মাসে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে সাভার, হেমায়েতপুর, গাজীপুর এবং মিরপুরেও পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। বুধবার (৪ নভেম্বর) সকাল থেকে বিক্ষোভে উত্তাল এ সব এলাকা।
সাভার ও হেমায়েতপুর রণক্ষেত্র
সাভারের উলাইল এবং হেমায়েতপুর পদ্মার মোড় এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে শ্রমিক ও পুলিশের মাঝে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
বিক্ষুদ্ধ শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ করে ইটপাটকেল নিক্ষেপসহ কারখানায় ভাঙচুর চালালে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এসময় সাভার মডেল থানার ওসির গাড়িতে আগুন দেন শ্রমিকরা।
এদিকে, বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করলে উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে মহাসড়কে তীব্র যানজট ও ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। এছাড়া শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ায় হেমায়েতপুর এবং উলাইলসহ আশপাশের বিভিন্ন পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
পুলিশ প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার সকালে ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মাসিক মজুরির দাবিতে পোশাকশ্রমিকরা পদ্মার মোড় এলাকায় জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।
একপর্যায়ে তারা সড়কে অবস্থান নিলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এসময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি সংঘর্ষে রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়। এসময় শ্রমিকরা পুলিশের গাড়িতে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।
এদিকে, সাভারের উলাইল এলাকায় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা দাবি আদায়ে সড়ক অবরোধ করলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এসময় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের বাগবিতণ্ডা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পুলিশ টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
অন্যদিকে, অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এবং সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৩ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সাভারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নিয়েছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
শ্রমিক অসন্তোষের কারণে পদ্মার মোড় বাসস্ট্যান্ডসহ আশপাশের কয়েকটি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে শ্রমিকদের একটি অংশ পরে শান্তিপূর্ণভাবে বাড়ি ফিরে যান।
অন্যদিকে বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের অবস্থান ও উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা বিরাজ করছে।
সাভারে দায়িত্ব পালনরত বিজিবি ঢাকা ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাইমুন বলেন, এখানে আমাদের ৩ প্লাটুনের মতো সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
গাজীপুরে শ্রমিক বিক্ষোভ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া
গাজীপুরে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে।

গাজীপুর চৌরাস্তা ও আশপাশের বিভিন্ন পয়েন্টে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে গাজীপুরগামী অনেক বাস মাঝপথ থেকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। এতে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা।
প্রভাতী বনশ্রী বাসের যাত্রী আব্দুল হামিদ বলেন, প্রথমে বলা হয়েছে বাস গাজীপুর পর্যন্ত যাবে, এমনকী বাইপাস পর্যন্ত যাওয়ার কথাও জানানো হয়েছিল। কিন্তু পরে বলা হচ্ছে আর যাবে না। এ নিয়ে অনেক যাত্রীর সঙ্গে বাসের লোকজনের কথা-কাটাকাটি হচ্ছে।
তবে সড়কে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যদের দাবি, মহাসড়ক পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি। বাইপাস এলাকায় শ্রমিকেরা সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন জানান, সকাল থেকে বেশির ভাগ এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে বড়বাড়ী এলাকায় একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
মিরপুর-উত্তরায় জলকামান ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন
ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মিরপুর এলাকায় সতর্ক অবস্থায় রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য

এছাড়া পল্লবীতে বিভিন্ন পোশাক কারখানার সামনে জড়ো হওয়া শ্রমিকদের সরিয়ে দিচ্ছে পুলিশ। সেই সঙ্গে উত্তরা এলাকাতেও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ।
এ বিষয়ে মিরপুর মডেল থানার ওসি মো. হাফিজুর রহমান জানান, মিরপুরে শ্রমিকদের আন্দোলন নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। এ থানা এলাকায় থাকা ৮টি পোশাক কারখানার ৭টি চালু ছিল। একটি কারখানায় শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখেছিল। পরে তাদের বোঝানো হয়। ফলে বুধবার সকাল থেকে তারাও কাজ শুরু করেছেন।
এর আগে বুধবার সকালে মিরপুর ১১-এর পূরবী সিনেমা হলের গলিতে থাকা কয়েকটি পোশাক কারখানার সামনে শ্রমিকরা জড়ো হলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। এ সময় শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিলেও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
উত্তরায় সতর্ক পুলিশ
পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে উত্তরায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে উত্তরার রাজলক্ষ্মী থেকে বিমানবন্দর এলাকায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ সদস্যরা। রাখা হয়েছে জলকামান-প্রিজনভ্যানও।
উল্লেখ্য, ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গত ১ নভেম্বর মিরপুরে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন পোশাকশ্রমিকেরা।
ওইদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে বেশ কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ।
সোম ও মঙ্গলবারও মিরপুরে বিক্ষোভ করেন পোশাকশ্রমিকরা। একই দাবিতে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জেও শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন। এসব আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। এতে অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত ও কারখানা বন্ধ রাখার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
আহত শ্রমিকের মৃত্যু
ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনের সময় গাজীপুরে আহত পোশাকশ্রমিক তৌফিক শেখ চিকিৎসাধীন মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকার উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালে
মারা গেছেন বলে জানা গেছে।








