এনআইডি সংশোধনে জালিয়াতি, কঠোর অবস্থানে ইসি

04 November, 2026

প্রকাশের সময়: 01:05 pm, 4th Nov, 2026

সর্বশেষ আপডেট: 01:05 pm, 4th Nov, 2026

জাতীয় পরিচয়পত্র

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ সম্পত্তি বিক্রি, উত্তরাধিকার দাবি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে জালিয়াতির চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ ধরনের অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, কোনো কোনো কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং ফৌজদারি মামলা ও গ্রেফতারের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা-বাসসকে বলেছেন, এই অভিযোগে আমাদের অনেক কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত হয়েছেন। অনেকের বিরুদ্ধে আমরা ফৌজদারি মামলা করেছি। তাদের গ্রেফতারের ব্যবস্থাও করেছি। সুতরাং আমরা কাউকে ছাড় দিচ্ছি না।

তিনি বলেন, জালিয়াতি রোধে ইসি’র অবস্থান কঠোর। প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র যাচাই-বাছাই করে সন্তুষ্ট হওয়ার পরই সংশোধনের সিদ্ধান্ত দিচ্ছে কমিশন। আবেদনকারীকে সঠিক তথ্য ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দিতে হবে।

এনআইডি’র অপব্যবহার প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে নাম বদল করে সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়েছেন। অনেকে উত্তরাধিকার বা ওয়ারিশ হিসেবে প্রমাণ করার জন্য এনআইডি সংশোধন করেন। অনেকে জালিয়াতি করে পাসপোর্ট পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন। এজন্য যাচাই-বাছাই না করে সবকিছু সঙ্গে সঙ্গে করা যায় না, সংশোধন করে দেওয়া যায় না।

এদিকে, ইসি’র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এনআইডি জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সম্প্রতি ঝালকাঠী জেলার কাঁঠালিয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আ. ছত্তারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে ইসি। এছাড়া জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় পঞ্চগড় সদরের  অফিস সহকারী কামনা রানী সরকারকেও সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।   

কী অসঙ্গতি পাওয়া যাচ্ছে

কর্মকর্তারা বলেন, অনেক আবেদনে বাবা-ছেলের বয়সের ব্যবধান মাত্র ৩ বছর। মা-মেয়ের ব্যবধান ২ বা ৩ বছর। কারো কারো আবার একাধিক জন্মনিবন্ধন বা শিক্ষাগত সনদ রয়েছে।

এসব যাচাই না করে সংশোধন করলে জটিলতা তৈরি হতে পারে, ভুয়া পরিচয়ে এনআইডি সংগ্রহের ঝুঁকিও থাকে।

সিইসি বলেন, এমনও শোনা যায়, বিদেশি নাগরিক, রোহিঙ্গারা আমাদের নাগরিক হয়ে এনআইডি তৈরি করে ফেলেন। এজন্য এগুলো যাচাই-বাছাই, তদন্ত ও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন হয়।

ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, অনেক আবেদনকারী এমন জন্ম তারিখ চান, যা আগের নিবন্ধনের তথ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। 

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একজনের জন্ম ১৯৯৭ সালে, ২০১৫ সালে ১৮ বছর বয়সে ভোটার হন। পরে জন্ম সাল ২০০২ করতে চান। তাহলে নিবন্ধনের সময় তার বয়স হয় ১৩, অথচ ভোটার হওয়ার বয়স ১৮। এমন আবেদন কীভাবে গ্রহণ করা সম্ভব!

তিনি বলেন, অনেকে বিদেশে যাওয়ার সমস্যা বা ব্যক্তিগত অসুবিধার কথা বলে মানবিক বিবেচনায় সংশোধন চান। যাচাই ছাড়া অনুমোদন করলে ইসিকেই সমস্যায় পড়তে হয়।

কোন নথি যাচাই হয়

কর্মকর্তারা জানান, অধিকাংশ সংশোধন উপজেলা পর্যায়েই সম্ভব। তবে নাম, বাবা-মায়ের নাম, বয়সসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য একসঙ্গে সংশোধনের জটিল আবেদন উচ্চপর্যায়ে যায়। সেখানে জন্মনিবন্ধন ও শিক্ষাগত সনদসহ প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়। বাবার নাম পরিবর্তনে বাবার এনআইডি ও পরিবারের অন্য সদস্যদের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।

শুধু হলফনামার ভিত্তিতে সংশোধন সম্ভব নয়।

সিইসি বলেন, আপনি যদি আপনার নাম ও বাবার নাম পরিবর্তন করতে চান, তাহলে আমরা বলতে পারি, আপনার অন্যান্য ভাই-বোনের এনআইডি নিয়ে আসেন। তাদের এনআইডিতে বাবার নাম কী আছে। 

যথার্থতা প্রমাণের জন্যই এসব তথ্য চাওয়া হয় বলে তিনি জানান।

এনআইডি সংশোধন করতে আসা ভুক্তভোগীদের অভিযোগ 

সম্প্রতি, এনআইডি সংশোধন করতে ইসিতে আসেন যশোরের কেশপুরের হরিদাস কর্মকার (ছদ্মনাম)। 

