আকাশছোঁয়া সোনার দামে মধ্যবিত্তের স্বপ্নে ভাটা

01 November, 2026

প্রকাশের সময়: 09:48 pm, 1st Nov, 2026

সর্বশেষ আপডেট: 09:48 pm, 1st Nov, 2026

নিজের কিংবা প্রিয়জনের জন্য একজোড়া কানের দুল, একটি আংটি কিংবা ছোট্ট একটি সোনার চেইন কেনার শখ থাকে অনেকেরই। বিয়ে, জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী কিংবা ঈদ-পূজার মতো বিশেষ উপলক্ষে সোনার গহনা উপহার দেওয়ার ইচ্ছাও থাকে। কিন্তু সোনার লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে মধ্যবিত্তের সেই শখ এখন অনেকের কাছেই বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে।

সাধ আছে, কিন্তু সাধ্য নেই। ফলে অনেকের ক্ষেত্রে অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে সোনার গহনা কেনার দীর্ঘদিনের ইচ্ছা। তাদের কারও কারও মাঝে তৈরি হচ্ছে হতাশা, কারও মাঝে অভিমান, আবার কোনো কোনো পরিবারে সোনার গহনা কেনাকে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দেখা দিচ্ছে মনোমালিন্য। যা কখনো কখনো ঝগড়ায় গড়াচ্ছে।

মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে সোনার গহনা কেবল সাজসজ্জার উপকরণ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আবেগ, সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক ঐতিহ্য ও ভবিষ্যতের সঞ্চয়ের ধারণা। বিয়েতে কনেকে গহনা দেওয়া কিংবা বিশেষ দিনে স্ত্রীকে একটি গহনা উপহার দেওয়ার রীতি বহু পরিবারে প্রচলিত। কিন্তু বাসাভাড়া, খাবার, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচ মেটাতেই যখন আয়ের বড় অংশ শেষ হয়ে যায়, তখন সোনার গহনা কেনার জন্য আলাদা অর্থ জমানো কঠিন হয়ে পড়ে।

একসময় দেশের সোনার গহনার বাজারে মধ্যবিত্ত শ্রেণিই ছিল অন্যতম বড় ক্রেতা। বেতনের টাকা, ঈদের বোনাস কিংবা কয়েক মাসের সঞ্চয় দিয়ে অনেকে ছোটখাটো গহনা কিনতেন। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। গহনার দোকানে গিয়ে পছন্দের নকশা দেখে দাম জানতে চাওয়ার পর অনেককেই শেষ পর্যন্ত খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। কারও অপূর্ণ থাকছে বহুদিনের শখ, কেউ আবার সেই শখ পূরণ করতে গিয়ে ঋণের বোঝা কাঁধে নিচ্ছেন।

যে গহনা একসময় ছিল ভালোবাসার উপহার, পারিবারিক ঐতিহ্য কিংবা ভবিষ্যতের সঞ্চয়, তা এখন অনেক পরিবারের কাছে হয়ে উঠেছে সামর্থ্যের বাইরে থাকা একটি স্বপ্ন। তবে এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় সংকট শুধু গহনা কিনতে না পারা নয়, বরং একটি ছোট শখ ঘিরে তৈরি হওয়া মানসিক চাপ ও সম্পর্কের টানাপোড়েন। সংসারের সীমিত আয়ের মধ্যে ভালোবাসা, দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত ইচ্ছার ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় চ্যালেঞ্জ।

একসময় যে সোনার চেইন ছিল বোনাসের টাকায় কেনা ভালোবাসার উপহার, এখন সেই চেইনের দাম শুনেই অনেককে ফিরে আসতে হচ্ছে। দোকানের কাচের ভেতর সাজানো গহনার দিকে তাকিয়ে হয়তো তারা মনে মনে হিসাব করছেন- কত মাসের সঞ্চয়ে পূরণ হবে শখটি? কিন্তু হিসাব মেলে না। সোনার দাম আর আয়ের ব্যবধানের এই বাস্তবতায় মধ্যবিত্তের সোনার স্বপ্ন ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। আর সেই স্বপ্নের সঙ্গে জমছে অভিমান, হতাশা ও নীরব অশান্তি।


শখের গহনা ঘিরে অভিমান

রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মার্কেটে সোনার চেইন কিনতে এসেছিলেন গৃহিণী পারভীনা আক্তার। কয়েক মাস ধরে টাকা জমিয়ে রেখেছেন একটি চেইন কেনার জন্য। কিন্তু দোকানে গিয়ে দাম ও পছন্দের চেইনের ওজন হিসাব করে তার মনে হয়েছে, আপাতত শখটি পূরণ হচ্ছে না।

