদের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
দিনব্যাপী আয়োজনে নদী ব্যবস্থাপনা ও আইনি সুরক্ষা, বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ ও জবাবদিহি, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও তরুণদের অংশগ্রহণ এবং ধারাবাহিক সংলাপ, জ্ঞান বিনিময় ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ- এই ৪টি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
‘কোথায় আছি, কোথায় যেতে চাই’ শীর্ষক উদ্বোধনী অধিবেশনে ‘BURIGANGA: Forgotten River Mother’ চলচ্চিত্রের ট্রেলার প্রদর্শন করা হয়।
নদী ও জলবায়ুবিশেষজ্ঞ এবং রেড অরেঞ্জের সিনিয়র উপদেষ্টা মালিক ফিদা এ. খান সংলাপের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন।
রেড অরেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অর্ণব চক্রবর্তীর সঞ্চালনায় উদ্বোধনী অধিবেশনে আরো বক্তব্য রাখেন- এএফডি বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সিনথিয়া মেলা, বাংলাদেশে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ডেলিগেশনের হেড অব ডেভেলপমেন্ট ড. মিশাল ক্রেইজা, ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যাঁ-মার্ক সেরে-শার্লে, নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত ইয়োরিস ভ্যান বোমেল, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কান্ট্রি ডিরেক্টর ছিংফেং ঝাং, দৃকের পরিচালক তাপস পাল, রিভারাইন পিপলের প্রতিনিধি মাহবুবা রহমান প্রমুখ।
পরে ‘বিনিয়োগ থেকে প্রভাব: নদীর জন্য দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতা’ শীর্ষক দ্বিতীয় অধিবেশনে বিদ্যমান নীতি, পরিকল্পনা ও উদ্যোগকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদী ফলাফলে রূপ দেওয়া যায়, সে বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
নদী নিয়ে নীতিগত আলোচনার পাশাপাশি সৃজনশীল ও অংশগ্রহণমূলক বিভিন্ন আয়োজন ছিল- কল্লোলিনীতে।
এতে পুরস্কারপ্রাপ্ত আলোকচিত্রী আবির আবদুল্লাহর নদীবিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনী, দৃক গ্যালারি ও শূন্য আর্ট স্পেসের শিল্পকর্ম প্রদর্শনী, পোস্টার উপস্থাপনা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্টল এবং ফ্রেন্ডশিপ এনজিও’র পরিবেশনায় বিষয়ভিত্তিক নাটক মঞ্চস্থ হয়।