তিনি জানান, ৬ মাস আগে তার স্ত্রীর নাম সংশোধনের আবেদন করেছেন। সংশোধনের সময় বলা হয়, তার স্ত্রীর নামে দুটি জন্মনিবন্ধন রয়েছে। একটি জন্মনিবন্ধন বাতিল করে আসলে সংশোধন করে দেওয়া হবে। এরপর একটি জন্মনিবন্ধন বাতিল করে ইসিতে আসার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, নাম সংশোধনের জন্য তার স্ত্রীর ভাই-বোনের প্রত্যয়নপত্র দিতে হবে। বায়োমেট্রিক দিতে হবে। এছাড়া আরো বিভিন্ন ডকুমেন্ট চাওয়া হয়, যা তিনি এখনো সংগ্রহ করতে পারেননি।   

১৩ লাখ ৫৫ হাজার আবেদন বাতিল

ইসি’র জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত জমা পড়া ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ৮৪২টি সংশোধন আবেদনের মধ্যে ৬৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৩২টি নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৭টি বাতিল হয়েছে।

বাতিলের কারণ হিসেবে সিইসি বলেন, প্রয়োজনীয় তথ্য নেই, জন্মসনদ নেই। অনেকের একাধিক জন্মসনদ, এসএসসি বা স্নাতকের সনদ থাকায় কোনো একটি ডকুমেন্টের ওপর নির্ভর করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বাতিল হলে আবেদনকারী প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবার আবেদন করতে পারেন। যথাযথ তদন্ত ও প্রমাণ ছাড়া এবং নিশ্চিত না হয়ে কোনো আবেদন বাতিল করা হয় না বলে জানান সিইসি।

ইসি’র সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, বাতিলের সংখ্যা মানেই এতজন আবেদনকারী নন। একজন ৪-৫বারও আবেদন করেছেন। একই আবেদনে একাধিক তথ্য সংশোধনের অনুরোধ থাকলে একটি সংশোধন হলেও অন্যগুলো বাতিল হতে পারে।

ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব বলেন, উপজেলা থেকে মহাপরিচালক পর্যায়ে বাতিলের পরও সচিব পর্যায়ে আপিল করা যায়, সেখানেও বাতিল হতে পারে। 

তিনি বলেন, কোনো কোনো আবেদন ৬-৭ বার পর্যন্ত বাতিল হয়েছে। ফলে বাতিলের মোট সংখ্যা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত আবেদনকারীর সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না।

প্রবাসীদের ক্ষেত্রে জটিলতা

কর্মকর্তারা বলেন, প্রবাসীদের সেবা সহজ ও দ্রুত করার চেষ্টা চলছে। যাদের কাগজপত্র সঠিক, তাদের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সিইসি বলেন, আমরা অনেকগুলো দূতাবাসে প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি সেবা চালু করেছি।

অনেকে সঠিক পাসপোর্ট নিয়ে হয়ত বিদেশে যাননি। অনেক সময় দালালের মাধ্যমেও যান। এগুলো যাচাই করতে হয়। সৌদি আরবে অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে কাজ করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সিইসি আরো বলেন, যদি সব তথ্য ঠিক থাকে, আমরা অবশ্যই দ্রুত সময়ে প্রবাসীদের বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করবো। কারণ, প্রবাসীরা দেশের লাইফলাইন বলতে পারেন। তাদের রেমিট্যান্সের ওপরই দেশের অর্থনীতি টিকে আছে। তাদের ভিআইপি মর্যাদায় কাজটা করে দেওয়ার চেষ্টা করবো।

আখতার আহমেদ বলেন, অনেকে আগে এনআইডি করলেও পরে জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়ে পাসপোর্ট করেন, ফলে তথ্যে অমিল তৈরি হয়। জন্মনিবন্ধন তৈরির সময় এনআইডির সঙ্গে মিল রাখলে এ সমস্যা এড়ানো সম্ভব। 

ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আরো বলেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কাজের জন্য বয়সের শর্ত থাকায় অনেকে বয়স ও অন্যান্য তথ্য বদলান। পরে সমস্যায় পড়লে বাবা বা মায়ের নাম পরিবর্তনেরও আবেদন করেন। 

কোনটি সংশোধন সহজ, কোনটি নয়

ইসির লক্ষ্য, নাগরিকেরা যেন নিবন্ধনের সময় সঠিক তথ্য দেন, যাতে পরে সংশোধনের প্রয়োজন না হয়। স্থানান্তরের কারণে ঠিকানা, বিয়ে বা বিবাহবিচ্ছেদে বৈবাহিক অবস্থা, এমনকী ধর্ম পরিবর্তন হলেও নির্ধারিত পদ্ধতিতে সংশোধন করা যায়।

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশনস) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, নাম, বাবা-মায়ের পরিচয় বা জন্ম তারিখের মতো মৌলিক তথ্য পরিবর্তনে তথ্যপ্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।

-বাসস

শেয়ার করুন!