পারভীনা আক্তার বলেন, অনেক দিন ধরে একটি সোনার চেইন কেনার ইচ্ছা। স্বামীকে বলেছিলাম, একটু একটু করে টাকা জমিয়ে কিনবো। কয়েক মাসে ৫০ হাজার টাকা জমিয়েছি। কিন্তু কয়েকটি দোকানে গিয়ে দাম শুনে ও চেইনের আকার দেখে মনে হচ্ছে, এই শখ হয়তো আপাতত পূরণ হবে না।

তিনি বলেন, শখ পূরণ না হওয়ায় কিছুদিন আগে স্বামীর সঙ্গে কিছুটা মান-অভিমানও হয়েছিল। মনে করেছিলাম, স্বামী হয়তো কিনে দিতে চান না, এজন্য নানান অজুহাত দেখাচ্ছেন। এ নিয়ে তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহারও করেছি। কিন্তু চেইন কিনতে এসে বুঝতে পারছি, আমাদের মতো মানুষের জন্য সোনার গহনা এখন সত্যিই বিলাসী পণ্যে পরিণত হয়েছে। আগে স্বামীর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি বলে এখন নিজের কাছেই খারাপ লাগছে।

পারভীনার অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। অনেক পরিবারেই সোনার গহনা কেনার ইচ্ছা পূরণ না হওয়ায় তৈরি হচ্ছে অভিমান। স্ত্রী হয়তো ভাবছেন, স্বামী তার শখকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। অন্যদিকে, স্বামী সংসারের খরচ, ঋণের কিস্তি কিংবা সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে গহনা কেনার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা আর প্রত্যাশার ব্যবধান থেকে তৈরি হচ্ছে ভুল-বোঝাবুঝি।

বেসরকারি চাকরিজীবী অজিত কুমার বলেন, স্ত্রীকে গহনা কিনে দেওয়ার ইচ্ছা আমারও রয়েছে। কিন্তু বেতন থেকে বাসাভাড়া, বাজার, সন্তানের পড়াশোনা ও অন্যান্য খরচ দেওয়ার পর হাতে খুব বেশি টাকা থাকে না। গহনা কিনতে গেলে সংসারের অন্য খরচে টান পড়বে। বিষয়টি বোঝাতে গেলেও কখনো কখনো মনোমালিন্য হয়। আমিও চাই স্ত্রীর শখ পূরণ করতে, কিন্তু সবসময় তা সম্ভব হয় না।

তিনি বলেন, কিছুদিন আগে ঋণ করে স্ত্রীকে একটি সোনার চেইন কিনে দিয়েছি। স্ত্রী মন খারাপ করে থাকলে বা খারাপ ব্যবহার করলে নিজের কাছেও ভালো লাগে না। বিয়ের সময়ও তাকে তেমন গহনা দিতে পারিনি। অফিসের কাজের চাপের পর বাসায় ফিরেও অশান্তি থাকলে ভালো লাগে না। তাই কষ্ট হলেও ঋণ করে স্ত্রীর শখ পূরণের চেষ্টা করেছি।

দাম বেড়েছে ৩১ গুণের বেশি

সোনার বাজারের গত কয়েক দশকের হিসাব দেখলেই পরিবর্তনের মাত্রা বোঝা যায়। ২০০০ সালে ভালো মানের এক ভরি সোনার দাম ছিল প্রায় ৬ হাজার ৯০০ টাকা। ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪২ হাজার ১৬৫ টাকা। ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো ভরিপ্রতি দাম ৫০ হাজার টাকা ছাড়ায়। এরপর ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ১ লাখ টাকা, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেড় লাখ টাকা এবং একই বছরের ৭ অক্টোবর ২ লাখ টাকা অতিক্রম করে।

দাম বাড়ার এই ধারা থেমে থাকেনি। ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি ভালো মানের সোনার দাম ভরিপ্রতি সর্বোচ্চ ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকায় পৌঁছায়। পরে কয়েক দফা ওঠানামার পর বর্তমানে (১ নভেম্বর) দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৭ হাজার ৫৯২ টাকা। অর্থাৎ, ২০০০ সালের তুলনায় এখন এক ভরি সোনার দাম ৩১ গুণেরও বেশি।

ফলে একসময় যে অর্থ দিয়ে একটি পরিবার সোনার গহনা কেনার কথা ভাবতে পারতো, এখন সেই অর্থ দিয়ে সামান্য গহনাও কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সোনার দাম সামলানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


আয় বাড়লেও সংসারে থাকছে না সঞ্চয়

মধ্যবিত্ত পরিবারের আর্থিক চাপের চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জীবনযাত্রার মান জরিপেও। ২০২৫ সালের লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে অনুযায়ী, দেশে একটি পরিবারের মাসিক গড় আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা। বিপরীতে মাসিক গড় ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। অর্থাৎ, একটি পরিবারকে প্রতি মাসে গড়ে আয়ের চেয়ে ১ হাজার ৭৯৮ টাকা বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। বছরে এই ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ২১ হাজার ৫৭৬ টাকা।

শেয়ার করুন!